বড় হাতের ‘A’, ছোট হাতের ‘a’—ইংরেজি বর্ণমালায় এই দুই রূপ কেন?
ইংরেজি বর্ণমালায় একই অক্ষরের দুটো রূপ দেখে অনেকেরই প্রশ্ন জাগে, বড় হাতের ‘A’ আর ছোট হাতের ‘a’ কেন? দেখতে ভিন্ন লাগলেও উচ্চারণেও তো কোনো পার্থক্য নেই।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলাসহ আরও অনেক ভাষায় তো বড় হাতের-ছোট হাতের অক্ষর লিখতে হয় না। বাংলা ভাষায় অ, আ, ক, খ—প্রতিটি বর্ণের একটিই রূপ দেখা যায়। তাহলে ইংরেজিতে কেন একই অক্ষরের দুটি আলাদা রূপের দরকার হলো?
ভাষাবিদদের মতে, এই পার্থক্য কেবল লেখার সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়। এর পেছনে আছে কয়েক হাজার বছরের লিখনশৈলীর বিবর্তন।
যখন সব অক্ষরই ছিল বড় হাতের
ইংরেজি বর্ণমালার উৎস লাতিন (রোমান) বর্ণমালা। আর লাতিন বর্ণমালার উৎস গ্রিক, তারও আগে ছিল ফিনিশীয় লিপি।
তবে প্রাচীন লাতিন লেখায় আজকের মতো বড় ও ছোট হাতের অক্ষরের কোনো বিভাজন ছিল না। তখন সব লেখা হতো কেবল এক ধরনের বড় আকারের অক্ষরে, যেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় বলা হয় ‘ম্যাজুসকিউল’।
খ্রিষ্টীয় ৩০০ থেকে ৭০০ অব্দের দিকে লাতিন ও গ্রিক লেখকেরা এক বিশেষ ধরনের গোলাকার ম্যাজুসকিউল লিপি ব্যবহার করতেন। এর নাম ছিল ‘আনসিয়াল’।
অনেক ভাষাবিদ বলেন, লাতিন ‘আনসিয়ালিস' (যার অর্থ এক ইঞ্চি বা এক আউন্সের সমান) থেকে এই লিপির নামকরণ।
মজার ব্যাপার হলো, আজকের মতো শব্দের মাঝে ফাঁকা জায়গা (স্পেস) বা আধুনিক বিরামচিহ্নের ব্যবহারও তখন গড়ে ওঠেনি। ফলে পড়তেও বেশ ঝামেলা হতো।
ছোট হাতের অক্ষর এলো যেভাবে
মধ্যযুগে ইউরোপে বইয়ের চাহিদা ও লেখার পরিধি বাড়তে শুরু করে। তখন বই নকল করার সিংহভাগ কাজই হতো বিভিন্ন উপাসনালয়ে। সেখানে সন্ন্যাসীদের দিন-রাত পৃষ্ঠা পর পৃষ্ঠা হুবহু হাতে লিখে কপি করতে হতো।
দ্রুত ও নিখুঁতভাবে লিখতে গিয়ে লেখকদের হাতের টানে অক্ষরের জ্যামিতিক ও কোণাকৃতির কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কলম দ্রুত চালাতে গিয়ে অক্ষরের কোণাগুলো স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ছোট ও গোল রূপ নিতে থাকে। পরে এই রূপটিই ধীরে ধীরে প্রচলিত হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে লেখার উপাদানের পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রেখেছিল। আগে লেখকেরা প্যাপিরাসের (উদ্ভিদের কাণ্ড দিয়ে তৈরি লেখার পাতা) খসখসে পাতায় লিখতেন। পরে একসময় তারা পার্চমেন্ট ও ভেলোমের (পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি মসৃণ পাতা) মতো মসৃণ মাধ্যমে লিখতে শুরু করলেন। ওই সময় একাধিক টানের পরিবর্তে এক টানে গোল করে অক্ষর ফুটিয়ে তোলা অনেক সহজ হয়ে গেল।
নবম শতকে ক্যারোলিনজিয়ান মিনিসকিউল নামে ছোট হাতের অক্ষরের একটি মানসম্মত রূপ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সম্রাট শার্লেমেন ও ক্যারোলিনজিয়ান বিপ্লব
আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ফ্রাঙ্কিশ সম্রাট শার্লেমেন শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিনি রাজকীয় ও শিক্ষামূলক নথিপত্র সংরক্ষণের সুবিধার্থে পুরো সাম্রাজ্যের জন্য লিখন পদ্ধতিকে প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ডাইজড করার নির্দেশ দেন।
তার পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয় ‘ক্যারোলিনজিয়ান মিনিসকিউল’ নামক লিখনরীতি। এটি লেখা ও পড়া—উভয় দিক থেকেই ছিল সহজ। ফলে সাধারণ মানুষের কাছেও বইয়ের ভাষা আরও সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।
ধীরে ধীরে লেখকেরা একই শব্দের ভেতরে ছোট হাতের অক্ষরের পাশাপাশি বিশেষ কোনো বিষয়ে জোর দিতে বা লেখার শুরুতে বড় হাতের লাতিন অক্ষরের মিশ্রণ ঘটাতে শুরু করেন।
তবে আধুনিক ইংরেজির ক্ষেত্রে বড় হাতের অক্ষর ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণগত নিয়ম কিন্তু খুব বেশি পুরোনো নয়। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ধীরে ধীরে আধুনিক নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর আগে ওল্ড মিডল-ইংলিশ ও অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষায় অনেকটা বর্তমান জার্মান ভাষার মতোই সব বিশেষ্য এবং নামের প্রথম অক্ষর বড় হাতের লেখার চল ছিল। এটি কালক্রমে বদলে গিয়ে আজকের নিয়মে দাঁড়িয়েছে।
বড়-ছোট অক্ষরের প্রয়োজনীয়তা কী?
ইংরেজিতে কোনো শব্দ বড় হাতের অক্ষরে লেখা হলে তা বিশেষ গুরুত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা বা আলাদা পরিচয় বহন করে।
ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার হলো বাক্যের শুরুতে। যেমন ‘The sun rises in the east’, এখানে বাক্যের প্রথম অক্ষর ‘T’ বড় হাতের।
এ ছাড়া মানুষের নাম, দেশের নাম, শহরের নাম, প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট স্থান বা বিশেষ কোনো নাম বোঝাতেও বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার করা হয়। যেমন—Bangladesh, Dhaka, Kazi Nazrul Islam।
এর ফলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন কোন শব্দটি সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, আর কোনটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থান বা প্রতিষ্ঠানের নাম।
সাধারণ অর্থে ‘apple’ মানে একটি ফল। কিন্তু বড় হাতের 'A' দিয়ে 'Apple' লিখলে পাঠক বুঝে নেবে এটা একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম।
ভাষাবিদদের মতে, সব শব্দ যদি বড় হাতের অক্ষরে লেখা হতো, তাহলে চোখের জন্য তা একঘেয়ে ও কঠিন হয়ে উঠত। ছোট-বড় অক্ষরের পার্থক্য লেখার মধ্যে একটি ছন্দ তৈরি করে এবং পাঠককে দ্রুত শব্দ আলাদা করতে সাহায্য করে।
আবার ইন্টারনেট যোগাযোগে পুরো শব্দ বড় হাতের অক্ষরে লেখা হলে অনেক সময় সেটিকে ‘জোর দিয়ে বলা’ বা চিৎকার করার মতো মনে করা হয়। যেমন ‘STOP’ শব্দটি শুধু থামা বোঝায় না, বড় হাতের লেখার কারণে সতর্কতার অনুভূতিও তৈরি করে।
অন্যান্য ভাষায় এই বৈচিত্র্য আছে কি?
বিশ্বের সব ভাষায় কিন্তু এমন রূপভেদ নেই। বাংলা, আরবি, চীনা, জাপানি, কোরিয়ান কিংবা হিব্রুর মতো লিপিগুলোতে বড় বা ছোট হাতের অক্ষরের কোনো ধারণা নেই। কারণ এসব লিপির ঐতিহাসিক বিকাশ হয়েছে ভিন্নভাবে। এগুলোকে বলা হয় ‘ইউনিক্যাস’ লিপি।
যেমন বাংলায় ‘ক’ বা ‘ম’-এর আকৃতির কোনো ঐতিহাসিক বিবর্তনের প্রয়োজন পড়েনি। বাংলায় গুরুত্ব বা নামবাচক শব্দ বোঝাতে আমরা বাক্যের প্রসঙ্গ, অর্থ কিংবা উদ্ধৃতি চিহ্নের সাহায্য নিই।
এমনকি ইংরেজি ‘I’ (আমি) শব্দটিকে যে আমরা সবসময় বড় হাতের অক্ষরে লিখি, তাও কিন্তু এক ধরনের ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন। ব্যাকরণগতভাবে এর কোনো প্রয়োজন নেই। মধ্যযুগে এই শব্দটি এক অক্ষরে নেমে এলে সেটিকে চোখে পড়ার মতো রাখতে বড় হাতের লেখার রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইংরেজি ছাড়াও লাতিন লিপি ব্যবহারকারী ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, ইতালীয়, গ্রিক ও ইউরোপের বেশিরভাগ ভাষায় বড়-ছোট অক্ষরের ব্যবহার আছে। যেমন গ্রিক বর্ণমালার আলফা (Α, α), বিটা (Β, β)–এর মতো দুটি রূপ দেখা যায়।
জার্মান ভাষায় সব বিশেষ্যের প্রথম অক্ষর বড় হাতের লেখা হয়, যা ইংরেজিতে হয় না।
মূলত কয়েক হাজার বছরের লিখনশৈলীর বিবর্তন ও ব্যবহারের সুবিধার্থেই ইংরেজি বর্ণমালায় বড় ও ছোট অক্ষরের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।