বই পরিচিতি

বিশ্বসাহিত্যে দুর্যোগ-ঘূর্ণিঝড়

যে কোন দেশের কালজয়ী সাহিত্যে উঠে আসে মানুষের দুঃখ ও দুর্দশা। ট্রয় নগরীর ট্র্যাজেডি কিংবা রূপকথার জগৎ, সবখানেই মানুষকে ঘিরে আবর্তিত হয় গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানুষের লড়াই তো অনেক পুরনো। গুহাবাসের সময় থেকেও প্রকৃতির শক্তির কাছে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে মানুষ। সেই গল্পও জানাতে চেয়েছে প্রজন্মের কাছে।

যে কোন দেশের কালজয়ী সাহিত্যে উঠে আসে মানুষের দুঃখ ও দুর্দশা। ট্রয় নগরীর ট্র্যাজেডি কিংবা রূপকথার জগৎ, সবখানেই মানুষকে ঘিরে আবর্তিত হয় গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানুষের লড়াই তো অনেক পুরনো। গুহাবাসের সময় থেকেও প্রকৃতির শক্তির কাছে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে মানুষ। সেই গল্পও জানাতে চেয়েছে প্রজন্মের কাছে।

যেমন দেশ বিদেশের সাহিত্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঘূর্ণিঝড় হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। শুধু মানবেতর গল্পই নয়; বরং ম্যাজিক রিয়েলিজমের মত নিরীক্ষাধর্মী বিষয়বস্তুতেও ঘূর্ণিঝড় ছিল প্রাসঙ্গিক। গল্প-উপন্যাসের বাইরেও এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা, ইতিহাস তথা নন-ফিকশন ঘরানার বইও রয়েছে অনেক। এই লেখায় নির্বাচিত বইয়ের পরিচয় তুলে ধরব।

দ্য কে
থিয়েডোর টেইলর

১১ বছর বয়সী ফিলিপ নামের এক কিশোরকে নিয়ে লেখা উপন্যাস 'দ্য কে' (The Cay)। এতে দেখা যায়, ফিলিপের মা ভার্জিনিয়ার উদ্দেশ্যে জাহাজে রওনা দেন কারণ তিনি জার্মানদের আক্রমণের ভয় করছিলেন। কিন্তু মাঝ সমুদ্রে টর্পেডোর আঘাতে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কিশোর ফিলিপ বিচ্ছিন্ন হয়ে টিমোথি নামের একজন বৃদ্ধ লোক ও একটি বিড়ালের সঙ্গে আলাদা হয়ে সমুদ্রে আটকা পড়েন। সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, একসময় ফিলিপ দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলতে শুরু করে।

বহু কষ্টে একটি দ্বীপ খুঁজে পায় তারা। সেখানে একটি ছোট পাত্রের মধ্যে নুড়ি রেখে তারা দিনের হিসেব করতে থাকে। সেই দ্বীপে ভয়ংকর সব দুর্যোগ পেরিয়ে একসময় ফিলিপ ঠিকই উদ্ধার হয়। তবে ততদিনে বৃদ্ধ টিমোথির করুণ পরিণতি ঘটেছে। বছরখানেক পর অস্ত্রপাচারের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে সমুদ্র অভিযাত্রী হওয়ার পরিকল্পনা করে ফিলিপ। এ যেন এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে দুই প্রজন্মের টিকে থাকার গল্প। থিয়েডোর টেইলরের লেখা এই বিখ্যাত উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। কিশোর বয়সীদের জন্য বইটি বেশ জনপ্রিয়।

তবে বৃদ্ধ টিমোথি নামের লোকটিকে 'নিগ্রো' হিসেবে দেখানোর কারণে পরবর্তীতে প্রচুর সমালোচিত হয় বইটি। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরের বছর ১৯৭০ সালে বইটিকে 'জেন অ্যাডামস চিলড্রেন বুক অ্যাওয়ার্ড' দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৭৪ সালে কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ভুল করে বইটিকে সম্মাননা দিয়েছি। বইটি মূলত 'বর্ণবাদ' প্রকাশ করে। এছাড়াও ২০২০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া শহরের 'বারবাঙ্ক হাই স্কুল'সহ বেশ কিছু স্কুলে বইটি পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেয়।

ট্রেসি
গ্যারি ম্যাকে

১৯৭৪ সালের ক্রিসমাসের দিন। অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন শহর যখন জেগে উঠলো, ততক্ষণে ট্রেসি নামের ঘূর্ণিঝড় পুরো শহরকে ঘিরে ফেলেছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ডারউইন শহরে ক্রিসমাসের ছুটি দেয়া হয়েছে। সেদিনই অনেক লোকের মত জোসেফাইন ফোরম্যান নামের একজন ক্রিসমাসের দুপুরের খাবার হিসেবে ভালো-মন্দ রান্না করেছেন। জিওফ নামের আরেকজন ক্রিসমাসের কেনাকাটা করেছেন। ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে একটু বেশি বাতাস হবে- এমন ধারণাই ছিল সবার। কিন্তু ক্রিসমাসের সকালটায় সবই পাল্টে গেল!

৩০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে আসা সেই ঘূর্ণিঝড় ডারউইন শহরকে তছনছ করে দিলো। ক্রিসমাসের দিন সকালে যারা চোখ খুলেছিল, তারা ভাগ্যবান মনে করছিলো নিজেদের। কারণ তখনও তারা বেঁচে ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এ এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়। এই দুর্যোগের ৩০ বছর পর, বেঁচে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা হয়েছে দুর্দান্ত বই 'ট্রেসি: দ্য স্টর্ম দ্যাট ওয়াইপড আউট ডারউইন অন ক্রিসমাস ডে ১৯৭৪'।

সি অফ স্টর্ম
স্টুয়ার্ড বি. শোয়ার্টজ

বইটি মূলত উত্তর আটলান্টিকে ঘটা গত পাঁচশো বছরের ঘূর্ণিঝড়কে নিয়ে লেখা। ষোড়শ শতাব্দী থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলোকে বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সহ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছে। যা আন্তর্জাতিক দুর্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০১৫ সালে বইটি প্রকাশ হওয়ার পর, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা আগ্রহী গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

বইটির সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, এখানে নিছক ঘূর্ণিঝড়ের নাম ও বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়নি; বরং সেসময় ঘূর্ণিঝড় সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিল, সেসব প্রতিক্রিয়াও লেখা হয়েছে।

আ হাই ওয়াইন্ড ইন জ্যামেইকা
রিচার্ড হিউজস

এটি চিরায়ত বইগুলোর মধ্যে বিশ্বসাহিত্যে বেশ জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার বই। গুডরিডসে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে নয় হাজারের বেশি মানুষ বইটিকে রেটিং দিয়েছেন। ইংরেজি ভাষার সাহিত্যের চমকপ্রদ ও প্রশংসা পাওয়া গল্পগুলোর মধ্যে এটি একটি। 

এতে দেখা যায়, জ্যামেইকা অঞ্চলে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে বাঁচতে একটি পরিবার তাদের সন্তানদের ইংল্যান্ডে নিরাপদ স্থানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পথে তারা জলদস্যুর কবলে পরে এবং ঘটনাচক্রে দস্যুদের জাহাজে শিশুরা থেকে যায়। জলদস্যুদের প্রধান এই শিশুদের নিয়ে এক প্রকার ঝামেলায় পরে যান। তবে গল্পের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজও এগোতে থাকলে আমরা দেখতে পাই, চারপাশের ঘটনাগুলো আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আড়ালে এক ভীতিকর গল্প তৈরি হয়। যেখানে সন্ত্রাস, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে প্রকাশিত হওয়া বইটিকে অনেকেই টানটান উত্তেজনাপূর্ণ বই হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে। তবে গল্পের রোমাঞ্চের আড়ালে ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা এবং এর প্রভাবে জীবনের অদ্ভুত মোড় নেয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠে।

ঘূর্ণিঝড়কে ঘিরে ভয়াবহতা ও টিকে থাকার মত গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র। তবে চলচ্চিত্র জনপ্রিয় হওয়ার আগের যুগে আমরা মঞ্চ নাটকের চিত্রনাট্যে ঘরানার গল্পে দেখতে পাই। তবে প্রাচীনকাল থেকেই শিল্প-সাহিত্যের সবগুলো গল্প বলার মাধ্যমেই ঘূর্ণিঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি প্রাসঙ্গিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চর্চা হয়ে আসছে।

সাইক্লোন
মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বইটি বিজলী নামের অসম্ভব সাহসী একজন মেয়েকে নিয়ে। কিশোর উপযোগী মুহম্মদ জাফর ইকবালের বইটি বেশ জনপ্রিয়। বই পাঠকদের সামাজিক প্ল্যাটফর্ম গুডরিডসে এখন পর্যন্ত বইটির রেটিং দিয়েছেন চারশোর বেশি মানুষ। এর উৎসর্গে মৃত্যুপথযাত্রী নভেরা নামের একটি মেয়ের কথা বলা হয়েছে। যেটি কিশোর বয়সী পাঠকের মন জীবনে টিকে থাকার ব্যাপারে উসকে দেয়।

বিজলী কীভাবে ঘূর্ণিঝড়ে সব হারিয়ে জীবনে আশা নিয়ে টিকে থাকে, এমনই এক গল্প। এছাড়াও লেখকের বর্ণনা ঘূর্ণিঝড়কে বইয়ের পাতাতেই বেশ জীবন্ত করে তোলে। 'সন্ধেবেলা থেকে ঝড়ের বেগ বাড়তে লাগলো। প্রথম দিকে এটা দমকা হাওয়ার মতো ছিল, আস্তে আস্তে সেটা সত্যিকার ঝড় হয়ে গেল। বাতাসটা পুব দিক থেকে পশ্চিমে বইছে। বিজলী বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকায়। নিশ্চয়ই আজ পূর্ণিমার রাত, আকাশের মেঘ ফুটে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। চারিদিকে কেমন যেন একটা অপার্থিব আলো। সেই আলোতে সবকিছু কেমন যেন অবাস্তব স্বপ্নের মতো দেখায়। বাতাসের এক ধরনের শব্দ শোনা যায়, শীষ দেওয়ার মতো শব্দ। শব্দটা কোথা থেকে আসে কে জানে। সেই শব্দ ছাপিয়ে মাঝে মাঝে সমুদ্রের গর্জন শোনা যেতে থাকে। বিজলী বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো বাতাসের প্রচণ্ড আঘাতে গাছগুলো কেমন যেন মাথা কুটছে। বাড়ির সামনে নারকেল গাছের পাতাগুলো ঝাপটে পড়ছে, পুরো গাছটাই মাঝে মাঝে নুইয়ে পড়ছে। বিজলীদের বাড়িটা বাতাসে থরথর করে কেঁপে উঠছে, মনে হয় যেকোনো সময় বুঝি উড়ে যাবে'। 

২০১৮ সালে প্রকাশিত বইতে কিশোর উপযোগী বর্ণনায় উঠে এসেছে ঘূর্ণিঝড়ের চিত্র।

ঘূর্ণিঝড় (২৯শে এপ্রিল ১৯৯১)
রুমা হামিদ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের স্মরণকালের ঘূর্ণিঝড়। ভয়ংকর রাত শেষে পরদিন সকালবেলা। দ্বীপবাসীর মুখোমুখি হয় এক অচেনা প্রকৃতির। শোনা হয় না সেই সকাল জাগা পাখির ডাক। তার পরিবর্তে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম সন্দীপের খালে, বিলে, জমিতে ও পানিতে লাশের পর লাশ, আপন মানুষের খুঁজে স্বজনদের আহাজারি। থেমে যায় পেশাজীবীর প্রাত্যহিক জীবন । প্রকৃতির সেই বীভৎস রূপে চেনা জীবন অচেনা হয়ে যায়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ংকর মূহুর্ত ও সেই  সময়ের জীবনচিত্র নিয়ে রচিত হয় উপন্যাস- ঘূর্ণিঝড় ২৯শে এপ্রিল ১৯৯১।

২০২০ সালে প্রকাশিত উপন্যাসে উঠে এসেছে নব্বই দশকে বাংলাদেশের উপর আঘাত হানা ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ও তার পরবর্তী সময়। তাতে মারা যায় প্রায় এক লক্ষ আটত্রিশ হাজার মানুষ এবং সর্বস্ব হারিয়েছিল এক কোটির অধিক মানুষ। ভয়ঙ্কর সেই দুর্যোগের কথাই উঠে এসেছে ছোট কলেবরের উপন্যাসটিতে।

Comments