হাসপাতালেই সংক্রমণ ঝুঁকি

পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গেলে ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ৯৬ বছর বয়সী শেখ আব্দুল আলম। কোমর ভেঙে যাওয়া ছাড়া আর কোনো শারীরিক জটিলতা তার ছিল না। এমনকি তার ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপও ছিল না।
প্রতীকী ছবি | সংগৃহীত

পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গেলে ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ৯৬ বছর বয়সী শেখ আব্দুল আলম। কোমর ভেঙে যাওয়া ছাড়া আর কোনো শারীরিক জটিলতা তার ছিল না। এমনকি তার ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপও ছিল না।

চিকিৎসকরা সফলভাবেই তার সার্জারি করেন। সার্জারির পর পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে হাসপাতালের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়। সেখানে থাকার ২ দিনের মধ্যেই আলমের খুসখুসে কাশি শুরু হয়।

তৃতীয় দিনে রীতিমতো মেশিন দিয়ে তার বুকের কফ পরিষ্কার করতে হয়েছিল চিকিৎসকদের। সার্জারির ষষ্ঠ দিনের মাথায় তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

অস্ত্রোপচারের পর যিনি বেঁচে ছিলেন, হাসপাতালে নিউমোনিয়ার আক্রান্ত হয়ে ৬ দিনের মাথায় তিনি মারা গেলেন।

দেশের ১১টি টারশিয়ারি পর্যায়ের (তৃতীয় ধাপের) হাসপাতালে আইসিডিডিআর,বি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভর্তির পর রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে কোনো হাসপাতালেই নজরদারি নেই।

টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউটগুলোতে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষ বিভাগ রয়েছে। একইসঙ্গে সারাদেশে থেকে রোগীদের সাধারণত এসব হাসপাতালেই রেফার করা হয়।

টারশিয়ারি পর্যায়ের ১১টি হাসপাতালের মধ্যে ৯টি সরকারি ও ২টি বেসরকারি, যা দেশের এ পর্যায়ের হাসপাতালের এক-চতুর্থাংশ এবং সরকারি হাসপাতালের এক-তৃতীয়াংশের প্রতিচ্ছবি।

'অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল' শীর্ষক একটি জার্নালে গত মাসে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

গবেষকদলের প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রকল্প গবেষণা ব্যবস্থাপক মো. গোলাম দস্তগীর হারুন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও রোগীদের শরীরে সংক্রমণ ছড়ায়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই এটি হয়ে থাকে।'

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, এই ধরনের সংক্রমণের মধ্যে রয়েছে মূত্রনালির সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সার্জারি বা জটিল রোগের অস্ত্রোপচারের পরের সংক্রমণ এবং নতুন মা ও নবজাতকদের মধ্যে সংক্রমণ।

চিকিৎসকদের মতে, হাসপাতালে আসার পর রোগীরা যে সংক্রমণে আক্রান্ত হন, সেটা পরে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কারণ, প্রাথমিকভাবে যে অসুস্থতার কারণে তারা হাসপাতালে আসেন, সেটার জন্য কিন্তু তারা মারা যান না। কিন্তু, হাসপাতালে আসার পরের সংক্রমণে তারা মারাও যান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনলজি বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক প্রধান ডা. আহমেদ আবু সালেহ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হাসপাতালে ভর্তির পরের সংক্রমণ আইসিইউতে থাকা রোগীদের মৃত্যুর পেছনে একটি বড় কারণ। এই সংক্রমণগুলো সাধারণত একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী। হাসপাতালগুলো সাধারণত যে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়, এ সংক্রমণগুলো সেগুলো প্রতিরোধী।'

এই সংক্রমণের কারণে রোগীকে বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হয় এবং ফলে মৃত্যুর হারও বাড়ে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, 'কোনো হাসপাতালেই নজরদারির ব্যবস্থা ছিল না। সব হাসপাতালই নজরদারি চালানোর জন্য আইটি বিভাগে প্রয়োজনীয় জনবল ও মহামারি বিষয়ে পেশাদার জনবলের অভাবের কথা উল্লেখ করেছে।'

অস্ত্রোপচারের পর কিংবা চিকিৎসা সরঞ্জামের মাধ্যমে সংক্রমণ বাড়ছে কি না, তা জানতে ১১টির মধ্যে ৯টি হাসপাতালই কোনো ধরনের নিরীক্ষা চালায়নি।

৬টি হাসপাতাল তাদের আইসিইউ বা শিশুদের মধ্যে কোনো ধরনের নিরীক্ষা চালায়নি। এমনকি যখন যক্ষ্মা ও ফ্লুর ক্ষেত্রেও তা করা হয়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ মূল্যায়ন স্কেলে ১১টির মধ্যে ১০টি হাসপাতালকেই 'বেসিক' বা তার চেয়ে নিচের ক্যাটাগরিতে রাখা যেতে পারে।

এর অর্থ হলো— সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালগুলোতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

৪৫০ শয্যার একটি সরকারি হাসপাতাল, যেখানে নিয়মিত ২ হাজার ৬০০ জন রোগী থাকেন এবং ৮৫ হাজার রোগীর বার্ষিক টার্নওভার রয়েছে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সেটি 'অপর্যাপ্ত' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, 'সেখানে যথাযথ প্রতিরোধব্যবস্থা বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে এবং এর উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রয়োজন'।

দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর পেয়েছে একটি বেসরকারি ৫৮০ শয্যার টারশিয়ারি পর্যায়ের হাসপাতাল, যেখানে বছরে ১৫ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নেয়।

গবেষণায় হাসপাতালগুলোর নাম উল্লেখ না করে বলা হয়েছে, ওই হাসপাতালগুলোতে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকেও রোগীদের ওই হাসপাতালগুলোতে রেফার করা হয়ে থাকে।

এতে আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভিড়, শয্যার অভাব, অপর্যাপ্ত জনবল, অপর্যাপ্ত টয়লেট ও বর্জ্যপানি পরিশোধন ব্যবস্থা না থাকাই হাসপাতালে সংক্রমণ বাড়ার পেছনের কারণ। বর্জ্যপানি একাধিকবার প্যাথোজেনের বাহক হিসেবে প্রমাণিতও হয়েছে।

১১টির মধ্যে এক-চতুর্থাংশ হাসপাতাল রোগীর চাপ সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের বিষয়টি বিবেচনা করে। তাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশই সরকার-প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও রোগীর অনুপাত বজায় রাখে না।

গবেষকদলের প্রধান লেখক গোলাম দস্তগীর হারুন বলেন, 'হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ প্রশিক্ষণ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।'

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ হাসপাতালেই এক রোগীর শয্যা থেকে অন্য রোগীর শয্যার মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি।

গবেষণার তথ্য এও বলছে, ৬টি হাসপাতাল প্রতি শয্যায় একজন করে রোগী রাখতে পারে। বড় হাসপাতালগুলো একাধিক রোগীকে এক শয্যায় রাখে বা মেঝেতেই রোগী রাখছে।

'৪টি হাসপাতালের ক্ষেত্রে সেগুলোর শয্যা কখন শেষ হয়ে যায়, সেটা বের করার কোনো উপায়ও পাওয়া যায়নি। ৬টি হাসপাতালে করিডোরের বাইরে কোনো রোগী রাখা হয়নি', গবেষণায় বলা হয়েছে।

এতে আরও দেখা গেছে, ৭টি হাসপাতালে পর্যাপ্ত টয়লেট নেই।

এর মধ্যে ৪টি হাসপাতালে কার্যকরী বর্জ্য সংগ্রহের পাত্র ছিল না এবং ৫টিতে চিকিৎসা বর্জ্য পিক-আপ বা নিষ্পত্তির সুবিধা ছিল না। মাত্র ১টি হাসপাতালে ইনসিনেটর ছিল।

হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীর সংক্রমণের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ দিয়ে বিএসএমএমইউর অধ্যাপক আহমেদ আবু সালেহ বলেন, 'একটি সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ বিএসএমএমইউ ১টি রেফারেল হাসপাতাল এবং আইসিইউ রোগীদের অনেকেই এখানে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকেন। আমরা তো জানি না যে সেখান থেকে তারা কী ধরনের সংক্রমণ নিয়ে আসছেন।'

অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না। আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা একেবারেই পাচ্ছেন না।

'ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ইন টারশিয়ারি কেয়ার হসপিটালস অব বাংলাদেশ: রেজাল্টস ফ্রম ডব্লিউএইচও ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অ্যাসেসমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক' শীর্ষক গবেষণাপত্রের শেষে বলা হয়েছে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের চর্চার মাধ্যমেই হাসপাতালের ভর্তির পরের সংক্রমণ কমানো যাবে।

Comments

X