মানুষ কি একদিন পোষা প্রাণীর ভাষাও বুঝতে পারবে?

রবিউল কমল
রবিউল কমল

ভাবুন তো, একদিন পোষা কুকুরটি হঠাৎ বলে উঠল, ‘আজ বাইরে হাঁটতে যেতে খুব ইচ্ছে করছে।’ কিংবা বিড়ালটি জানাল, ‘ঘরের কোণে একটি টিকটিকি লুকিয়ে আছে।’ শুনতে কল্পকাহিনীর মতো লাগলেও গবেষকেরা বলছেন, এমন দিন হয়তো খুব দূরে নয়।

ডিজনির জনপ্রিয় অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র আপ-এ ‘ডাগ’ নামে একটি বিশেষ প্রজাতির কুকুর ইলেকট্রিক কলার পরে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে। কলারটি তার ভাবনাকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে দেয়। ফলে মানুষ সহজেই বুঝতে পারে, কুকুরটি কী বলতে চাইছে।

এত দিন এমন প্রযুক্তি কেবল সিনেমা কিংবা কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই দেখা গেছে। কিন্তু বাস্তবে বিজ্ঞানও ধীরে ধীরে সেই পথেই এগোচ্ছে।

Happy Young half Asian Korean boy laying and playing face to face in the green grass with his boy's best friend golden retreiver puppy girl in the front yard of his grandparents house
দ্রুত এগিয়ে চলা এআই, শক্তিশালী কম্পিউটিং প্রযুক্তি ও শব্দ বিশ্লেষণের আধুনিক পদ্ধতি সেই অসম্ভবকে ধীরে ধীরে সম্ভব করে তুলতে পারে। ছবি: সংগৃহীত

প্রাণীদের ভাষা বুঝতে চাইছে বিজ্ঞান

যাদের ঘরে পোষা প্রাণী আছে, তারা প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় ভেবেছেন, বিড়ালটি কী বলতে চাইছে? কুকুরটি কেন বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে? কিংবা পাখিটি ডাকছে কেন?

এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর নেই। তবে দ্রুত এগিয়ে চলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), শক্তিশালী কম্পিউটিং প্রযুক্তি ও শব্দ বিশ্লেষণের আধুনিক পদ্ধতি সেই অসম্ভবকে ধীরে ধীরে সম্ভব করে তুলতে পারে।

নিউইয়র্কের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোজেনেটিসিস্ট এরিখ জারভিস মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ভাষাগত যোগাযোগ একেবারে অসম্ভব নয়। তার ভাষায়, ‘একদিন এটি বাস্তবেও সম্ভব হতে পারে।’

হয়তো একদিন পোষা প্রাণীরা ডাগ-এর মতো স্মার্ট কলার পরে ঘুরবে। কিংবা মোবাইল ফোনের একটি অ্যাপ তাদের ডাক ঘেউ ঘেউ, মিউ মিউ কিংবা অন্যান্য শব্দ বিশ্লেষণ করে মানুষের ভাষায় অনুবাদ করে দেবে।

ছোট্ট একটি মেয়ে আর তার পোষা কুকুর যেন নিজেদের ভাষায় কথা বলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর শুধু অনেক শব্দই বুঝতে পারে না, তার প্রিয় মানুষের মুখভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি ও শরীরী ভাষাও সহজেই বুঝে ফেলে।
ছোট্ট একটি মেয়ে আর তার পোষা কুকুর যেন নিজেদের ভাষায় কথা বলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুর শুধু অনেক শব্দই বুঝতে পারে না, তার প্রিয় মানুষের মুখভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি ও শরীরী ভাষাও সহজেই বুঝে ফেলে। ছবি: সংগৃহীত

প্রাণীরাও কী ভাষাতে কথা বলে

সব প্রাণী মানুষের মতো ভাষা ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে না।

গবেষকেরা বলছেন, প্রাণীরা নানাভাবে নিজেদের অনুভূতি, ভয়, আনন্দ, ক্ষুধা কিংবা সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। শুধু আমরা তাদের সেই সংকেতগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারি না।

এরিখ জারভিস একটি মজার উদাহরণ দেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি টিয়া পাখি হারিয়ে গিয়েছিল। কয়েক বছর পর সেটি ফিরে আসে, কিন্তু তখন সে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে শিখে গেছে।

অবশ্য এমন ঘটনা খুবই বিরল।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী মাইকেল লং বলেন, অর্থপূর্ণ বার্তা তৈরি করা ও জটিল স্বর তৈরির ক্ষমতা খুব কম প্রাণীর মধ্যেই আছে। মেরুদণ্ডী প্রাণীর এক শতাংশেরও কম প্রজাতির মধ্যে এই বিশেষ দক্ষতা দেখা যায়।

Image
 গবেষকদের মতে, প্রাণীরা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্তভাবে নিজেদের অনুভূতি বা ভাব প্রকাশ করে। ছবি: সংগৃহীত

সবাই সমান দক্ষ নয়

কিছু প্রাণীর চিন্তাশক্তি বেশ উন্নত হলেও তারা জটিল শব্দ তৈরি করতে পারে না।

উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা ভার্ভেট বানরের কথা বলেন। এদের বুদ্ধিমত্তা অনেক বেশি হলেও মানুষের মতো জটিল স্বর তৈরি করার ক্ষমতা নেই। ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়।

তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তদের ভাষা বোঝাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে যে ভাষায় বা সংকেতে কথা বলে, সেটিকে বোঝাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মাইকেল লংয়ের মতে, প্রাণীরা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্তভাবে নিজেদের অনুভূতি বা ভাব প্রকাশ করে।

ভার্ভেট বানর - সহজ ইংরেজি উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ
 ভার্ভেট বানরের বুদ্ধিমত্তা অনেক বেশি হলেও মানুষের মতো জটিল স্বর তৈরি করতে পারে না। ছবি: সংগৃহীত

তিমির সঙ্গে ‘হ্যালো’

প্রাণীদের ভাষা বোঝার গবেষণায় ইতোমধ্যে কিছু চমকপ্রদ সাফল্যও এসেছে।

২০২৩ সালে গবেষকেরা আলাস্কার একটি হাম্পব্যাক তিমির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথা বলতে পেরেছিলেন। তারা তিমির বিশেষ ধরনের একটি শব্দ বিশ্লেষণ করে সেটিকে ইংরেজিতে ‘হ্যালো’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এরপর মানুষ ও তিমির মধ্যে কয়েক দফা একই ধরনের শব্দ বিনিময় হয়।

পরবর্তী গবেষণায় আরও জানা যায়, তিমির যোগাযোগব্যবস্থার কিছু পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্য মানুষের ভাষার সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল আছে।

এসব গবেষণা বিজ্ঞানীদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ শুধু তিমির ডাকই বুঝবে না, আরও জটিল বার্তাও বিশ্লেষণ করতে পারবে।

Humpback whale opening its enormous mouth near the surface, showing the vast capacity of its jaws during a lunge-feed
গবেষণায় জানা যায়, তিমির যোগাযোগব্যবস্থার কিছু পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্য মানুষের ভাষার সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল আছে। ছবি: সংগৃহীত

ইঁদুর নিয়েও চলছে গবেষণা

এরিখ জারভিসের গবেষণাগারে এমন কিছু ইঁদুর নিয়ে কাজ চলছে, যাদের জিনে পরিবর্তন এনে আরও জটিল ধরনের শব্দ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষ করে এনওভিএ১ নামের একটি মানব প্রোটিনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে। দেখা গেছে, মানুষের সংস্করণের এই প্রোটিন বহনকারী ইঁদুর তুলনামূলকভাবে আরও জটিল স্বর তৈরি করতে পারে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, ইঁদুর এখন মানুষের মতো কথা বলতে পারে। তবে গবেষকেরা বলছেন, প্রাণীর ভাষা বোঝার প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

অনেক ভাষা আমরা বুঝি

প্রাণীদের সব অনুভূতি বোঝার জন্য হয়তো ভবিষ্যতের এআই প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। কিন্তু কিছু সংকেত আমরা আজও সহজেই বুঝতে পারি।

খাবারের বাটি খালি দেখে ক্ষুধার্ত বিড়ালের ডাক, মালিককে দেখে কুকুরের আনন্দে লেজ নাড়া, কিংবা ভয় পেলে পাখির সতর্কবার্তা—এসব বোঝার জন্য কোনো অনুবাদক যন্ত্র লাগে না।

তবু মানুষের কৌতূহল এখানেই থেমে নেই।

যদি সত্যিই কোনো দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রাণীদের ডাক, শব্দ ও আচরণের ভাষাগত অর্থ মানুষের ভাষায় অনুবাদ করতে পারে, তাহলে সেটি শুধু প্রযুক্তিগত অর্জনই হবে না; বদলে যেতে পারে মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্কের ধরনও।

তখন পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া সহজ হবে, বন্য প্রাণীর আচরণ আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।

বিজ্ঞান এখনও সেই লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। তবে গবেষণাগারে যে গতিতে কাজ এগোচ্ছে তাতে হয়তো সেই দিন আমরা দেখতে পারব।

তথ্য সূত্র: সায়েন্স নিউজ, বিবিসি সায়েন্স ফোকাস, সায়েন্স এলার্ট, দ্য আর্থ