মতামত: পশ্চিমা গণমাধ্যম কতটুকু নির্ভরযোগ্য?

আমার সাম্প্রতিক সিরিয়া ভ্রমণের পর, ভারতের একটি স্কুল আমাকে আমন্ত্রণ জানায় - সিরিয়া, এবং বিশেষ করে আলেপ্পোর পরিস্থিতি নিয়ে একটি বক্তব্য রাখার জন্য। কেন আসাদ তার নিজের লোকদেরকে হত্যা করছেন, এ সম্পর্কে তারা জানতে চেয়েছিলো।

আমার সাম্প্রতিক সিরিয়া ভ্রমণের পর, ভারতের একটি স্কুল আমাকে আমন্ত্রণ জানায় - সিরিয়া, এবং বিশেষ করে আলেপ্পোর পরিস্থিতি নিয়ে একটি বক্তব্য রাখার জন্য। কেন আসাদ তার নিজের লোকদেরকে হত্যা করছেন, এ সম্পর্কে তারা জানতে চেয়েছিলো।

আমি বলি, “এটা সত্য নয়। কেন তোমাদের এমন ধারণা হলো?”

একজন উত্তর দিলো, “আমরা পত্র-পত্রিকায় এ রকমটাই দেখি।”

আরেকজন বলল, “এমনকি আমার দাদা যে হিন্দি পত্রিকা পড়েন সেখানেও একই রকম খবর পাওয়া যায়।”

শিক্ষকদের অবস্থা আরও খারাপ। রাতে টেলিভিশনে তাঁরা যে খবর দেখেন সকালের পত্রিকায় সেগুলোর মিল পান।

কিভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়? কেননা, আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো ভারতের সব উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়ানো হয় না। কিন্তু, আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা এবং সিরিয়ার যুদ্ধ, গাজায় বোমা বর্ষণ, গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া, ইউক্রেন, ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয়, স্থিতিশীল উদারতাবাদ থেকে ইউরোপের একটু একটু করে সরে আসা – এই বিষয়গুলো কারো ভালো লাগুক বা নাই লাগুক তা স্কুলের সবাইকে স্পর্শ করে। আর যার আগ্রহ আছে তার তো কথাই নেই। এই বিষয়গুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমের চোখ দিয়েই আমাদের দেখতে হয়। বেশিরভাগ ইস্যুতে এরা দুঃখজনকভাবে আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করছে। আমি বারবার বলব, এখন সময় একটি ভারতীয়, বৈশ্বিক মাল্টিমিডিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার।

আমি যে ছাত্রদের সামনে কথা বলছিলাম তাদের বয়স ১৭ থেকে ১৮ বছর। টেলিভিশনে তারা যা দেখছে, খবরের কাগজে যা পড়ছে তার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠছে তাদের বিশ্বভাবনা। ভারতীয় কোনও সংবাদ মাধ্যম তো দূরের কথা, ওই অঞ্চলে কোনোদিন কোনও ভারতীয় সাংবাদিক যায়নি। এই অবস্থায়, একটি প্রজন্ম জিম্মি হয়ে আছে বিশ্বসংবাদের একটি মাত্র উৎসের দ্বারা - তা হলো ইন্টারনেট।

১৯৯০ দশক পর্যন্ত প্রাত্যহিক বিশ্ব-সংবাদ পাওয়ার উৎস ছিলো বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস নিউজ এবং রয়টার্স। বিশ্ব মিডিয়ার এই আধিপত্যবাদ ১৯৯১ সালে শুরু হয়। তখন সিএনএন-এর পিটার অ্যারনেট একটি নতুন ও আগ্রাসী গ্লোবাল টেলিভিশনের সূচনা করেন। সেই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরাকে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের লাইভ কভারেজ দেয় চ্যানেলটি।

এই প্রথম একটি যুদ্ধ আমাদের ড্রয়িং রুম পর্যন্ত চলে এসেছিল। বিবিসি হেরে গিয়েছিল তার আটলান্টিকের ওপারের ‘কাজিনের’ কাছে।

আমি পরিষ্কার মনে করতে পারি যে জন সিম্পসন তাঁর স্যাটেলাইট টেলিফোন নিয়ে বাগদাদের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড রেডিওর জন্য। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস টেলিভিশন পরে শুরু হয়েছিল।

পশ্চিমাদের বিজয় উল্লাস সারা পৃথিবীকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছিল। এক ভাগে ছিল বিজয়ী পাশ্চাত্য আর অন্য দিকে অপমানিত মুসলিম বিশ্ব। এটাই ছিল দুই পক্ষের মধ্যে বৈরিতা তৈরির ভিত্তি। এরপর ৯/১১ এ ফাটে সবচে বড় বোমা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই। এই লড়াই পশ্চিমা দুনিয়াকে অনেক মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে। সন্ত্রাসকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে এর সংঘাতের মাত্রা।

আমি যে স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলছিলাম তাদের অভিভাবকদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল সেইসব গণমাধ্যমের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। তা হলো অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম এবং এর পরবর্তী ‘ইনফরমেশন অর্ডার’ যা ‘নিউ ইকোনমিক পলিসির’ সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। বিশ্বায়নের হাত ধরে পরবর্তীতে তা ভারতে আসে। টমাস ফ্রিডম্যানের ভাষায় এই বিশ্বায়ন হলো দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ ফ্ল্যাট এর মতো। বেঙ্গালুরুর আইটি পণ্ডিতদের কাছে তিনি একজন ‘লোকাল হিরো’-র মর্যাদা পেয়েছিলেন।

এই নব্য উদারনীতিবাদ আমাদেরকে একটি ‘মারুতি-প্লাস’ মধ্যবিত্ত সমাজে উন্নীত করেছে। এই শ্রেণির ভেতর ক্রমবর্ধমান ভোগবাদ জিইয়ে রাখার জন্য আজকের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এমন বাড়বাড়ন্ত।

গণমাধ্যম এবং এই মধ্যবিত্ত সমাজ আরেকটি বাস্তবতায় নিজেদের আবিষ্কার করলো। ভারতে তখন (৬ ডিসেম্বর ১৯৯২) বিজেপির ‘স্বেচ্ছাসেবকরা’ বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে ফেললো। সেই সময় মনমোহন সিং ছিলেন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাওয়ের অর্থমন্ত্রী। তিনি তখন ‘নিউ ইকোনমিক পলিসি’ তুলে ধরছিলেন।

নতুন গজিয়ে ওঠা মধ্যবিত্ত সমাজ তখন আকাশের তারা গুনছিলেন। দিগন্তে তখন সমৃদ্ধির সুবর্ণ রেখা। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ভারতের সামাজিক বিভেদ মিলে তাদের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিলো। এই খেলায় মুসলমানরা যেন বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বায়নের সৃষ্টি ভারতের নতুন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নির্লজ্জভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যমকে অনুকরণ করে যাচ্ছিলো। আমি আগেই বলেছি, পাশ্চাত্য এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছিল পশ্চিমা গণমাধ্যম। ভারতের গণমাধ্যমগুলোও দেশের ১৮ কোটি মুসলমানকে এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলো। এটাকেই বলে সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি।

আমি বলছি না যে পাশ্চাত্যের সব গণমাধ্যমই এমন কাজ করছে। পৃথিবীটাকে শুধুমাত্র নিজের চোখ দিয়ে দেখে তাঁরা। আমরা যদি পশ্চিমাদের চোখে পৃথিবীটাকে দেখতে যাই তাহলে বাস্তবতাকে বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবো।

সম্প্রতি লন্ডনে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, “কোন জাতীয়তাবাদের চর্চা করো তোমরা?” তিনি আরও বলেন, “তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের সহযোগিতায় জন্ম নেওয়া একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে ভ্রমণের অনুমতি দাওনা।” আমি ভেবেছিলাম উনি হয়তো আমাদের পাকিস্তান নীতি নিয়ে বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা দিবেন। কিন্তু, তাঁর ইঙ্গিতটা ছিল ভয়ঙ্কর।

“কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তোমাদের সব সম্ভ্রান্ত লোকেরা সন্তানদের জন্য আমেরিকার গ্রিন কার্ড পাওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকে। এটা কোন ধরনের জাতীয়তাবাদ?”

 

লেখক সাঈদ নাকভি ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Comments

The Daily Star  | English
Annual registration of Geographical Indication tags

Rushed GI status raises questions over efficacy

In an unprecedented move, the Ministry of Industries in Bangladesh has issued preliminary approvals for 10 products to be awarded geological indication (GI) status in a span of just eight days recently.

11h ago