স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাফিক সিগন্যাল

১১৯ কোটির প্রকল্প কোনো কাজেই আসে না

গত ১৫ বছরে ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা উন্নয়নে সরকার খরচ করেছে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা। এই পরিকল্পনায় রাজধানীর ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমের আধুনিকায়নের জন্য কিছু উচ্চাভিলাষী পরীক্ষা-নিরীক্ষাও ছিল। এর মধ্যে রয়েছে সিগন্যাল লাইট ডিজিটাল করা এবং কিছু ব্যস্ততম মোড়ে টাইমার কাউন্টডাউন ও ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা।

গত ১৫ বছরে ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা উন্নয়নে সরকার খরচ করেছে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা। এই পরিকল্পনায় রাজধানীর ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমের আধুনিকায়নের জন্য কিছু উচ্চাভিলাষী পরীক্ষা-নিরীক্ষাও ছিল। এর মধ্যে রয়েছে সিগন্যাল লাইট ডিজিটাল করা এবং কিছু ব্যস্ততম মোড়ে টাইমার কাউন্টডাউন ও ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা।

কিন্তু কোনো পরিকল্পনায় কাজ হয়নি বলে প্রতিয়মান হয়। কেননা, দেড় কোটিরও বেশি মানুষের এই নগরীতে যানজট যেমন বিশৃঙ্খল ছিল তেমনই রয়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে, এটি আরও খারাপ হয়েছে। কারণ ট্রাফিক পুলিশ সেই পুরানো ব্যবস্থায় হাত দিয়েই যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছেন।

দড়ি, কোন ও বাঁশের বেড়াও ব্যবহার করা হয় এই শহরের ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে।

নামবিও প্রকাশিত বিশ্ব ট্রাফিক ইনডেক্স-২০২০ এ ২২৮টি শহরের মধ্যে দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে ঢাকার অবস্থান দশম স্থানে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুসারে, গত বছর শুধু ঢাকা শহরে যানজটের কারণে দেশের আনুমানিক ৫৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে।

নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অবাস্তব প্রকল্প এবং রাস্তার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত নতুন যানবাহনের অনুমতি দেওয়াকে দায়ী করেছেন।

রাস্তার বেহাল দশা, দুর্বল পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাপনা, বেহাল হেঁটে চলার পথ এবং পেশিচালিত যানবাহন এই যানজট পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলছে।

অনেক ক্ষেত্রে, যানবাহনের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এবং রাস্তার অবস্থা বিবেচনা না করেই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম একটি তামাশায় পরিণত হয়েছে।'

তিনি জানান, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার যানবাহনের পরিমাণ সেই বছরে রাস্তার ক্ষমতার চেয়ে দেড়গুণ বেশি ছিল।

পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) নিবন্ধিত অন্তত ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৯৭টি মোটরযান রয়েছে কেবল ঢাকায়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, একটি আধুনিক শহরের জন্য এর আয়তনের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়কের নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। ঢাকার সড়ক নেটওয়ার্ক আয়তনের মাত্র ৮ শতাংশ।

ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা

২০০১ সালে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের অধীনে স্বয়ংক্রিয় সংকেত প্রবর্তনের মাধ্যমে ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০১-০২ সালে ৯টি এবং ২০০৫ সালে ৫৯টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়।

২০০৬ সালে সরকারকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানায়, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ২০১২-১৩ সালে, ঢাকার ২ সিটি করপোরেশন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরেকটি প্রকল্পের আওতায় ৭০টি ক্রসিংয়ে সোলার প্যানেল এবং টাইমার কাউন্টডাউন সিস্টেম যুক্ত করে।

প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে, ২০১১-১২ সালে ১৫ কোটি টাকায় সোলার প্যানেল ও টাইমার কাউন্টডাউন স্থাপন করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপে ২০১৩ সালে নতুন সিগন্যাল লাইট স্থাপনে আরও সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়।

কিন্তু ট্রায়ালেই ব্যর্থ হয়ে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ বাধ্য হয় নতুন সিগন্যাল সিস্টেম বাদ দিয়ে পুরনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ফিরে যেতে।

সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, 'একটি ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার ভিত্তিতে সিস্টেমটি শুরু করা হয়েছিল। সে সময় ট্রাফিকের পরিমাণ এবং গতি বিবেচনা করা হয়নি।'

সিটি করপোরেশন পরে সিগন্যাল লাইট ব্যবহারের জন্য রিমোট কন্ট্রোল চালু করলেও পরীক্ষাটি এক মাসও স্থায়ী হয়নি।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, 'কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই তারা টাইমার কাউন্টডাউন এবং সৌর প্যানেল চালু করেছে। সম্ভবত, প্রকল্পের আকার বড় করতেই এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আমরা এখানে সুশাসনের অভাব দেখতে পাচ্ছি।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা রাস্তার ধারণক্ষমতা বিবেচনা না করেই নতুন নতুন যানবাহন চলাচলের অনুমতি দিচ্ছি। যানবাহনের এই চাপে কোনো সিগন্যাল সিস্টেমই কাজ করবে না। আমাদের আগে রাস্তার ধারণক্ষমতা এবং যানবাহনের সংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখার কথা ভাবতে হবে।'

ইতোমধ্যে ১৭টি বড় এবং ১৪টি ছোট ডিজিটাল বোর্ড ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক নিয়ম ও গতিসীমা প্রদর্শনে বসানো হয়। কিন্তু এগুলো অনেকাংশেই উপেক্ষিত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ডিসপ্লে স্থাপন করেছে।

মেট্রোরেল এবং ইউলুপ নির্মাণের মতো চলমান প্রকল্পের জন্য এর অনেকগুলো সরিয়েও ফেলা হয়েছে৷

২ বছর আগে ট্রাফিক সিগন্যাল মনিটরিং ব্যবস্থার 'অব্যবস্থাপনা' নিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

নির্দেশের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এখনো প্রতিবেদনটি তৈরি করতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

তাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মনিবুর রহমান বলেন, কমিটির কাজ শেষ হলে তারপর তিনি মন্তব্য করতে পারবেন।

ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম

৬ বছর আগে সরকার ঢাকার পল্টন, ফুলবাড়ী, মহাখালী এবং গুলশান ১ নম্বর ক্রসিংকে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্য আরও উন্নত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই চৌরাস্তাগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্যই এই প্রকল্প শুরু করা হয়।

ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম (আইটিএস) নামের এই প্রকল্পের কাজ ২০১৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আজ পর্যন্তও তা চালু হয়নি।

বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের যৌথ উদ্যোগের প্রকল্পটির জন্য এ পর্যন্ত ৪ বার সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে এর ব্যয়ও। সর্বশেষ ২০১৯ সালে এর মেয়াদ বৃদ্ধির সময় এর আনুমানিক ব্যয় দাঁড়ায় ৫২ কোটি টাকায়। অথচ, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

২০১৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে আল্ট্রাসনিক ভেহিক্যাল ডিটেক্টর, ভেহিকল ইমেজ ডিটেক্টর, সিসিটিভি ট্র্যাফিক ভলিউম ট্র্যাক এবং ট্র্যাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইটিএস সিস্টেম ৪টি ক্রসিংয়ে স্থান করা হয়।

পরের বছর, জাপান থেকে আইটিএস সফটওয়্যারসহ দুটি বিশেষ কম্পিউটার আনা হয়। তবে এর মধ্যে একটি স্থাপনের আগেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) গুদাম থেকে চুরি হয়ে যায়।

চুরির পর ২ বছরের জন্য প্রকল্পটি স্থগিত করার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের মোট ব্যয় না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বাজেট সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সার্ভার সংগ্রহের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে একটি প্রস্তাব পাঠানোর পর আবার এর কাজ শুরু হয়।

কোনো ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের সময়সীমা ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।

প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল আলম জানান, তারা এই প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়িয়ে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত করার আবেদন করছেন।

বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।

যানবাহনের সংখ্যা এবং এর অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে ডিজিটাল ট্র্যাফিক সিগন্যালগুলো যানজট কমাতে খুব বেশি সহায়ক হবে না বলে তারা মন্তব্য করেছেন।

এআরআই-এর সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. শিফুন নেওয়াজ বলেন, 'ঢাকায় ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যকরী করা খুবই কঠিন।'

যানজট কমাতে তিনি ক্রসিং কমানোর এবং সার্কুলার রোড তৈরির পরামর্শ দেন।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, পিক আওয়ারে গাড়ির অত্যধিক চাপ ডিজিটাল সিগন্যাল সিস্টেম ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ।

তিনি জানান, যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয় তাহলে কম খরচের সিগন্যাল সিস্টেমও কার্যকর হতে পারে। তিনি ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে ট্রাফিক পুলিশ যানবাহনের চাপের ওপর ভিত্তি করে ম্যানুয়ালি সিগন্যাল লাইট পরিচালনা করে।

'কিন্তু আমাদের দেশের কর্তৃপক্ষ একটি সিগন্যাল সিস্টেম তৈরি করেছে এই ভেবে যে, এটা সবকিছুর সমাধান করে দেবে। বাস্তবতা হলো, এই সিস্টেমটি শুধুমাত্র পুলিশের কাজের চাপ কমাবে, সমস্যা নয় ' যোগ করেন তিনি।

Comments

The Daily Star  | English
Depositors’ money in merged banks will remain completely safe: Bangladesh Bank

Depositors’ money in merged banks will remain completely safe: BB

Accountholders of merged banks will be able to maintain their respective accounts as before

2h ago