২০২৫ সালে এশীয় অঞ্চলে অনলাইন প্রতারণায় ক্ষতি ১১৪ বিলিয়ন ডলার: জাতিসংঘ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার প্রতারণা, স্ক্যাম সেন্টার, প্রতারক চক্র—এই শব্দগুলো বারবার পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র এশীয় অঞ্চলে এখন এ বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ।

আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে অনলাইন প্রতারণার উদ্বেগজনক বৈশ্বিক চিত্র উঠে এসেছে।

এতে বলা হয়েছে, গত বছর পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে আন্তঃসীমান্ত অনলাইন প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
২০২৩ সালের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ অন্তত তিন গুণ বেড়েছে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অপরাধচক্রগুলোর আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমার। এসব চক্র ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করে।

প্রতারকদের মধ্যে স্বেচ্ছায় কাজ করতে আসা মানুষের পাশাপাশি মানবপাচারের শিকার হয়ে আসা অনেকে আছেন। প্রতারকচক্রের সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলেন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকা থেকে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনসহ কয়েকটি দেশ এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপের মুখে রেখেছে। ফলে গোটা অঞ্চলজুড়ে এই অবৈধ কার্যক্রম দমনে কঠোর অভিযান চলমান আছে।

মানবপাচারের মাধ্যমে পরিচালিত বড় আকারের সাইবার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ওয়াশিংটন ও লন্ডন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এই উদ্যোগের পর গত এক বছরে কম্বোডিয়া থেকে অভিযুক্ত কয়েকজন প্রতারক চক্রের প্রধানকে চীনে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতারণার কারণে উল্লেখিত অঞ্চলগুলোর ভুক্তভোগীদের গত বছর আনুমানিক ৮৮ দশমিক তিন বিলিয়ন থেকে ১১৪ দশমিক এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৯২০ কোটি থেকে ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা) ক্ষতি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতারণায় ওই অঞ্চলগুলোতে ১৮ থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ক্ষতির পরিমাণ তিন গুণ হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, এই অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। প্রতিটি দেশেই ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাইবার প্রতারণাচক্রগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। শুরুতে তারা মূলত চীনা ভাষাভাষীদের লক্ষ্যবস্তু করলেও পরে বিশ্বজুড়ে ভুক্তভোগীদের টার্গেট করতে শুরু করে।

ইউএনওডিসি বলেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অবৈধ মাদক ব্যবসা, অনলাইন প্রতারণা, মানবপাচার, অবৈধ ব্যাংকিং এবং অবৈধ রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত অপরাধ চক্রগুলো আগের চেয়ে নিজেদের পরিণত করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘবদ্ধ অপরাধীরা এখন আর আগের মতো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সীমিত কার্যক্রম চালাতে আগ্রহ দেখায় না। বরং তারা ধারাবাহিকভাবে আরও সমন্বিত, আন্তঃসীমান্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইউএনওডিসি বলেছে, এই পরিবর্তন প্রথাগত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর হুমকি তৈরি করছে।

ইউএনওডিসির আঞ্চলিক প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ এক বিবৃতিতে জানান, প্রতারক চক্রগুলো এখন আর নিজেদের ভৌগোলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তারা একইসঙ্গে একাধিক দেশে একই ধরনের অবৈধ ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

MS. DELPHINE SCHANTZ<br /> Regional Representative<br /> United Nations Office on Drugs and Crime for Southeast Asia and the Pacific
ইউএনওডিসির আঞ্চলিক প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ। ছবি: ইউএনওডিসির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

তিনি বলেন, এসব অপরাধচক্র এখন করপোরেট ফ্র্যাঞ্চাইজিংয়ের কায়দায় পরিচালিত হচ্ছে।

‘তাদের অর্থপাচার, মানবপাচার, অভিবাসী পাচার এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য আলাদা আলাদা বিশেষায়িত বিভাগ আছে। কিন্তু সবই একই সেবাভিত্তিক আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্কের অংশ’, যোগ করেন তিনি।