নামের অন্তরালে ঢাকা

যেভাবে এলো ওয়ারী, চানখাঁর পুল, টিকাটুলীসহ আরও কিছু নাম

মো. ইমরান
মো. ইমরান

সত্তরোর্ধ্ব লাজিজ আলী যখন লক্ষ্মীবাজার দিয়ে হাঁটেন, তখন তার হাতের লাঠিটা ইটের ওপর ঠুক ঠুক শব্দ করে না, বরং যেন এক পুরোনো সুরের খোঁজ করে। তিনি থামেন, চশমাটা ঠিক করে তাকান তার শ্যামা প্রসাদ লেনের দিকে। তার মনে পড়ে, এই মোড়েই তো ছিল বাদ্যযন্ত্রের সেই ছোট্ট দোকানটা। সারাদিন টুংটাং শব্দে মুখর থাকত এই এলাকা। কিন্তু আজ?

দোকানটা নেই, সেখানে এখন কাপড়ের স্তূপ। গলিটা যেন সময়ের চাপে লাজিজ সাহেবের স্মৃতির মতোই আরেকটু কুঁকড়ে গেছে। এক কাপ কড়া লিকারের চায়ের বিনিময়ে তার সঙ্গে আড্ডা দিলে ঢাকাটা আর বইয়ের পাতা থাকে না, হয়ে ওঠে এক জীবন্ত উপন্যাস, জানা যায় অদ্ভুত সব সুন্দর নাম ও তাদের গল্প।

আমরা যখন ব্যস্ত পায়ে ওয়ারী বা পাটুয়াটুলির রাস্তা দিয়ে হাঁটি, তখন কি একবারও ভেবে দেখি, কেন এই নামের ভারে নুয়ে আছে আমাদের এই প্রিয় শহর? মুনতাসীর মামুনের কালজয়ী গবেষণা আর হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখনীতে পাওয়া যায় সেসব নামের নেপথ্য কাহিনী, যা আজ সময়ের ধুলায় ধূসর, তবে টিকে আছেন লাজিজ আলীর মতো। আসুন, ঢাকা শহরের এই নামকরণের মায়াবী গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাই কিছুক্ষণের জন্য।

ভোরবেলায় ফরাশগঞ্জ-শ্যাম বাজার ঘাট
ভোরবেলায় ফরাশগঞ্জ-শ্যাম বাজার ঘাট। ছবি: মো. ইমরান

যেভাবে একজন ইংরেজ ডিসট্রিক্ট কালেক্টারের নামের সঙ্গে জুড়ে ওয়ারীর নাম

লেখক ও গবেষক মুনতাসির মামুনের মতে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণ হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে। এরকমই একটি এলাকা ওয়ারী। আজকের ব্যস্ত ও অপরিপাটি ওয়ারী এলাকাটি যেন একসময় এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার পদচারণায় মুখরিত ছিল। ইতিহাস বলে, মিস্টার ওয়ার নামক এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ। এলাকাটিতে ওয়্যার স্ট্রিট নামে একটি রাস্তাও রয়েছে। আবার হায়দ্রাবাদের নিজামের কোনো কর্মচারীর নামও পাওয়া যায় এলাকাটির সঙ্গে, নামকরণের ইতিহাসে পাওয়া যায় বাগানবাড়ির কথাও।

ওয়ারীকে সেসময়ের গুলশান কিংবা বনানী বললে ভুল হবে না। ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা, ডাক্তার ও আইনজীবীদের অনেকেই তখন এখানে বসবাস করতেন। পাশেই কিন্তু খ্রিস্টান গোরস্থান আর খাল। এক সময় মানুষ নৌকা দিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তর পারি দিয়ে আসতেন ওয়ারীতে। এই ওয়ারীতে এখন ব্র্যান্ডেড শপ, খাবারের দোকান আর বড় বড় এপার্টমেন্ট। আজ ওয়ারীর ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হয়, ব্রিটিশ আমলের সেই প্রশাসনিক জৌলুশ আর নেই, আছে কেবল পুরোনো বাড়িগুলোর স্থবির স্থাপত্য।

রূপলাল হাউসের ছাদ
রূপলাল হাউসের ছাদ। ছবি: মো. ইমরান

চানখাঁর পুল: সুরের সেই জাদুকর

বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা শহর যখন ঘুমিয়ে পড়ত, তখন সুরের মূর্ছনায় ভেসে আসত এক নাম, চান খাঁ। তিনি ছিলেন তৎকালীন ঢাকার এক বিখ্যাত ব্যাঞ্জো বাদক। এই লোকজ গল্প অনুযায়ী এটিই চানখাঁর পুল নামের কাহিনী। তবে সরকারি বিভিন্ন নথিপত্রে এই নামে একজন মিস্ত্রির সন্ধান পাওয়া যায়, যিনি এখানে একটি পুল নির্মাণ করেছিলেন। তার নামই আজ ‘চানখাঁর পুল’-এর নাম।

নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থান
নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থান। ছবি: মো. ইমরান

পেশার রঙে আঁকা ইতিহাসের অলিগলি

পুরান ঢাকার মানচিত্র কেবল ইট-পাথরের বিন্যাস নয়, এটি তৎকালীন মানুষের জীবিকা ও কর্মযজ্ঞের এক জীবন্ত দলিল। অলিগলির নামগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানকার অধিকাংশ এলাকার নামকরণ হয়েছে সেই অঞ্চলে বসবাসকারী পেশাজীবী গোষ্ঠীর নামানুসারে।

টিকাটুলী

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, হুক্কার কল্কিতে যে ‘টিকা’ বা তামাকের মণ্ড ব্যবহৃত হতো, তা প্রস্তুতকারী কারিগররা এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই পেশাজীবী কারিগরদের ‘টোলার’ নামানুসারেই এলাকাটি ‘টিকাটুলী’ নামে পরিচিতি পায়।

ওয়ারী
ওয়ারী। ছবি: মো. ইমরান

সিক্কাটুলী

মুনতাসীর মামুনের বর্ণনা অনুযায়ী, মোগল বা পরবর্তী সময়ে যারা মুদ্রা বা ‘সিক্কা’ তৈরির কাজে দক্ষ ছিলেন, তাদের বসতি ছিল এই এলাকায়। ‘সিক্কা’ শব্দটি থেকে পরবর্তীতে এলাকাটির নামকরণ হয় সিক্কাটুলি। এই অঞ্চলের অলিগলিগুলো একসময় ধাতব কাজের টুংটাং শব্দে মুখর থাকত।

কসাইটুলী

ঢাকা শহরে মাংসের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কসাই বা মাংস ব্যবসায়ীরা তাদের জীবিকার প্রয়োজনে এই নির্দিষ্ট এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। পেশার পরিবর্তনে এলাকাটির রূপ বদলালেও নামটুকু এখনো সেই পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

ধোলাইখাল
ধোলাইখাল। ছবি: মো. ইমরান

ফরাশগঞ্জ: ফরাসি বণিকদের ছায়াতলে

বুড়িগঙ্গার তীরে ফরাশগঞ্জ মানেই যেন এক ঐতিহাসিক দর্পণ। ফরাসি বণিকরা যখন এখানে তাদের কুঠি গড়ে তুললেন, তখন থেকেই এলাকাটি ‘ফরাশগঞ্জ’ নামে পরিচিতি পায়। তাদের সেই বাণিজ্যের প্রসার, নীল কুঠির স্মৃতি আর নদীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘকালীন মৈত্রীর সাক্ষ্য বহন করছে এই নামটি। ইতিহাসের পাতায় ফরাশগঞ্জ একটি সফল বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বর্তমানে বুড়িগঙ্গার তীরে ব্রিজ ঘেঁষেই শ্যাম বাজারের সবজির আড়ত, ফরাশগঞ্জে মশলা আর আলু পেঁয়াজ, এলাকাটিকে এখনো রেখেছে কর্মমুখর ও ব্যস্ত। সেই ভোর থেকে ফরাশগঞ্জের ঘাটে ঘাটে নৌকা ভিড়তে শুরু করে, সন্ধ্যা নামলেই ব্রিজের রেলিং ঘিরে পার্ক করা থাকে সারি সারি বাইক। আশেপাশের মানুষ ফুচকা আর চটপটি খেতে খেতে নদীতে লঞ্চ আর নৌকার আনাগোনা দেখে।

নবাবপুর: নবাবদের যাতায়াতের পথ

পুরান ঢাকার প্রাণের স্পন্দন নবাবপুর। নবাবদের আহসান মঞ্জিল থেকে শহরের অন্য প্রান্তে যাওয়ার প্রধান পথ ছিল এটি। নবাবদের অশ্বমেধের ঘোড়া আর পালকির শব্দে মুখরিত থাকত এই রাস্তা।

সময়ের সঙ্গে নবাবদের ক্ষমতা কমলেও, নামটা রয়ে গেছে অটুট। আজ নবাবপুর ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসার জন্য পরিচিত হলেও, তার নামের গভীরে আজও বেঁচে আছে সেকালের সেই নবাবী জৌলুশ।

লক্ষ্মীবাজার
লক্ষ্মীবাজার। ছবি: মো. ইমরান

পাথুরিয়াঘাটা ও লক্ষ্মীবাজার

একসময় পাথর বিক্রির রমরমা কেন্দ্র ছিল পাথুরিয়াঘাটা। বুড়িগঙ্গার জলপথে দূর-দূরান্ত থেকে আসত বিশাল সব পাথরের চালান।

আজ সেসব পাথরের খনি নেই, কিন্তু এলাকার নামটা এখনো সেই আদি ব্যবসার স্মারক বহন করে চলেছে।

অন্যদিকে, লক্ষ্মীবাজার অত্যন্ত প্রাচীন এলাকাগুলোর একটি। হিন্দু ধর্মের দেবী লক্ষ্মীর নামানুসারে এই নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

এই এলাকায় লক্ষ্মীনারায়ণ নামে মন্দিরটি মূলত ১৮শ শতকে ভিখন লাল পাণ্ডে (যিনি বেণু ঠাকুর নামেও পরিচিত ছিলেন) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে সেখানে মন্দিরটি স্থাপন করেন।

তার উত্তরাধিকারী রাজাবাবুর (কীর্তিপ্রসাদ) সময়কালে এই মন্দিরটি বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং কালক্রমে এলাকাটি ‘লক্ষ্মীবাজার’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

ফরাশগঞ্জ
ফরাশগঞ্জ। ছবি: মো. ইমরান

হাজারীবাগ ও ধোলাইখাল

আজ হাজারীবাগ চামড়া ও ট্যানারির গন্ধের কারণে পরিচিত হলেও, এর নামের পেছনে রয়েছে সুগন্ধি ফুলের বাগানের এক ইতিহাস। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাগানবাড়ি ছিল। এরকমই অনেকগুলো বাগানবাড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল এলাকাটি; সেখান থেকেই ‘হাজারীবাগ’ নামের উৎপত্তি।

অন্যদিকে, ধোলাইখাল নামের মধ্যেই মিশে আছে সেই জলের ধারা, যা একসময় ঢাকার যাতায়াতে বড় ভূমিকা রাখত। ১৬১০ সালের দিকে ঢাকার সুবাদার ইসলাম খান শহর রক্ষার জন্য ও নৌ-চলাচলের সুবিধার্থে এটি খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে এখানে ধোপারা কাপড় ধোয়ার কাজ করত বলে এটি ধোলাইখাল নামে পরিচিত হয়।

চামড়ার গন্ধমাখা এলাকাটি এক সময় ছিল ফুলের বাহার, নবাবপুরের ইলেক্ট্রনিক মার্কেট নবাবদের আনাগোনার রাস্তা, স্কুল-কলেজের কোচিং সেন্টারের এলাকা টিকাটুলি বলে সেখানে বাস করা পেশাজীবীদের কথা।

রোজ গার্ডেন টিকটুলি
টিকটুলির রোজ গার্ডেন। ছবি: মো. ইমরান

ঢাকা অলিগলির নামের ইতিহাস মূলত এই বৈপরীত্যের ইতিহাস।

এই বৈপরীত্য শুধু অতীত ও বর্তমানের নয়, স্মৃতির, আর্কিটেকচারের ও অভ্যাসের। আমরা যখন এই রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটি, তখন কি একবার থামি? দেখি সেই পুরোনো বাড়ি, নকশাদার খিলান কিংবা কোনো এক নিভৃত জানালার দিকে?

হয়তো আজও সময় পেলে সেই ইতিহাস কথা বলে ওঠে। ঢাকার এই অলিগলি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, আমরা এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী, যাদের প্রতিটি রাস্তার বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে এক একটি আখ্যান। এই আখ্যানগুলো হারিয়ে যেতে দেওয়া আমাদের বারণ। কারণ, এই নামগুলো হারিয়ে যাওয়া মানেই আমাদের অস্তিত্বের এক বড় অংশকে হারিয়ে ফেলার মতো।

তথ্যসূত্র:

১. ঢাকা পাচাস বারাস পাহলে, হেকিম হাবিবুর রহমান।

২. ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী, ড. মুনতাসীর মামুন।