ছয় শব্দের পোস্ট থেকে ভারতের প্রথম জেন-জি আন্দোলন, যে আগুনের আঁচ পাননি মোদি
ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন শুধু একটি পরীক্ষা বা শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, সরকারি জবাবদিহি এবং মোদি সরকারের শাসনক্ষমতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছে এই আন্দোলন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক বিশ্লেষণে বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ভারতের সবচেয়ে বড় ছাত্রসমাবেশে পরিণত হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনের সূচনা হয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ থেকে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার।
গত সোমবার কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে মিছিল করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং বলপ্রয়োগ করে। এরপর থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষে সরকারের আশ্বাসে অনশন ভাঙলেও ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
এই আন্দোলন কেন আলাদা?
বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া বড় আন্দোলনগুলো—যেমন নাগরিকত্ব আইন বা কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলন মূলত আদর্শিক বা নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সিজেপির আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ভিজিটিং ফেলো ইয়ামিনি আয়ারের ভাষায়, ভারতের পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা জাত, শ্রেণি ও লিঙ্গের বিভাজন অতিক্রম করে বিপুলসংখ্যক তরুণকে প্রভাবিত করে। ফলে এই আন্দোলন কোনো একক স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে না।
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল ভার্মা মনে করেন, এটি মূলত সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আন্দোলন। তার মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া সরকারের শাসনক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য নতুন ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণই বিজেপির স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নন। বরং তারা এবং তাদের পরিবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান পথ হিসেবে দেখেন। ফলে এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথে
গত দুই সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজেপির ব্যাপক প্রচারণা দেখা গেলেও অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, অনলাইনের এই সমর্থন বাস্তবে রাজপথে নামবে কি না। সোমবারের বিক্ষোভ সেই সন্দেহ অনেকটাই দূর করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়োজিৎ পাল বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ দ্রুত বিস্ফোরিত হতে পারে।
তার মতে, সরকারের জবাবদিহির অভাব নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষই এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটিয়েছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
প্রথম দিকে সরকারের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ ছিল মন্ত্রী ও দলের মুখপাত্রদের বক্তব্যে। পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বিরোধীদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলেন।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা হবে এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হবে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, কেবল আইন প্রণয়ন নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় রাজনৈতিক দায়ও নির্ধারণ করতে হবে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে।
এই ক্ষোভ কি আরও বড় কিছু?
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের পেছনে শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ কাজ করছে।
ইয়ামিনি আয়ার বলেন, ধীরগতির অর্থনীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে। তার মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা এই ক্ষোভকে আরও তীব্র করেছে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ মজুমদারেরও মত, এই বিক্ষোভ দেশের তরুণদের বিস্তৃত অসন্তোষের প্রতিফলন। তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ের অন্যান্য ছাত্র আন্দোলনের তুলনায় এটি পরিসর ও অংশগ্রহণ—উভয় দিক থেকেই বড়।
তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুহাস পালশিকার সতর্ক করে বলেছেন, আন্দোলনটি শেষ পর্যন্ত কৃষক আন্দোলনের মতো ধীরে ধীরে স্তিমিতও হয়ে যেতে পারে। তার মতে, এটিকে এখনই ‘জেন-জি বিদ্রোহ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র এখনো পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে।
তবু তার পর্যবেক্ষণ, এই আন্দোলন অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ভারতের তরুণরা রাজপথে নেমে সরকারের জবাবদিহি দাবি করতে প্রস্তুত।
বিবিসির মূল্যায়ন, সিজেপির আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি ক্ষণস্থায়ী জনঅসন্তোষ হিসেবেই মিলিয়ে যাবে—তার উত্তর সময়ই বলে দেবে।
এক্সের ছয় শব্দ থেকে জাতীয় আন্দোলনের মুখ: অভিজিৎ দীপকের উত্থান
‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে আসে?’
এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখা মাত্র ছয়টি শব্দ। ক্ষোভের মুহূর্তে করা এই পোস্টই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলনের সূচনা করবে—এমনটি হয়তো কল্পনাও করেননি ৩০ বছর বয়সী রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপকে।
রয়টার্স বলছে, আজ তিনিই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। নিট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলা দেশব্যাপী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
বিচারপতির মন্তব্য থেকে ভাইরাল পোস্ট
গত ১৬ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এক বক্তব্যে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেন। পরে তিনি বলেন, তার মন্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কিন্তু এরইমধ্যে দীপকের সেই পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকেই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) জন্ম হয়।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারি জবাবদিহির দাবিতে ক্ষুব্ধ লাখো তরুণের মিলনমঞ্চে পরিণত হয়।
বোস্টন থেকে দিল্লির রাজপথে
জুনের শুরু পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ছিলেন দীপকে। সেখান থেকে ভারতে ফিরে এসে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শুরু করেন।
বিশেষ করে গত সোমবার পুলিশের দমন-পীড়নের পর তিনি আন্দোলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ হয়ে ওঠেন। টি-শার্ট ও জিন্স পরিহিত দাড়িওয়ালা দীপকেকে প্রতিদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়।
গত সপ্তাহে এক নারী তার মুখে নীল কালি নিক্ষেপ করেন। পরে ওই নারী অভিযোগ করেন, সিজেপি হিন্দু দেবতা রামকে অপমান করেছে। ঘটনার পর দীপকে নীল কালি মাখা নিজের ছবি প্রকাশ করে লেখেন, ‘নীলই আমার রং’—যা দলিত নেতা ও ভারতের সংবিধানের প্রধান রূপকার বি আর আম্বেদকরের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
দলিত পরিবার থেকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা
মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদে একটি দলিত পরিবারে জন্ম দীপকের। তিনি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার বাবা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন এবং তার দাদা ছিলেন কৃষক।
নিজের দলিত পরিচয় তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বলে জানান দীপকে। ৬ জুন দিল্লিতে পৌঁছানোর সময় তার হাতে ছিল আম্বেদকরের আত্মজীবনীর একটি কপি।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
২০২০ সালে দীপকে আম আদমি পার্টির (এএপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমে যোগ দেন। সেখানে মিম, রসিকতা ও ব্যঙ্গ ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা ছড়ানোর কৌশল রপ্ত করেন।
বর্তমানে তিনি এএপির সঙ্গে যুক্ত নন। তবে এএপিসহ ভারতের কয়েকটি বিরোধীদল সিজেপি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
২০২৩ সালে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও ভারতের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণআন্দোলন
দীপকের পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর দিল্লিভিত্তিক ইউটিউবার মেঘনাদ এস ও তার এক বন্ধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ককরোচ জনতা পার্টি নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট তৈরি করেন।
মেঘনাদের ভাষায়, ‘আমি পেজটি দেখে ভেবেছিলাম, এটি ভীষণ মজার।’
কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা পরে ২ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছায়। মেঘনাদ বলেন, পুরো বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত।
‘ভারতের রাজনৈতিক ভাষা বদলাতে চাই’
গত মে মাসে রয়টার্সকে দীপকে বলেছিলেন, ‘এটি ভারতের রাজনৈতিক ভাষা বদলে দেওয়ার আন্দোলন। মূলধারার রাজনীতিতে ভারতের তরুণদের কণ্ঠ প্রায় হারিয়ে গেছে।’
নিজের ও পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি থাকা সত্ত্বেও তিনি ভারতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তার ঘোষণা, শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আন্দোলনের সঙ্গেই থাকবেন।
গত ৬ জুন থেকে দীপকে প্রায় নিয়মিত যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন। কখনো আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন, কখনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন, আবার কখনো মঞ্চের পাশেই স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছেন।
বুধবার সমাবেশে তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই—আমরা জয় না পাওয়া পর্যন্ত থামব না।’
