আতঙ্কের নাম ‘টিপ ছুরি’

গার্মেন্টসকর্মী স্ত্রীর অফিসের সামনে অপেক্ষা করছিলেন ২৩ বছর বয়সী শরীফ, অফিস শেষ হলে একসঙ্গে বাসায় ফিরবেন। হঠাৎ উঠতি বয়সী ২ তরুণ এসে তাকে ঘিরে ধরে। পকেট থেকে টিপ ছুরি বের করে মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে চাইলে বাধা দেন শরীফ। তখন তার বুকে ও উরুতে আঘাত করে গুরুত্ব জখম করে ছিনতাইকারীরা। গত ২৪ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার শেরশাহ এলাকা এ ঘটনা ঘটে।
ছবি: সংগৃহীত

গার্মেন্টসকর্মী স্ত্রীর অফিসের সামনে অপেক্ষা করছিলেন ২৩ বছর বয়সী শরীফ, অফিস শেষ হলে একসঙ্গে বাসায় ফিরবেন। হঠাৎ উঠতি বয়সী ২ তরুণ এসে তাকে ঘিরে ধরে। পকেট থেকে টিপ ছুরি বের করে মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে চাইলে বাধা দেন শরীফ। তখন তার বুকে ও উরুতে আঘাত করে গুরুত্ব জখম করে ছিনতাইকারীরা। গত ২৪ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার শেরশাহ এলাকা এ ঘটনা ঘটে।

শরীফের চিৎকার শুনে টহল পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন ধাওয়া দিয়ে ফয়সাল আলম আলভী নামে এক ছিনতাইকারীকে আটক করে। তার কাছে থেকে জব্দ করা হয় টিপ ছোরা। এ ঘটনায় শরীফকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ায় বেঁচে গেলেও বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
  
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল কথা কাটাকাটির জেরে নগরীর পাহাড়তলী এলাকায় কিশোর গ্যাং-এর ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্কুল ছাত্র শাহরিয়ার নাজিম ফাহিম। ঘটনার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি রক্তমাখা টিপ ছুরি উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেফতার করে।

বর্তমানে টিপ ছুরি এক আতঙ্কের নাম। এটি ভাজ করে রাখা যায়, সুইচ টিপলে বের হয়ে আসে ধারালো ফলাটি। আকারে ছোট ৬ ইঞ্চির স্টিলের এই ছুরি দিয়ে বন্দর নগরীতে প্রতিনিয়ত ঘটছে ডাকাতি, ছিনতাই এবং খুনের মতো ঘটনা। সহজে পকেটে বহন করা যায় বলে এই ধরনের ছুরি এখন ছিনতাইকারী এবং উঠতি বয়সী অনেক ছেলের হাতে দেখা যায়। 

নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ে এবং গ্রেফতার হওয়া ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে এই টিপ ছুরি। টিপ ছোরার ব্যবহার নিয়ে এখন উদ্বিগ্ন থানা পুলিশ। প্রতিদিন নগরীর ১৬ থানার কোনো না কোনো থানাতেই টিপ ছুরি নিয়ে ধরা পড়ছে তরুণ ও যুবকরা। 

পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের ছুরি খুব ধারালো, পকেটে ভাজ করে নিরাপদে হাটা যায় বলে অপরাধী এবং কিশোর গ্যাংয়ের সদ্যসরা বর্তমানে এই ছুরির খুব বেশি ব্যবহার করছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চীনের তৈরি এসব ছুরির একপাশ ধারালো। তবে, এগুলো দিয়ে ফল বা সবজি কাটা বা অন্য কোনো কাজে লাগে না। চট্টগ্রামের রেয়াজউদ্দিন বাজার বা ফুটপাতের বিভিন্ন দোকানে হাত বাড়ালেই মেলে এই টিপ ছুরি। ছুরির ডিজাইন ভেদে প্রতিটি ছুরি ৪০০ থেকে হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে এই ছুরি বেচাকেনা করতে দেখা গেছে।

নগরীর কয়েকটি থানা, গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এই জাতীয় ছুরি দিয়ে গত ৪-৫ বছর ধরে চট্টগ্রামে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। শহর কিংবা গ্রাম সব জায়গায় ছড়িয়েছে এটি। তবে কিছু ঘটনার পর চটগ্রাম নগর পুলিশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে এসব ছুরি বিক্রির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তারপরও গোপনে এই ছুরি বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এটি পরিবহন অনেক সময় অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয় না। ধরুন কোনো কলেজ ছাত্রের কাছে এটি পেলে যাচাই-বাছাই করে ছুরি রেখে তাদের পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ছুরিগুলো বাইরের দেশ থেকে আসে, সে ক্ষেত্রে কী নাম দিয়ে এগুলো আমদানি হয়, কীভাবে খালাস হয়, কারা আমদানি করে, কাস্টমস কীভাবে ছাড় দেয় তা খতিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।'

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা এই ধরনের অস্ত্র কোথাও বিক্রি হচ্ছে বলে খবর পেলে সেখানে অভিযান পরিচালনা করি এবং জব্দ করি। অথবা কারও কাছে পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেই।'

নগর গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি-বন্দর) নোবেল চাকমা বলেন, 'টিপ ছুরি বিক্রি নিষিদ্ধ। আসামি ধরা পড়ার পর আমরা তাদের জিজ্ঞেস করি কোথা থেকে তারা তা সংগ্রহ করেছে। এরপরে আমরা তাদের নিয়ে সেখানে অভিযান চালাই এবং আইনের আওতায় নিয়ে আসি।'

'টিপ ছুরি কারা আমদানি করেন, কাদের কাছে বিক্রি হয় এটি জানলে আমাদের মনিটরিং করা আরও সুবিধা হতো। আমরা আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে পারতাম। এ ছাড়া আমদানি-নিষিদ্ধের বিষয়টি এখন ভাবার সময় এসেছে', বলেন এডিসি নোবেল।

গত ১৮ মার্চ নগরীর লালখান বাজারে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে সাফায়েত হোসেন নামের ১৯ বছর বয়সী এক কলেজছাত্র আহত হন। আহত সাফায়েত ফেনীর পাহাড়তলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থী। জানা গেছে, টাইগারপাস থেকে লালখান বাজারে যাওয়ার পথে ২ জন ছিনতাইকারী তাকে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

এ ঘটনায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে সুমন বিল্লাহ নামে এক যুবকসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সুমন বিল্লাহ জানায়, তারা সাফায়াতের কাছ থেকে তার মুঠোফোনটি কেড়ে টিপছুরি দিয়ে ১৬টি ছুরিকাঘাত করে। ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে ছুরিটি উদ্ধার করে গোয়েন্দারা।

এ ছাড়া গত ২৫ মার্চ সহযোগীসহ পেশাদার ছিনতাইকারী ইমাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে আকবর শাহ থানা পুলিশ। তার কাছ থেকেও একটি দেশীয় অস্ত্র ও টিপ ছুরি পাওয়া যায়।

২০১৮ সালের ১৬ জুন নগরীতে ৩টি হতাহতের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে হালিশহরের আর্টিলারি রোডে কিশোর মো. সুমন হত্যা এবং একই দিনে নগরীর চট্টেশ্বরীতে যুবলীগ কর্মীদের হাতে আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে আবু জাফর অনিককে (২৬) খুন করা হয়। নগরীর চট্টেশ্বরী রোডে আইমান জিহাদ নামের এক যুবককেও এই ধরনের ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।

Comments

The Daily Star  | English

Freedom declines, prosperity rises in Bangladesh

Bangladesh’s ranking of 141 out of 164 on the Freedom Index places it within the "mostly unfree" category

59m ago