‘ফুটপাতের লাভের গুড় পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের দখলে’

ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতকেন্দ্রিক বেচাকেনা জমে উঠেছে। তবে লাগামহীন চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার লাভের টাকা ঘরে তুলতে পারছেন না ফুটপাতের হকাররা।
মিরপুর ১ নম্বরে ফুটপাতে বেচাকেনা জমে উঠেছে। ছবি: শাহীন মোল্লা/স্টার

ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতকেন্দ্রিক বেচাকেনা জমে উঠেছে। তবে লাগামহীন চাঁদাবাজির কারণে ব্যবসার লাভের টাকা ঘরে তুলতে পারছেন না ফুটপাতের হকাররা।

হকার্স সমিতির নেতারা বলছেন, গত দুই বছর করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা হয়নি। এতে স্বল্প পুঁজির এই ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন, অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

তবে এই বছর ঈদ মৌসুমে ব্যবসায় প্রাণ ফিরলেও অতিরিক্ত চাঁদাবাজির কারণে তাদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে।

গত ৩ দিনে ঢাকার মিরপুর ১০ নম্বর, ১১ নম্বর, ভাসানটেক, মিরপুর ১, কাওরানবাজার, গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউ মার্কেট, মহাখালী এলাকা সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, 'ঈদ বকশিসে'র নামে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হচ্ছে ফুটপাতের হকারদের।

তাদের অভিযোগ, 'ফুটপাতে বেচাকেনার জন্য সারাবছরই একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা চাঁদা দিতে হলেও এই ঈদের আগে চাঁদার পরিমাণ দ্বিগুণ, তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।'

অভিযোগ রয়েছে, কতিপয় পুলিশ সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু নেতার আশীর্বাদে ফুটপাতের দখল এখন লাইনম্যানদের হাতে। ঈদের আগে প্রতিদিনই কোটি টাকার চাঁদা তুলছেন লাইনম্যানের অধীনে থাকা পেশাদার চাঁদাবাজরা।

মিরপুর শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ফুটপাতের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক বিক্রেতা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রতি মাসে আমি ৪ হাজার টাকা চাঁদা দেই। কিন্তু গত পরশুদিন লাইনম্যান বলে গেছেন রমজানের শেষ ৪ দিনের জন্যই ৪ হাজার টাকা দিতে হবে। চাঁদা না দিলে অন্য ব্যবসায়ীকে এই জায়গায় বসিয়ে দেবে বলে হুমকি দিয়ে গেছেন।'

ঈদের আগে মতিঝিল, গুলিস্তানে পোশাকের দোকান, জুতার দোকানের ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতেন, তবে ঈদ উপলক্ষে এখন ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

হকারদের অভিযোগ, লাইনম্যানরা তাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে নিয়ে যান। চাঁদার সবচেয়ে বড় অংশ পুলিশ সদস্যদের এবং বাকি অংশ ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ভাগ করে দেন।

এ বিষয়ে জানতে কয়েকজন লাইনম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মতিঝিলে শাপলা চত্বর এলাকার এক লাইনম্যানের সঙ্গে দ্য ডেইলি স্টার যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, 'ঈদের জন্য সব ফুটপাতেই লাইনম্যানরা চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়েছে। এটা ঠিক। কিন্তু আমি চাঁদার পরিমাণ বাড়াইনি। আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ মিথ্যা।'

তিনি আরও বলেন, 'আমার ফুটপাতে একটি দোকান আছে। এই এলাকার সবচেয়ে পুরোনো ব্যবসায়ী হওয়ায় সবাই আমাকে লাইনম্যানের দায়িত্ব দিয়েছে।'

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি আরিফ চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'স্বাভাবিক সময় সারাবছরই কোনো না কোনো এলাকায় হকার উচ্ছেদ হয়। করোনা মহামারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে আগের মতো তেমনটা হকার উচ্ছেদ হয়নি। এটা হকারদের জন্য বড় প্রাপ্তি। কিন্তু এই সুবিধা কেড়ে নিয়েছে পুলিশ ও লোকাল মাস্তানরা।'

'পুলিশ এখন দাবি করে যে, তারা হকার উচ্ছেদ করছে না, হকারদের ব্যবসা করতে দিচ্ছে। এ কথা বলে ১০০ টাকার জায়গায় ২০০ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে,' বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, 'ফুটপাতের হকাররা সবসময়ই নির্যাতিত, নিপীড়িত। ঢাকায় প্রায় ৫ লাখের বেশি হকার রয়েছে, কারো স্থায়ী দোকান, কারো মৌসুমী। প্রতিদিন লাইনম্যানের মাধ্যমে পুলিশ সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কিছু নেতারা হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেন। বিভিন্ন সময় চাঁদা না দিলে মারধরও করা হয়।'

এদিকে, সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস টার্মিনালগুলোতেও ঈদকে ঘিরে চাঁদাবাজি চলছে।

গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় রাস্তায় এলোপাথাড়িভাবে দূরপাল্লার বাস থামিয়ে লম্বা সময় ধরে যাত্রী উঠানো হচ্ছে। 'পুলিশি ঝামেলা' এড়াতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা করে 'ঈদ বকশিস' দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া বাসগুলোতে ভাড়াও বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ি, গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ, জয়কালী মন্দির এলাকায় মালবাহী গাড়ি ঢুকলেই ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন চালকরা।

সদরঘাট, ইংলিশ রোড এলাকায় অন্যান্য সময়ে প্রতিটি সিএনজি থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হলেও এখন 'ঈদ বকশিসে'র কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ারও অভিযোগ এসেছে।

একই চিত্র দেখা গেছে কাওরানবাজারেও। মালবাহী ট্রাকগুলো থেকে ঈদ উপলক্ষে লাইনম্যানরা 'অতিরিক্ত বকশিস' নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক চালক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, বড় ট্রাকগুলো থেকে ২০০ থেকে ৩০০, ছোট ট্রাক থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা 'ঈদ বকশিস' নেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য সময়ে ২০ থেকে ৫০ টাকা চাঁদা নেওয়া হতো।

তারা বলছেন, পুরো কাওরানবাজার এলাকায় ২০ থেকে ২৫ জন কয়েকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে 'ঈদ বকশিস' তুলছেন। 'বকশিস' না দিলে মারধরও করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন কয়েকজন চালক।

ঈদের আগে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ও ফুটপাতে চাঁদাবাজি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের প্রধান উপকমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ ধরনের চাঁদাবাজির কয়েকটি ভাসা ভাসা অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। সুনির্দিষ্টভাবে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

Comments

The Daily Star  | English

Getting the price right for telecom consumers

In a price-sensitive market like Bangladesh, the price of telecom services quite often makes the headlines

2h ago