জীবনের অনিশ্চিত যাত্রায় শক্তি জোগায় যে বই

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু বই আছে, যা কেবল গল্প বলেই থেমে যায় না। সেগুলো পাঠকের চিন্তা ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়। ব্রাজিলীয় লেখক পাওলো কোয়েলহোর ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ তেমনই একটি বই।

বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা খুব বেশি না। কিন্তু এরপরেও প্রকাশের কয়েক দশক পরও বইটি আজও বিশ্বের লাখো পাঠকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। আমি যখন প্রথম বইটি পড়ি, তখন এটিকে শুধু একটি উপন্যাস হিসেবে নয়, বরং জীবন ও স্বপ্নকে নতুনভাবে দেখার একটি পথনির্দেশনা হিসেবে আবিষ্কার করেছি।

The Alchemist
বইয়ের কভার। ছবি: সংগৃহীত

পাওলো কোয়েলহো: স্বপ্নবাজ লেখকের গল্প

পাওলো কোয়েলহো সমকালীন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুলপঠিত লেখক। ১৯৪৭ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো আধ্যাত্মিকতা, আত্ম-অনুসন্ধান, ভাগ্য এবং মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার অনুসন্ধান। কোয়েলহো শুধু একজন ঔপন্যাসিক নন, তিনি একজন দার্শনিক এবং গল্পকারও বটে। তার বইগুলো বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে প্রকাশিত হয়েছে এবং বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কিন্তু ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’র বিপুল সাফল্যই তাকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ব্রিডা’, ‘দ্য পিলগ্রিমেজ’, ‘ভেরোনিকা ডিসাইডস টু ডাই’, ‘ইলেভেন মিনিটস’, ‘দ্য জাহির’। প্রতিটি বইতেই তিনি মানুষের আত্মিক বিকাশ, ভালোবাসা এবং প্রত্যেকের জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধানের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।

‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ লেখার পটভূমি

‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। বইটি লেখার পেছনে কোয়েলহোর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রভাব ছিল বেশ গভীর। তিনি স্পেনের বিখ্যাত তীর্থপথ ‘ক্যানিও ডি স্যানটিইয়াগো’ ভ্রমণ করেছিলেন, যে অভিজ্ঞতা তার চিন্তাজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। প্রথমদিকে বইটি খুব বেশি বিক্রি হয়নি। প্রকাশকও তেমন আশাবাদী ছিলেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের মুখে মুখে বইটির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। পরে এটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সফল উপন্যাসে পরিণত হয়।

উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগো, একজন তরুণ আন্দালুসীয় মেষপালক। একদিন সে একটি স্বপ্ন দেখে, যেখানে মিশরের পিরামিডের কাছে গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়ার ইঙ্গিত থাকে। সেই স্বপ্নের অর্থ খুঁজতে এবং নিজের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করতে সে বেরিয়ে পরে এক দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রায়। সান্তিয়াগোই মূলত উপন্যাসটির প্রাণ। তরুণ হিসেবে সে সাহসী, কৌতূহলী এবং একইসঙ্গে স্বপ্ন অনুসরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জীবনের নিরাপদ পথ ছেড়ে অজানার উদ্দেশে যাত্রা করার মানসিকতা তাকে একজন অনন্য নায়কে পরিণত করেছে।

তার চরিত্র আমাদের শেখায়, জীবনের প্রকৃত অর্জন গন্তব্যে নয়, বরং যাত্রাপথের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায় নিহিত।

The Alchemist
বইয়ের কভার। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়াও এই বইয়ে দেখা মিলবে সালেমের রহস্যময় রাজা মেলকিজেদেকের সঙ্গে। তিনিই সান্তিয়াগোর জীবনে প্রথম বড় প্রেরণাদাতা। তিনিই সান্তিয়াগোকে বোঝান যে প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি একান্ত লক্ষ্য এবং তার গন্তব্য রয়েছে। রাজা হিসেবে এই চরিত্রটি যেন একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, যিনি মানুষকে নিজের ভেতরের সম্ভাবনা চিনতে সাহায্য করেন।

এরপরই আসে উপন্যাসের সবচেয়ে রহস্যময় ও জ্ঞানী চরিত্র অ্যালকেমিস্টের কথা। বলা হয়ে থাকে, আলকেমিস্টরা মূলত যেকোনো ধাতব পদার্থকে মূল্যবান স্বর্ণে রূপান্তরিত করতে পারেন। তিনিই সান্তিয়াগোকে শেখান নিজের হৃদয়ের ভাষা শুনতে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে। আর শেখান যেকোনো উপায়েই নিজের স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস রাখতে। আলকেমিস্টের উপস্থিতি পুরো গল্পে দার্শনিক গভীরতা এনে দিয়েছে।

অপরদিকে বইয়ের ফাতিমা ভালোবাসার প্রতীক। সান্তিয়াগোর জীবনে ফাতিমা এমন এক চরিত্র, যে তাকে আটকে রাখেন না। বরং নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। এই চরিত্রের মাধ্যমে লেখক কোয়েলহো দেখিয়েছেন, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

পাঠ-অভিজ্ঞতা

আমি যখন ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ পড়ি, তখন সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হই সান্তিয়াগোর চরিত্রে। তার সাহস, অজানাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি অটল বিশ্বাস আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। জীবনে আমরা প্রায়ই ব্যর্থতার ভয় বা অনিশ্চয়তার কারণে অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করি। কিন্তু সান্তিয়াগো আমাকে শিখিয়েছে, স্বপ্নের পথে বাধা আসবেই, তবুও এগিয়ে যেতে হয়। আমরা তো প্রতিনিয়তই স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নের পেছনে অনেক পরিশ্রম ব্যয় করি। আমাদের সব স্বপ্নই কি পূরণ হয়? অনেক স্বপ্ন আমাদের নিজেদের পরিচিত স্থান, চেনা ছন্দকে পেছনে ফেলে যেতে বলে। আমরা নানান ভয়, আশঙ্কা নিয়ে হলেও সামনে এগিয়ে যাই।

দ্বিতীয়ত, অ্যালকেমিস্ট চরিত্রটিও আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তার কথাগুলো যেন জীবনের নানা জটিল মুহূর্তে দিক-নির্দেশনা দেয়। বিশেষ করে এই ধারণাটি যেখানে বলা হয়েছে, মহাবিশ্ব আমাদের সাহায্য করে যখন আমরা সত্যিকার অর্থে কোনো কিছু অর্জন করতে চাই। যখন প্রথম পড়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল ঠিক তাই। কিন্তু বাস্তবতা আসলে সব সময় এমন নয়। তারপরেও আশা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।

সান্তিয়াগোর যাত্রা আসলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমার কাছে ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ এমন একটি বই, যা বারবার পড়লেও নতুন করে অনুপ্রেরণা দেয় এবং মনে করিয়ে দেয়, নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার সাহসই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।