পরবর্তী মহামারির প্রস্তুতি: পেটেন্টমুক্ত ওষুধ উৎপাদনে সামাজিক ব্যবসার মডেল

মহামারি শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো জেনেভায় বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি। তারা ভবিষ্যতে আসতে পারে এমন মহামারি মোকাবিলায় একটি কাঠামো প্রণয়নে একমত হয়েছে।

মহামারি শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো জেনেভায় বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি। তারা ভবিষ্যতে আসতে পারে এমন মহামারি মোকাবিলায় একটি কাঠামো প্রণয়নে একমত হয়েছে।

তবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরামটি, যার ডেলিগেটদের মধ্যে বহু মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশ রয়েছে, এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি মোকাবিলায় আমরা ভয়ানক ব্যর্থতার মাত্রা উপলব্ধি করতে শুরু করলেও পৃথিবীর ধনী দেশগুলো মহামারিকে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করছে না।

পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুতি নিতে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির ডেলিগেটদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতির চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন হবে। এ জন্য প্রয়োজন হবে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কাঠামো প্রতিষ্ঠায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যেখানে টিকা ও ওষুধ উৎপাদনের ক্ষমতা একটি সামাজিক ব্যবসা মডেলের মাধ্যমে আরও ন্যায্যভাবে বণ্টিত হবে।

সামাজিক ব্যবসা টেকসই উপায়ে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার সেই ধরন, যেখানে এর মালিকরা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বিনিয়োগকৃত মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার বাইরে কোনো মুনাফা প্রত্যাশা করেন না। সামাজিক ব্যবসা হলো একটি মুনাফাবিহীন প্রতিষ্ঠান, যার লক্ষ্য সমাজের কোনো সমস্যার সমাধান করা, ব্যক্তিগত মুনাফা নয়।

এ ধরনের একটি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিতে পারেন। সরকারগুলো যদি টিকা তৈরি ও বণ্টনের জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোকে শত শত কোটি ডলার দিতে পারে, তাহলে তারা সামাজিক ব্যবসা হিসেবেও ওষুধ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে পারে, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সহজে টিকা পায়।

এই মহামারি বৈশ্বিক অসমতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। পৃথিবীতে ২ কোটিরও বেশি মানুষ কোভিড-১৯ এর কারণে মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই দরিদ্রতর দেশগুলোর নাগরিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পৃথিবীর ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য হাতে নিয়েছিল। আমরা সেই সময় সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ এখন পর্যন্ত টিকার একটি ডোজ পেয়েছে। এই হারে চললে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য অর্জনে দরিদ্রতম দেশগুলোর আরও ২ থেকে আড়াই বছর সময় লেগে যাবে।

নিম্ন আয়ের দেশগুলো এক বছরেরও বেশি সময় টিকা না পেলেও শেষ পর্যন্ত কিছু ডোজ পৌঁছাতে শুরু করেছে। টিকার এই সরবরাহ হঠাৎ করেই বড় আকারে একসঙ্গে আসতে শুরু করে এবং প্রায় ক্ষেত্রেই এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময়ে। ডোজগুলো যখন আসে তখন কোন টিকাগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে, কী পরিমাণে এবং কোন সময়ে—এসব বিষয়ে দরিদ্র দেশগুলোর কিছু বলার তেমন কোন সুযোগই থাকে না। ফলে তারা পরিকল্পিতভাবে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে না। টিকা উৎপাদন উত্তর গোলার্ধেই কেন্দ্রীভূত হয়ে থেকেছে।

২০২২ সালে প্যাক্সলোভিড ও লেগেভরিও ওষুধ উৎপাদনের পুরোটাই কিনে রেখেছে ধনী দেশগুলো। এই দুটি ওষুধ তৈরি করছে যথাক্রমে ফাইজার ও মার্ক। এই কোম্পানিগুলো নজরদারি করছে কোন কোন দেশ এই ওষুধ তৈরি করতে পারবে এবং কারা পারবে না। যার মধ্যে প্রায় পুরো ল্যাটিন আমেরিকা রয়েছে। ফাইজার অনেকটা অশোভনভাবেই দাবি করছে যে, ডোমিনিকান রিপাবলিকে প্যাক্সলোভিড উৎপাদনের কোনো প্রচেষ্টা কোম্পানিটির 'মানবাধিকার' লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে।

সম্পদই ক্ষমতা। আর কোভিড-১৯ এর টিকা ও চিকিৎসায় নিষ্ঠুর রকমের অসম বৈশ্বিক বণ্টন সম্পদের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীভবন এবং মুনাফা সর্বোচ্চকরণের পরিণতি। আজকের ওষুধ শিল্প সর্বোচ্চ মুনাফার জন্য সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ওষুধ বিক্রি করে থাকে। ন্যায্যতা ও সুযোগের অধিকারকে গণসংযোগ ইস্যুগুলোর চেয়ে তেমন একটা বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় না।

এই প্রকট বৈষম্যের বিপরীতে আবশ্যক হলো, করোনা টিকা বিশ্বব্যাপী বিতরণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক তহবিলের ব্যবস্থা করা। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলো অর্থাৎ জি-১০ দেশগুলো যারা সম্পদ কেন্দ্রীকরণের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটির সুবিধাভোগী, তারাই বর্তমান ফার্মাসিউটিক্যাল মডেলটির সুবিধা নিচ্ছে। যদিও এর জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে অন্যদের। টিকা বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয় সব সম্পদই তাদের কাছে আছে এবং তারা চাইলেই এটা করতে পারে। আর এটা শুরু করতে সম্প্রতি আমি অন্যান্য কয়েকজনের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অনুরোধ করেছি, বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিকে সহায়তা করার জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের নেতৃত্ব দিতে।

টিকা উৎপাদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও সেগুলো সঠিক জায়গায় সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। যখন আরও কার্যকর নতুন টিকা তৈরি হবে, আবারো সেগুলো সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি হবে এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে পুরনো টিকা দিয়ে নতুন ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। এই ব্যবস্থাটির পরিবর্তন খুবই জরুরি। টিকা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা কোথায় তৈরি হচ্ছে, কাদের দ্বারা, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে তা সুলভে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আর এর চাবিকাঠি হচ্ছে কোভিড-১৯ টিকাকে মুনাফা ও পেটেন্ট থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা।

এ কারণে আমি সোশ্যাল বিজনেস ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করছি। এই কোম্পানিগুলো মুনাফা খুঁজবে না। তারা টিকা ও ওষুধ তৈরি করবে সেসব জায়গায় এবং সেসব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, বর্তমান ব্যবস্থায় যারা বঞ্চিত। তাদের কাছে এগুলো বিক্রি করা হবে উৎপাদন খরচে, কোনো রকম মুনাফা না করে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে ক্রস-সাবসিডির মাধ্যমে। যাতে এর দাম তাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে। স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে জরুরি একটি সমস্যা মোকাবিলায়, একেবারে নিচে থেকে উপরের দিকে প্রত্যেকের কাছে পৌঁছানোর এটি হতে পারে একটি স্পষ্ট উদ্যোগ। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন মেধাস্বত্ব আইনের মতো বাধাগুলো দূর করা এবং সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগ নেওয়া। বিশ্বব্যাপী টিকা উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পেটেন্টমুক্ত টিকা উৎপাদনের আবেদনে কিছুটা গতি এলেও, একটি কার্যকর কর্মপন্থার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।

সংকটের এই গভীরতা ও ব্যাপ্তির মধ্যে এই উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সর্বোত্তম সময়। আমরা যদি একটি চ্যারিটি মডেল থেকে সামাজিক ব্যবসা মডেলে ক্রমান্বয়ে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেই, তাহলে আমরা স্থানীয় পর্যায়ে টিকা উৎপাদন ও বিতরণ, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার ভিত্তি তৈরি করতে পারব। নেতারা পেটেন্ট অগ্রাহ্য করে এবং সামাজিক লক্ষ্যে পরিচালিত জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বিনিয়োগ করে পরবর্তী প্রজন্মের করোনাভাইরাস টিকা দিয়ে শুরু করতে পারেন, যাতে দক্ষিণ গোলার্ধকে পুরনো টিকা দিয়ে নতুন ভ্যারিয়েন্ট মোকাবিলার চেষ্টা করতে না হয়।

এ মাসে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বৈঠকে বিশ্ব নেতারা কোভিড-১৯ এর সঙ্গে সম্পর্কিত যাবতীয় ওষুধের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব আইনগুলোর সর্বাঙ্গীণ স্বত্ব ত্যাগ সমর্থন করে জেনেরিক টিকা উৎপাদন ও ভাইরাসের চিকিৎসার অন্তরায়গুলো দূর করতে পারেন। একই সঙ্গে তারা ওষুধ কোম্পানিগুলোকে টিকা, পরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রযুক্তি দক্ষিণ গোলার্ধে সহজলভ্য করতে সব ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন।

তবে এর বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড বরং এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির স্বত্ব ত্যাগ বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করোনা চিকিৎসায় এসব বাধা দূর করতে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছে এবং শুধু টিকার ক্ষেত্রে এই স্বত্ব ত্যাগের ওপর জোর দিয়ে আসছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, কোভিড-১৯ এর ওপর রাজনৈতিক চাপ ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে আলাপ-আলোচনা অগ্রসর হলেও ধনী দেশগুলো একই কাতারে চলে আসছে।

করোনায় যারা মারা গেছেন তাদের ক্ষেত্রে অবশ্য যেকোনো অর্থপূর্ণ অগ্রগতির জন্য এখন অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের আজকের উদ্যোগ আগামী দিনের ভ্যারিয়েন্টগুলো মোকাবিলায় আমাদের কর্মপন্থার ভুল-ত্রুটি সংশোধন করতে পারে এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর মডেল তৈরি করতে পারে। বিশ্বনেতাদের কাছে এখনো সময় আছে স্বাস্থ্যসেবায় পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা—যা কতিপয় ওষুধ কোম্পানির মুনাফার চেয়ে মানুষের জীবনকে প্রাধান্য দেবে, তার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০০৬ বিজয়ী

Comments

The Daily Star  | English

Sundarbans cushions blow

Cyclone Remal battered the coastal region at wind speeds that might have reached 130kmph, and lost much of its strength while sweeping over the Sundarbans, Met officials said. 

7h ago