আমি ১৭ কোটি মানুষের হিরো

১৯৬০ সালের মাঝামাঝি চলচ্চিত্রে নায়করাজ রাজ্জাকের অভিষেক হয়। এ সময়ে ভাগ্যান্বেষণে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও ‘বেহুলা’ই তার প্রথম সুপারহিট ছবি।
Razzak
নায়করাজ রাজ্জাক, ছবি, সংগৃহীত

১৯৬০ সালের মাঝামাঝি চলচ্চিত্রে নায়করাজ রাজ্জাকের অভিষেক হয়। এ সময়ে ভাগ্যান্বেষণে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও ‘বেহুলা’ই তার প্রথম সুপারহিট ছবি। ‘নাচে মন ধিনা ধিনা’ গানটির সঙ্গে তাঁর নাচ ও রোম্যান্টিক উপস্থাপনা তাঁকে সিনেমাপ্রেমী দর্শকের মনে স্থায়ী আসন করে দেয়। তাঁর মিষ্টি চেহারা আর রোম্যান্টিক চাপল্য সে সময়কার তরুণ-তরুণীর মনকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে। উত্তম-সূচিত্রার সর্বোপ্লাবী জোয়ারের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি প্রায় একাই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে দাঁড় করান। প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান ‘কী যে করি’ সিনেমার জন্য। এরপর চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন এই বরেণ্য অভিনেতা।

বাংলা চলচ্চিত্র মানেই নায়করাজ রাজ্জাক। তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস কল্পনা করা সম্ভব না। চলচ্চিত্রের গভীর থেকে অনেক গভীরে তাঁর শিকড়। অনেক কিছু দিয়েছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে। সেই নায়করাজের ৭৬তম জন্মবার্ষিকী আজ। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন জাহিদ আকবর

 

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: জন্মদিনের দিনটিতে আপনার কোটি কোটি ভক্তদের জন্য কী বলতে চান?

রাজ্জাক: সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাতে চাই। আমার ৭৬তম জন্মদিনে যতটা ভালোবাসা পেয়েছি তাতে নিজেকে অনেক গর্বিত মনে হচ্ছে। আমি একজন বাংলাদেশি শিল্পী। বুকের মধ্যে আমার বাংলাদেশ। এ দেশ আমার। এ দেশের মানুষ আমাকে ভালোবাসে।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: একজন শিল্পী, স্বামী ও পিতা হিসেবে কোনটাতে নিজেকে এগিয়ে রাখবেন?

রাজ্জাক: শিল্পী হিসেবে সবসময় নিজেকে এগিয়ে রাখব। তারপর একজন পিতা। আমার সংসার আছে। একজন বড় শিল্পী হবো এটা আমার আকাঙ্খা ছিল। সেটা হয়েছে। ভালো একজন পিতা হবো। সেটা কেন জানি আমার স্ত্রীর সহযোগিতায় হতে পেরেছি। ভালো বন্ধু হবো, সেটা হয়েছে যাঁদের সঙ্গে ১৯৬৪ সাল থেকে বন্ধুত্ব হয়েছে সেটা এখনো অটুট রয়েছে। এঁদের মধ্যে অনেকে চলে গেছেন। সেখানে কোনো বিচ্ছেদ হয়নি। আমার জীবনে অপূর্ণতা বলতে কিছু নেই। আজকের দিনে মনে হচ্ছে যুদ্ধ করে যে চলচ্চিত্রকে দাঁড় করিয়েছিলাম সেটা এখন আর নেই। নেই বলা ঠিক হবে না। তবে ধ্বংসের মুখে চলে গেছে। এই দুঃখটা রয়ে যাচ্ছে।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আপনার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার যে স্বপ্নটা নিয়ে শুরু করেছিলেন তার সবটাই কি পূরণ হয়েছে?

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আমি কিন্তু বলিউড কিংবা হলিউডের অভিনেতা না, ঢালিউডের একজন হিরো, আমাদের লিমিটেশন আছে। সীমিত সম্পদ। তার মাঝখানে ছোট্ট একটা স্টুডিওর মধ্যে কাজ করে এতটা পথ এসেছি। সেখান থেকে অল্প-স্বল্প যন্ত্রপাতি নিয়ে সিনেমা করেছি। দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে সম্মান পেয়েছি। ভারতে গিয়ে সিনেমা করেছি। সেখানে আমার অতৃপ্ত থাকার কথা না। দেশের জন্য অনেক তাগিদ অনুভব করি। দেশ নিয়ে অনেক গর্ব করি। এখানে আমার না পাওয়ার আর কিছু নেই। ভালো পরিচালক, ভালো সিনেমা, ভালো অভিনেত্রী, ভালো বন্ধু পেয়েছি। একটা সময় ৭ কোটি মানুষের হিরো ছিলাম, এখন ১৭ কোটি মানুষের হিরো আমি। আর কী লাগে এক জীবনে। এখনকার জেনারেশন হয়তো সিনেমা হলে যায় না কিন্তু তারা টিভিতে আমার সিনেমা দেখে। এটাতে অনেক গর্ববোধ করি।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: এখনকার চলচ্চিত্র নিয়ে অনেকে হতাশ। এই অবস্থাটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রাজ্জাক: চলচ্চিত্র নিয়ে এখন অনেকে হতাশ হয়ে পড়েছে। আমি বলবো একটা সময় আমরা পরিচালক-অভিনেতারা উর্দু সিনেমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম। এখনকার পরিচালক-অভিনেতারা যদি অভাব-অনটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাহলে সামনে তারা অবশ্যই জয়ী হবে। এখন তেমন একটা যোদ্ধা নাই। ভালো ছবি হলে মানুষ অবশ্যই হলে যাবে। ‘মনপুরা’, ‘আয়নাবাজি’ মানুষ দেখেছ।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: নায়করাজ রাজ্জাক হতে হলে কি করতে হবে নতুনদের?

রাজ্জাক: আমার মতো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। অভিনয় ভালোভাবে শিখতে হবে। নাটকে অভিনয় করতে হবে। এসেই জনপ্রিয় হওয়ার কথা চিন্তা করলে হবে না। কঠোর অধ্যবসায় থাকতে হবে। ত্যাগ করতে শিখতে হবে। তাহলে একটা কিছু হতে পারে।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আগের জন্মদিন আর এখনকার জন্মদিনের মধ্যে পার্থক্যটা কী বলে মনে করেন আপনি?

রাজ্জাক: আগে আমার জন্মদিনে ফিল্মের সবাই আসত আমার বাসায়। সেটা ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত। আমার বন্ধুরা সবাই থাকত সেখানে। এখনকার জন্মদিনটা আমি উপভোগ করি। আমার দেখতে অনেক মানুষ আসেন। আমাকে দোয়া করে যান।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: চলচ্চিত্রের পরিবেশ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

রাজ্জাক: শুধু এতটুকু বলি, আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গনে আর আগের মতো পরিবেশ নেই। কারিগরি দিক থেকে আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু আগের মতো চলচ্চিত্র একটি পরিবারের মতো নেই। সবাই যার যার মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করছে। খুব অবাক লাগে, চলচ্চিত্র নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম, কত কষ্ট আর যুদ্ধ করে চলচ্চিত্র শিল্পকে দাঁড় করালাম, আজ সেটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ৮০ ভাগ ছবিই হিটের তালিকায় থাকত, আর এখন নতুন ছবি মানেই গায়ে ব্যর্থতার তকমা। জানি না এ থেকে উত্তরণ কবে হবে। তবে এদিকে তাকালে বুকের ভেতর বেশ কষ্ট লাগে। এরমধ্যে মানুষ ‘মনপুরা’ ও ‘আয়নাবাজি’ কিন্তু দেখেছে। ভালো চলচ্চিত্র হলে মানুষ আবশ্যই দেখবে।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: দুই সন্তানকে অভিনয়ে নিয়ে এসেছেন। তাদের পরিচালনায় অভিনয় করেছেন। কেমন লাগছে?

রাজ্জাক: আমার জন্য এটা অনেক গর্বের বিষয় যে, আমার দুই সন্তান আমার পথ অনুসরণ করেছে। এই দিনগুলো আমার কাছে নতুন নয়। অবশ্যই স্বপ্ন দেখেছিলাম। প্রথমে অভিনয়, এখন পরিচালনা করছে, আমি ওদের পরিচালনায় কাজ করছি। একজন অভিনেতা পিতার কাছে এর চেয়ে আনন্দের ঘটনা আর কী হতে পারে!

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: যখন নায়ক ছিলেন তখন ছিল সিনেমার স্বর্ণযুগ। এফডিসি ছিল আপনার দ্বিতীয় সংসার। এর বীজমন্ত্র কী?

রাজ্জাক: বীজমন্ত্র কিছু না। এই মাধ্যমটাকে (চলচ্চিত্র বা অভিনয়) আমি ভালোবাসি। আমার স্বপ্ন আর প্রেম ছিল অভিনয়কে ঘিরে। হ্যাঁ, সংসার ছিল আমার, সন্তান-সন্ততি ছিল। কিন্তু ওগুলো ছিল সেকেন্ডারি। প্রথমে ছিল অভিনয়। কীভাবে অভিনয়টা ঠিকঠাক করা যায়, এ নিয়েই ধ্যান-জ্ঞান ছিল। আর আমি টাকার পেছনে ঘুরিনি, টাকা আমার পেছনে ছুটেছে। এখন হয়ে গেছে উল্টো। অধিকাংশ মানুষই টাকার পেছনে ঘুরছে।

সবচেয়ে বড় কথা আমি সংযত থাকতে শিখেছি। কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম, এই ভাবনা আমার মধ্যে সবসময় জাগ্রত ছিল। নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকা সবার জন্যই জরুরি। আমার ব্যক্তিগত কিংবা অভিনয় জীবনে কোথাও কলঙ্ক লাগতে দেইনি। সবই সম্ভব হয়েছে আমার ভক্ত ও দর্শকদের সুবাদে। তাদের প্রতি আমি সবসময় কৃতজ্ঞ থেকেছি। তাদের ভালোবাসার সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রের উন্নতি করা। অনেক যুদ্ধ করেছি আমরা। উর্দু ফিল্মের বিরুদ্ধে বাংলা ছবির সুদিন ফেরাতে অনেক চেষ্টা করতে হয়েছে। চলচ্চিত্রে এখন তেমন যোদ্ধা নাই যারা যুদ্ধ করে ভালো সিনেমা বানাবে।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: অনেক কালজয়ী নির্মাতা আপনাকে নিয়ে ছবি বানিয়েছেন, সফল হয়েছেন। আপনার কী কখনো মনে হয় যে, কিছু ছবিতে অভিনয় না করলেও হতো?

রাজ্জাক: মনে হয়। কিন্তু সেটা তীব্র নয়। খ্যাতিমান পরিচালকরা আমাকে নিয়ে সাহিত্যনির্ভর কিংবা সুন্দর গল্প বলেছেন। পাশাপাশি এমন কিছু ছবিতে আমাকে অভিনয় করতে হয়েছে যেগুলো তখন চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচানোর জন্য দরকার ছিল। সে সময় যাদের ছবিতেই অভিনয় করেছি তাদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ছবিকে এগিয়ে নেয়া। আমাকে সামনে রেখে তারা সেই কাজটা সহজভাবে করতে পেরেছিলেন।

আমি চলচ্চিত্রে আসার আগেও এই চেষ্টা করা হয়েছে। তখন ছিলেন আনোয়ার হোসেন, রহমান, খলিল, শওকত আকবর, হাসান ইমাম সাহেব প্রমুখ। তাঁরা উর্দু-বাংলা দুই ভাষার ছবিতেই অভিনয় করেছেন। আমি আসার পর বাংলা ছবির জোয়ারটা লাগল। খান আতাউর রহমান, জহির রায়হান, কাজী জহির, আলমগীর কুমকুম, নারায়ণ ঘোষ মিতা, জহিরুল হক, নজরুল ইসলাম, আজিজুর রহমান – এমন অনেক গুণী পরিচালক তখন ছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন, দর্শক চাহিদা যেহেতু আছে, ছবিগুলো একের পর এক চলুক, বাংলা ছবির দর্শক বাড়ুক। সেটাই হয়েছিল। আমি শুধু চেষ্টা করেছি। আর আমার তেমন কোনো ছবি ফ্লপ যায়নি।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আপনি কী ভাগ্যে বিশ্বাস করেন? আপনার ঈর্ষণীয় চলচ্চিত্র জীবনের পেছনে ভাগ্য কতটা সহায় ছিল বলে মনে করেন?

রাজ্জাক: ভাগ্য তো আছেই। তবে ভাগ্যে আছে বলে বসে থাকলে চলবে না। ভাগ্যকে গড়ার দায়িত্ব যার যার নিজের। এজন্য খাটতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে, সৎ থাকতে হবে।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আপনার সমবয়সী অনেক শিল্পীই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর স্বাদ সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যু নিয়ে নিশ্চয়ই ভাবনা হয়!

রাজ্জাক: আমি আগেও অনেক জায়গায় বলেছি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে থাকতে চাই। মৃত্যু নিয়ে ভাবনা তো হয়। কিন্তু মৃত্যুকে ভয় পাই না। শুধু চাই আমার যেন কষ্টদায়ক মৃত্যু না হয়। কাজ করতে করতে যেন আরামদায়ক মৃত্যু হয় আমার।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: এবার একটা মজার প্রশ্ন করি। ধরুন, আপনাকে নির্বাসনে পাঠানো হলো। প্রিয় একজনকে সঙ্গে নিতে পারবেন। তিনি কে?

রাজ্জাক: প্রিয় মানুষ তো অনেক, কয়জনকে সঙ্গে নেবো! এর চেয়ে এই ভালো, এমন একজনকে নেবো যে কথা বলতে পারে না (হা হা হা)।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আপনার বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র জীবন। এ ব্যাপারে ছোট-বড় সবারই আগ্রহ আছে। আত্মজীবনী লিখছেন?

রাজ্জাক: হ্যাঁ, আত্মজীবনী লিখছি। কাজটা অনেক দূর এগিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে লিখছি না।

দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন: আপনাকে ধন্যবাদ।

রাজ্জাক: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

Comments

The Daily Star  | English

International Mother Language Day: Languages we may lose soon

Mang Pru Marma, 78, from Kranchipara of Bandarban’s Alikadam upazila, is among the last seven speakers, all of whom are elderly, of Rengmitcha language.

7h ago