দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড

বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ

পোড়া লাশের কটু গন্ধে ভারী হয়ে ছিল চারপাশের বাতাস। তখনো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল পুড়ে যাওয়া প্লাস্টিক, প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহৃত কাগজ ও কারখানার বিভিন্ন উপকরণের। গতকাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের হাশেম ফুডস ফ্যাক্টরির ছয় তলা ওই ভবনের চতুর্থ তলায় গোড়ালি পর্যন্ত পানিতে কয়েকটি পরিত্যক্ত স্যান্ডেল ও গলিত প্লাস্টিক পড়েছিল।

পোড়া লাশের কটু গন্ধে ভারী হয়ে ছিল চারপাশের বাতাস। তখনো গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল পুড়ে যাওয়া প্লাস্টিক, প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহৃত কাগজ ও কারখানার বিভিন্ন উপকরণের। গতকাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের হাশেম ফুডস ফ্যাক্টরির ছয় তলা ওই ভবনের চতুর্থ তলায় গোড়ালি পর্যন্ত পানিতে কয়েকটি পরিত্যক্ত স্যান্ডেল ও গলিত প্লাস্টিক পড়েছিল।

দমকল বাহিনীর সদস্যরা আগুন নেভানোর পর সেখানে পানি জমে যায়।

ওই জায়গা থেকে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ৪৮ জন কর্মীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তারা সেখানে চকলেট ও ললিপপ তৈরির কাজ করতেন। তখনো সেখানে ‘মিল্কিস্টিকের’ প্যাকেট তৈরির কাজে ব্যবহৃত অর্ধদগ্ধ কাগজ মাটিতে পড়ে ছিল।

হঠাৎ একজন বলে উঠলেন, ‘এটি সম্ভবত কারও হাড়।’

তবে, সেটি কারও হাড় না গলিত প্লাস্টিক, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন ছিল।

গত বৃহস্পতিবারে শ্রমিকরা বিধ্বংসী আগুন থেকে বাঁচতে যে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেটি ভবনের দ্বিতীয় সিঁড়ি থেকে মাত্র দুই গজ দূরে অবস্থিত। তবে একটি লোহার গ্রিল দিয়ে সিঁড়িটিকে কারখানার অংশ থেকে আলাদা করে রাখা ছিল।

দমকল বাহিনীর একজন কর্মী জানান, ‘সিঁড়িতে পৌঁছানোর গেটটি তালাবদ্ধ না থাকলে যারা ফ্লোরে পুড়ে মারা গেছেন, তারা জীবন বাঁচাতে পারতেন। তারা ভবনের ছাদে পৌঁছে যেতে পারতেন।’

নকশা অনুযায়ী ওই ভবনটিকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেটিকে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করত বলেও জানান তিনি।

গতকাল সরেজমিনে ঘুরে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধিরা দেখতে পান, আগুন লেগে ৩৪ হাজার বর্গফুটের ওই ভবনটি ইট-পাথরের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

কারখানা ভবনের দেওয়ালে ‘কেন্দ্রীয় স্টোর’ লেখা একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। তবে এই অবকাঠামোটিকে স্টোরের পরিবর্তে ‘খাঁচা’ বলেই মনে হয়েছে। যেখানে শ্রমিকদের প্রতিটি ফ্লোরে তালা দিয়ে আটকে রাখা হতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শ্রমিক জানান, ‘প্রতিটি অংশ লোহার গ্রিল দিয়ে আলাদা করা ছিল। এটি করা হয়েছিল যাতে শ্রমিকরা উৎপাদিত পণ্য, যেমন জুস, সেমাই ও চকোলেট চুরি করতে না পারেন।’

তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় দ্বিতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম তলা।

নিচ তলায় যন্ত্রগুলোর পাশে প্যাকেজিংয়ের জিনিসপত্র জমা করে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় বিস্কুট, তৃতীয় তলায় কোমল পানীয় ও চতুর্থ তলায় ললিপপ, চকোলেট ও নসিলা (রুটিতে লাগিয়ে খাওয়ার জন্য চকোলেটের স্প্রেড) উৎপাদিত হতো। পঞ্চম তলাটি মূলত গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং সেইসঙ্গে সেমাইও উৎপাদন করা হতো। ষষ্ঠ তলায় উৎপাদিত হতো চানাচুর।

প্রতিটি তলা প্লাস্টিকের তৈরি উপকরণ দিয়ে ভরা ছিল। যার কারণে আগুনের তেজ বেড়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন, দমকল বাহিনীর কর্মকর্তারা।

ইলেক্ট্রনিক সেইফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ইএসএসএবি) থেকে একটি দল গতকাল সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শন করেন। তারা সেখানে ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেরে বিস্মিত হন।

ইএসএসএবির সহসভাপতি মোহাম্মদ মনজুর আলম বলেন, ‘এখানে সব ধরনের প্রাথমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা লঙ্ঘন করা হয়েছে। কোনো নিরাপত্তা দরজা, পানি সঞ্চালনকারী যন্ত্র অথবা জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা নেই। দেখে মনে হচ্ছে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুসরণ করেনি। প্রতিটি তলায় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি বিভাগ গ্রিল দিয়ে আলাদা করা।’

কারখানার তৃতীয় তলার শ্রমিক পারভেজ দ্য ডেইলি স্টারের কাছে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আগুন লাগার সময় আমরা কাজ করছিলাম। প্রথম তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর সবাই চিৎকার করতে শুরু করে। পুরো ব্যাপারটা তখন দোজখের মতো মনে হচ্ছিল। আমরা যখন প্রথম সিঁড়িটি দিয়ে ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলাম, তখন দেখলাম সেখানে আগুন লেগে গেছে। আমাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন ভাগ্যবান মানুষ দ্বিতীয় সিঁড়ি দিয়ে বের হতে পেরেছিলাম। বাকিরা ভেতরে আটকা পড়ে, পরে অনেকে ভবনের ওপর থেকে লাফ দেয়।’

‘চতুর্থ তলায় দ্বিতীয় নির্গমন পথটি তালাবদ্ধ ছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে আগুন চারপাশের সব কিছু ধ্বংস করে ফেলছিল’, বলেন তিনি।

গতকাল কারখানা ভবনের চারপাশে কোনো মানুষের ভিড় ছিল না, কারণ পুলিশ দর্শনার্থীদের ভবনটির কাছে যেতে দিচ্ছিল না। শুধু সাংবাদিকদের ভেতরে যেতে দেওয়া হয়।

তখনো দমকল বাহিনীর সদস্যরা ব্যস্ত ছিলেন পুড়ে যাওয়া প্যাকেজিং উপকরণের স্তূপের ওপর পানি ঢালার কাজে। আগুন লাগার ৪০ ঘণ্টা পরেও সেগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া বের হচ্ছিল।

ভবনের দেওয়ালগুলোও কালো হয়ে গেছে। দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত ছাই ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। পঞ্চম তলার অংশ বিশেষ চতুর্থ তলার ওপর ধ্বসে পড়েছে।

নিরাপত্তা কর্মী নূর আলম বলেন, ‘প্রতিদিন কয়েকশ মানুষ কারখানায় আসতেন। এখন ভবনটি কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কাদের আমি এখন নিরাপত্তা দেব?’

ইতোমধ্যে ফায়ার সার্ভিস গতকাল সন্ধ্যায় উদ্ধার কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধন জানান, ‘ভেতরে আর কোনো লাশ নেই। নেই কোনো আগুন কিংবা ধোঁয়া। তবে ভবনে বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ রয়েছে। যদি আবারও আগুন লাগে, আমরা এখানে এসে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’

এছাড়া ভবনটি ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে অনুমোদন নেয়নি বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা কারখানাভবনগুলোর জন্য অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা দেই। তবে, এই ভবনটির জন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল না।’

কারখানাটির অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার নাহিদ মুরাদ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তারা নিরাপত্তা কর্মীদের বলেছেন, যেন বহিরাগতদের ভেতরে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

Comments

The Daily Star  | English

Extreme heat sears the nation

The scorching heat continues to disrupt lives across the country, forcing the authorities to close down all schools and colleges till April 27.

8h ago