সংবিধান বিতর্ক: ৫০ বছর আড়ালে থাকা কিছু বিষয় সামনে এনেছেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল

‘সংবিধান বিতর্ক ১৯৭২: গণপরিষদের রাষ্ট্রভাবনা’ শীর্ষক বইটি প্রথমা প্রকাশনী থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ২৪০ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ বইটিতে ১৭১ পৃষ্ঠার মূল পাঠ মোট ১১টি অধ্যায়ে বিস্তৃত। বাকি অংশে সংযোজনী।
বইয়ের প্রচ্ছদ

'সংবিধান বিতর্ক ১৯৭২: গণপরিষদের রাষ্ট্রভাবনা' শীর্ষক বইটি প্রথমা প্রকাশনী থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ২৪০ পৃষ্ঠার নাতিদীর্ঘ বইটিতে ১৭১ পৃষ্ঠার মূল পাঠ মোট ১১টি অধ্যায়ে বিস্তৃত। বাকি অংশে সংযোজনী।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরে সবচেয়ে আবশ্যক বিষয় ছিল স্বাধীন দেশের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা। সংবিধান রচনা করেছিল গণপরিষদ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছে গণপরিষদ। তবে মুক্তিযুদ্ধে যারা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন, তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

গণপরিষদ সংবিধানের খসড়া প্রস্তুত করার জন্য ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে রিপোর্টসহ গণপরিষদে উপস্থাপন করে। সংবিধানের খসড়া প্রস্তাবনার বিভিন্ন বিধান ও নীতি নিয়ে গণপরিষদ সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য ও বিতর্ক হয়। এই বিতর্কের কার্যবিবরণী ২টি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত কার্যবিবরণী থেকে গণপরিষদ সদস্যদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে লেখক 'সংবিধান বিতর্ক ১৯৭২' বইটি লিখেছেন। এ ছাড়া, সংবিধান রচনা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অনেক দলিল, প্রাসঙ্গিক বই ও নিবন্ধের সাহায্য নিয়েছেন।

আমার জানা মতে, গণপরিষদ বিতর্ক বিষয়ে এটিই প্রথম গবেষণাধর্মী বই। লেখক এই বইয়ের মাধ্যমে গণপরিষদ বিতর্ক বিশ্লেষণ করে 'আমাদের সাংবিধানিক অভিযাত্রার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন' এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে চেয়েছেন।

সংবিধান রচনাকালীন গণপরিষদে এবং গণপরিষদের বাইরে সংবিধান বিষয়ে যে বিতর্কগুলো তৈরি হয়েছিল, তার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর পরিণতি বিশ্লেষণ করে লেখক গণপরিষদ সদস্যরা ঠিক কী ধরনের রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তা উদঘাটন করতে চেয়েছেন। গত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে লেখক তাদের ওই সময়ের প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির মূল্যায়ন করার সুযোগ পেয়েছেন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও মো. আবদুল আজিজ চৌধুরী যে ধরনের আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলেন, পরবর্তীতে তার অধিকাংশই বাস্তবে ঘটেছে। অন্যদিকে, ড. কামাল হোসেন যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের কথা বলে তার খসড়া সংবিধানের সাফাই দিয়েছিলেন, তার অধিকাংশই অলিক প্রমাণিত হয়েছে।

এক্ষেত্রে বইয়ে লেখকের একটি পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য, গণপরিষদ সদস্যরা দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য একটি কাঠামোগত শাসন ব্যবস্থার বদলে ব্যক্তিনির্ভর শাসন ব্যবস্থার ওপর অধিকতর আস্থাশীল ছিলেন।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল এই বইয়ে গণপরিষদ বিতর্কের যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

১. সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অসীম ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রপতির হাতে নামমাত্র ক্ষমতা রাখার বিপক্ষে গণপরিষদে আলোচনা হয়েছে। ড. কামাল হোসেন এক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের আড়ালে 'প্রাইম মিনিস্ট্রিয়াল' ডেমোক্রেসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু অধ্যাপক আসিফ নজরুল ভারতসহ অন্যান্য সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশের মতো এত বেশি ক্ষমতা আর কোনো দেশের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে দেয়নি।

২. খসড়া সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ আরও অগণতান্ত্রিক ছিল। দল থেকে কাউকে বহিষ্কার করা হলেও তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান রাখা হয়েছিল। খসড়া সংবিধান কমিটির ৫ জন সদস্য এই বিধানের বিপক্ষে 'নোট অব ডিসেন্ট' দেন। পরবর্তীতে বহিষ্কার করা হলে সদস্য পদ বাতিল হওয়ার বিধান বাদ দিয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া এবং দল থেকে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার বিধান রাখা হয়।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ফ্লোর-ক্রসিংয়ের সুযোগ রাখার দাবী করেন। কিন্তু ড. কামাল হোসেন এক্ষেত্রে দল মনোনীত না হয়ে বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার পরামর্শ দেন। লেখক আসিফ নজরুল এই বইয়ে দেখিয়েছেন, অনাস্থা ভোট ও বাজেট পাশ করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো বাদে অন্য সব ক্ষেত্রে ফ্লোর-ক্রসিংয়ের সুযোগ রেখেই বিভিন্ন দেশ শক্তিশালী গণতন্ত্র ও স্থিতিশীল সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে।

৩. আবদুল আজিজ চৌধুরী প্রস্তাব করেন, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সব ক্ষমতার অধিকারী হবেন। ড. কামাল হোসেন এটিকে অগণতান্ত্রিক এবং প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম হিসেবে আখ্যায়িত করে নাকচ করেন। তিনি আশ্বস্ত করেন, নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রী কেয়ারটেকার সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

৪. গণপরিষদে ড. কামাল হোসেন গর্ব করে বলেন, এই সংবিধানে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকের বিধান নেই, জরুরি অবস্থা জারির বিধান নেই, সংসদকে কোনো কালো আইন তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু আসিফ নজরুল দেখিয়েছেন, সংবিধান পাশ হওয়ার ২ মাসের মধ্যেই সংবিধানে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে নিবর্তনমূলক আটক, জরুরি অবস্থার বিধান যুক্ত করা হয়।

৫. সংবিধান পাশ হওয়ার পরে গণপরিষদ চাইলে সংসদ হিসেবে ৫ বছর পূর্ণ করতে পারত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে সুযোগ না নিয়েই জাতীয় নির্বাচন আহ্বান করে। সিদ্ধান্তটি আপতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক মনে হলেও আসিফ নজরুল মনে করেন, গণপরিষদ বিলুপ্ত করার পরে নতুন সংসদ নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় আইন তৈরির ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে চলে আসে। এই সময়ে মোট ২০২টি আইন তৈরি হয় প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতাবলে।

৬. মওলানা ভাসানী গণপরিষদের সংবিধান তৈরির ক্ষমতাকে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, সত্তরের নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছে, তারা নির্বাচিত হয়েছে ইয়াহিয়া খানের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের অধীনে একক পাকিস্তানের সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে। তাদের মূল দাবি ছিল, ৬ দফার আলোকে একক পাকিস্তানের অধীনে সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন। সুতরাং, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধান রচনার অধিকার তাদের নেই। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দলের সমন্বয়ে জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে সংবিধান রচনার দাবি জানান।

৭. গণপরিষদে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন চাকমা নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তিনি চাকমাদেরকে বাঙালি নয়, বরং বাংলাদেশি বলে দাবি করেন এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য গণপরিষদ বৈঠক বর্জন করেন। পরে লারমা সংখ্যালঘু ও অনগ্রসর জাতিগুলোর জন্য বিশেষ বিধান রেখে সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। কিন্তু এই প্রস্তাব বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিরোধী সাব্যস্ত করে ডেপুটি স্পিকার লারমার বক্তব্যকে বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করেন।

৮. আসিফ নজরুলের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি স্বাধীনতাপূর্ব রাজনৈতিক ডিসকোর্সে ছিল না। খসড়া সংবিধান প্রণেতারা মূলত ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেছেন বলেই ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্ত করেছেন। খসড়া কমিটির একাধিক সদস্য এ ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিলেন।

৯. গণপরিষদে আওয়ামী লীগের বাইরের সদস্য ছিলেন মাত্র ২ জন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। এর মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মাত্র একটি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সেটি হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপরে সংসদে আলোচনার সুযোগ রাখা।

১০. বইয়ের শেষ অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, আমরা এখন যেসব সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করি, তার অনেক কিছু ৫০ বছর আগে গণপরিষদেও আলোচিত হয়েছিল। যেমন: প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ইত্যাদি।

এ ছাড়া, সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানার অধিকার, বিনা ক্ষতিপূরণে জাতীয়করণের ক্ষমতা, মৌলিক অধিকারের ওপরে বিধিনিষেধ, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে গণপরিষদে যে বিতর্ক হয়েছে, তার মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। বইটি সাংবিধানিক আইনের গবেষণাধর্মী বই হলেও এর বর্ণনাশৈলী গল্প বলার মতো। তাই যারা আইন বিষয়ের শিক্ষার্থী না, তারাও খুব সহজে বুঝতে পারবেন।

হাবিবুর রহমান: ঢাকা আইনজীবী সমিতির শিক্ষানবিশ

Comments

The Daily Star  | English

Flood situation in Sylhet, Sunamganj worsens

Heavy rains forecast for the next 3 days in region

2h ago