পর্যালোচনা

ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর পত্রোপন্যাস ‘দুর্দানা খানের চিঠি’

‘দুর্দানা খানের চিঠি'-র সবচেয়ে বড়ো গুণ হচ্ছে এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই চাপিয়ে দেওয়া ভাব কিংবা ভঙ্গি; এবং এর জন্যে অধিক ভালোবাসার দাবীদার।

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী প্রবন্ধ লেখা  ও গবেষণা করছেন অনেকদিন। কথাসাহিত্যের প্রথম কাজ হিসেবে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে 'দুর্দানা খানের চিঠি'। এতে একজন সাহিত্যিকের জীবন, মানবিক সম্পর্ক ও সংকটের এক গভীর মিথস্ক্রিয়া উঠে এসেছে এই রচনায়।

পাঠক চমকে উঠবেন! বইয়ের পেছনে লেখা: ''৯ অক্টোবর ২০২৫। নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুরস্কার পেয়েছেন নিউ ইয়র্ক নিবাসী বাঙালী ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ খান। বিচ্ছেদের দুই যুগ পর অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখলেন তার প্রথম স্ত্রী দুর্দানা খান। দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন 'দ্বিতীয় আলো' পত্রিকাকে জানালেন, 'আমন্ত্রণ পেয়েছেন, কিন্তু তিনি নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না।' কী ঘটলো শেষ পর্যন্ত?'' – যেন এ প্রশ্নের উত্তর দিতেই উপন্যাসটি লেখা।

'দুর্দানা খানের চিঠি' পড়ার সময় প্রথমেই যে প্রশ্নটা মনে জাগতে পারে, এ কি কোনো পত্রোপন্যাস?  হয়তো। তবে পুরোপুরি নয়। কারণ উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র, এবং ঘটে যাওয়া ও ঘটতে থাকা  অধিকাংশ ঘটনার কথা আমরা জানতে পারি উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের লেখা চিঠি পড়ে। মনে হয়, উপন্যাসের যে লেখকের  নাম আমরা বইয়ের প্রচ্ছদে দেখেছি, সেই লেখক এখানে তেমন কিছু লিখছেন না, কিছু করছেনও না; তিনি না লিখছেন নিজের কথা, না লিখছেন অন্যের কথা। একবার মনে হতে পারে, লেখকের কাজটা মনে হয় তাহলে সহজ হয়ে গেলো। কিন্তু আসলে কি তাই?

সার্থকভাবে নিজের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা বা দূরে থেকে দেখার ব্যাপারটা অন্তত কোনো ঔপন্যাসিকের পক্ষে সহজ নয়। লেখক সেটা করতে পেরেছেন। চরিত্রগুলোর সাবলীলতা তার প্রমাণ। এখানে কোনো চরিত্রকেই একটাও বেশি কথা বলতে দেখি না আমরা। লেখক বরং যাকে দিয়ে চিঠি লেখাচ্ছেন, চিঠিটা তারই লেখা বলে মনে হয় আমাদের। আমাদের এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে চরিত্রগুলোর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সরস উল্লেখ্য।

লেখক অবশ্য পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকেননি। মাঝেমাঝে দেখা দিয়ে যান, বেশিক্ষণের জন্য নয়। স্বল্প সময়ে কিছু তথ্য, কিছু ঘটনার বর্ণনা দিয়ে যান তিনি। উপন্যাসের শেষে লেখক একটি পরিশিষ্টও দিয়েছেন। এতে আমরা কিছু চরিত্রের পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাই- এবং এ-ও জানতে পারি যে, উপন্যাসটি এখনো শেষ হয়নি। যে চিঠিগুলোর পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি, সেগুলো হয়তো ভবিষ্যতে হুমায়ুন আহমেদ, অরিত্র আহমেদ, এলেনা, দুর্দানা খান এবং পার্শ্ব চরিত্রদের সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে।

এ উপন্যাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে কোনো চরিত্রই ঠিক সেই অর্থে প্রধান চরিত্র নয়। আবার প্রধান চরিত্র নেই বলেই বলার মতো কোনো পার্শ্ব চরিত্রের সাক্ষাতও আমরা পাই না।  এই যে কোনো একক কেন্দ্রীয় চরিত্র না থাকা, এটা লেখককে এক ধরনের স্বাধীনতা দেয় গল্পটা তার যেভাবে ইচ্ছা, সেভাবে বলার। কোনো বিশেষ চরিত্রে বা বিশেষ প্লটের জালে জড়িয়ে পড়লে লেখকের পক্ষে এতোটা হাত খুলে লেখা হয়তো সম্ভব হতো না।

তাছাড়া ২০২৫-এর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এই দু'মাসের মধ্যে সংঘটিত হয় উপন্যাসের সব ঘটনা। এই সময়ে মানুষের জীবনে অজস্র কিছু ঘটে যায়, ব্যাপারটা এমন নয়; কিন্তু দু'মাসে মানুষ অনেক কিছু ভাবতে পারে, নিজের ও অন্যের সঙ্গে অনেক বোঝাপড়ায় আসতে পারে। সর্বোপরি, কোনো বিশেষ ঘটনা অনেক মানুষকে হুট করে এক জায়গায় টেনে আনতে পারে, যেটা অন্য সময় সম্ভব হতো না হয়তো। এই উপন্যাসে সেটাই হয়। হুমায়ুন আহমেদের নোবেল পাওয়ার সূত্রে অনেক চরিত্র নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ শুরু করলো, উপন্যাসের শুরু মূলত এখান থেকেই। 

তবে এরপরে আর উপন্যাসটা সরলরেখা ধরে এগোয় না। জ্যঁ লুক গোদার্দ একবার বলেছিলেন, 'a film should have a beginning, a middle and an end, but not necessarily in that order.' বলা হয়, গোদার্দের In Praise of Love সিনেমাটা এই উক্তির আলোকেই তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্রে যেটা সম্ভব, উপন্যাসেও সেটা সম্ভব হবে, এমন কোনো কথা নেই। তবে যে কথাটা এখানে বলা দরকার, সেটা হচ্ছে, এ উপন্যাসের আদি-অন্ত থাকলেও সরলরেখা টেনে সেগুলো ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। চরিত্রগুলো যখন স্মৃতিচারণ করে, যখন তারা অতীতে ফিরে যায়, আবার যখন লেখক তাদেরকে টেনে এনে বর্তমানে হাজির করান, তখন আমাদের ভেতরেও ওঠানামা চলতে থাকে; একবার অতীত হয়ে ওঠে প্রধান, আবার একবার বর্তমানের দিকেই মনোযোগ দিতে বাধ্য হই আমরা। মানুষের জীবন সাধারণত অনেক এলোমেলোই হয়ে থাকে; তার উপর যদি আধুনিক যুগের কিছু মানুষের ইতোমধ্যেই এলোমেলো হয়ে যাওয়া কিছু জীবনের গল্প লেখক তাদের মুখ দিয়েই বলতে শুরু করেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই 'আদি-মধ্য-অন্তে'-র ব্যাকরণ মেনে আর উপন্যাস লিখতে পারেন না। 

তবে একটা জিনিস একটু অবাক লাগে। সেটা হলো চিঠি লেখা। এই উপন্যাসে সুখ, স্মৃতি, বেদনা, কাতরতা, ক্ষোভ, সবই আছে। কিন্তু এরপরও যে পুরো উপন্যাস জুড়ে এক ধরনের সরল-সহজ স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে থাকে, এর কারণ সম্ভবত এই যে, চরিত্রগুলো চিঠি লিখছে। লিখতে লিখতেই তারা বোঝাপড়ায় আসে। যে কথা হয়তো মুখে বলা যেতো না, সে কথা চিঠি লিখে জানিয়ে দেয় তারা। এবং সবকিছুরই উল্লেখ থাকে সেখানে। এ উপন্যাসের সব চরিত্রই সমকালীন। কেবল একটি কাজ তারা করে সমকালের বাইরে গিয়ে। তারা চিঠি লেখে। তারা চিঠি না লিখলে লেখক এ উপন্যাস লিখতে পারতেন  না। এ উপন্যাস কেবল এভাবেই লেখা সম্ভব।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপন্যাসের অনেক চরিত্রই আমাদের পরিচিত। একটু সচেতন পাঠকমাত্রই বুঝবেন, উপন্যাসের চরিত্রগুলো আকাশ থেকে পড়েনি। কিন্তু এই যে বাস্তবের কিছু পরিচিত বা বিখ্যাত চরিত্রকে নিয়ে কল্পনার খেলা, এই খেলার সুবিধা যেমন আছে, বিপদও তেমনি আছে। সুবিধাটা হচ্ছে, অনেক পাঠকই জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের নাম দেখে উপন্যাসটা পড়তে আগ্রহী হয়, এবং তাতে হয়তো উপন্যাসটার কাটতি বাড়ে। কিন্তু বিপদ হচ্ছে, এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে লেখক অনেক সময় সুবিচার করতে পারেন না। বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল ঠিকমতো হলে লেখক এই বিপদ এড়াতে পারেন এবং আমার ধারণা 'দুর্দানা খানের চিঠি'-র লেখক সেদিক থেকে সফল। 

অবশ্য এক হিসেবে এই উপন্যাসের কোনো ঘটনা এখনো ঘটেইনি। সেগুলো ঘটার কথা, তবে ২০২৫ সালে। লেখক অবশ্যই ভবিষ্যদ্বক্তা নন, কিন্তু লেখক যে এই ফ্যান্টাসি লিখতে পারলেন, তার কারণ হয়তো লেখক নিজেই এমন একটা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতেন। তবে, এসব বিশ্লেষণ, শেষ বিচারে, অবান্তর। আমরা যেনো কুন্ডেরার উপদেশ ভুলে না যাই, 'So the way to read the tale is to let the imagination carry one along.' শেষ পর্যন্ত, এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই লেখকেরই সৃষ্টি, লেখকের স্বাধীন কল্পনার ফসল তারা। 

'দুর্দানা খানের চিঠি'-র সবচেয়ে বড়ো গুণ হচ্ছে এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, নেই চাপিয়ে দেওয়া ভাব কিংবা ভঙ্গি; এবং এর জন্যে অধিক ভালোবাসার দাবীদার। লেখক সাবলীল হতে চেয়েছেন, পাঠকদেরকে আরাম দিতে চেয়েছেন। সেটা দারুণভাবে করতে পেরেছেন। ফলে  অনেক পাঠকের মনে জায়গা করে নিবে এই উপন্যাস এমনটা প্রত্যাশা। 

Comments

The Daily Star  | English

Afif exposing BCB’s bitter truth

Afif Hossain has been one of the most fortuitous cricketers in the national fold since his debut in February 2018.

7h ago