আইসিইউতে দ্রুত ছড়াচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া: আইসিডিডিআরবি
হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীদের যেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয় সেখানে এমন সব অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ছে যেগুলোর চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিডিডিআরবি তাদের দুটি নতুন গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেছে। ঢাকার একটি হাসপাতালের ৭৬৩ জন রোগীর ওপর এই গবেষণা চালানো হয়।
এতে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির সময় যেসব রোগীর শরীরে কোনো ব্যাকটেরিয়া ছিল না, তাদের অর্ধেকের বেশিই আইসিইউতে চিকিৎসা নেওয়ার সময় এসব ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর যারা এসব ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হয়েছে, তাদের মৃত্যুর হার ছিল উদ্বেগজনক।
তবে দ্বিতীয় গবেষণাটি আশার আলো দেখিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল) জোরদার করলে এ ধরনের গুরুতর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেকটাই কমানো সম্ভব।
‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ জার্নালে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাটি জুলাই ২০২৩ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার একটি সরকারি টারশিয়ারি (তৃতীয় স্তরের চিকিৎসাসেবা) হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ওপর করা হয়।
আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী ও গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক গাজী মো. সালাহউদ্দিন মামুন বলেন, আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে শুরু করে হাসপাতাল ছাড়ার আগপর্যন্ত রোগীদের অনুসরণ করা হয়েছে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং ‘হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং’–এর মাধ্যমে গবেষকেরা দেখেছেন, কীভাবে ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া হাসপাতালের ভেতরে ছড়ায় এবং রোগীদের শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো কীভাবে পরে গুরুতর সংক্রমণে রূপ নেয়।
তিনি বলেন, ‘এর ফলে আমরা রোগীদের শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাদের মারণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার মধ্যে একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছি।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এই গবেষণায় অর্থায়ন করেছে। এতে মূলত হাসপাতালে সংক্রমণের জন্য দায়ী চারটি সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার ওপর নজর দেওয়া হয়েছে: এশেরিকিয়া কোলাই (ই. কোলাই), ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া, অ্যাসিনেটোব্যাক্টর বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুগিনোসা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ব্যাকটেরিয়ার অনেক প্রজাতিই (স্ট্রেইন) এখন আর সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে সাড়া দেয় না।
গবেষকেরা দেখেছেন, আইসিইউতে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় অর্ধেক ভর্তি হওয়ার সময়ই নিজেদের অজান্তে শরীরে এসব ব্যাকটেরিয়া বহন করছিলেন, যদিও তাদের কোনো উপসর্গ ছিল না।
গবেষণায় দেখা যায়, ভর্তির সময় ১৯৮ জন রোগীর পরীক্ষার ফল নেগেটিভ (ব্যাকটেরিয়ামুক্ত) এসেছিল। তাদের মধ্যে ১০৫ জন বা ৫৩ শতাংশ রোগীই আইসিইউতে অবস্থানকালে এসব ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত হন। এটি থেকে বোঝা যায়, হাসপাতালের ভেতরেই এসব ব্যাকটেরিয়া ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে।
শরীরে ব্যাকটেরিয়া থাকার অর্থই এই নয় যে একজন মানুষ সংক্রমিত। তবে যারা এগুলো বহন করেন, তাদের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং তারা অন্যদের মধ্যেও তা ছড়াতে পারেন।
ওষুধ প্রতিরোধী এসব ব্যাকটেরিয়ায় যারা নিশ্চিতভাবে সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি রোগী আইসিইউতে মারা গেছেন।
গবেষকেরা বলছেন, মৃত্যুর এই উচ্চ হার মূলত আমাদের আইসিইউগুলোর সীমাবদ্ধতার বাস্তব চিত্রকেই তুলে ধরে। কারণ, এখানে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত এবং গাদাগাদি পরিবেশের কারণে হাসপাতালে দ্রুত জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।
জিনগত (জেনেটিক) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে তাদের শরীরে আগে থেকেই থাকা ব্যাকটেরিয়ারই পরে প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইসিডিডিআরবির অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিসার্চ ইউনিটের প্রধান এবং গবেষণার প্রধান তদন্তকারী ডা. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ‘হাসপাতাল হওয়া উচিত নিরাময়ের জায়গা। চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা উল্টো প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হবেন—এমনটা হতে পারে না।’
গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা, হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন করা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
দ্বিতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, ধারাবাহিকভাবে সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিলে তা সুফল বয়ে আনতে পারে। সাত মাস ধরে এ ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর আইসিইউতে রক্তের সংক্রমণের হার প্রতি ১০০ জনে ২৮ থেকে কমে ৪ জনে নেমে এসেছে, অর্থাৎ সংক্রমণ ৮৬ শতাংশ কমেছে।
একই সঙ্গে মৃত্যুহারও প্রতি ১০০ জনে ২৬ থেকে ৪-এ নেমে এসেছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, যেখানে ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে, সেখানেও সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের কঠোর ব্যবস্থা নিলে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব এবং এতে অনেক মানুষের জীবন বাঁচতে পারে।
এর আগে আইসিডিডিআরবির আরেকটি গবেষণায় হাসপাতালগুলোতে ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক বিস্তারের কথা বলা হয়েছিল। নতুন এই গবেষণাগুলো আইসিইউর ভেতরে কীভাবে এসব ব্যাকটেরিয়া ছড়ায় এবং কীভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমানো যায়—তার নতুন প্রমাণ হাজির করেছে।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, এই গবেষণার ফলাফল থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রোগীরা বিপজ্জনক ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এর ফল হচ্ছে মারাত্মক।
তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে এই গবেষণাগুলো এ-ও প্রমাণ করে যে, সাধারণ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যু ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব।’