দিনমজুরের হাট ‘জনহাট’
ভোর হলেই এই হাটে দিনমজুরদের ভিড় জমতে শুরু করে। বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা আসেন কৃষি কাজের জন্য শ্রমিক খুঁজতে। কাজের ধরন ও দর-কষাকষিতে মজুরি মনোপুত হলেই কাজে বেরিয়ে পড়েন শ্রমিকেরা।
ফরিদপুর শহরের গোলচামট এলাকায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে বসা এই হাটের নাম ‘জনহাট’। সারা বছরই এই হাটে শ্রমিকের সমাগম থাকে। এখন পাট কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় শ্রমিকের চাহিদা ও ব্যস্ততা বেড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে শ্রমিক সরবরাহ সহজ করতে জনহাটের যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা এই হাটে প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত শ্রমিক ও নিয়োগদাতাদের ভিড় থাকে। শ্রমিকরাও দল বেঁধে আসেন বিভিন্ন জেলা থেকে।
গতকাল শুক্রবার সকালে জনহাট ঘুরে দেখা যায়, শত শত শ্রমিক কৃষিকাজের আশায় অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা কৃষক ও খামারিরা শ্রমিকদের সঙ্গে কাজের ধরন ও মজুরি নিয়ে আলোচনা করে চুক্তি করছেন। চুক্তি হলে প্রতিজন শ্রমিকের জন্য বাজার কর্তৃপক্ষকে ১০ টাকা ফি দিতে হয়। নিয়োগদাতা ও শ্রমিকদের নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং মজুরির হার খাতায় লিখে রাখা হয়।
হাটে আসা নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা আলীম উদ্দিন (৪৭) বলেন, ‘গত তিন বছর ধরে পাটের মৌসুমে এখানে আসছি। এ সময় কাজও বেশি পাওয়া যায়, আয়ও ভালো হয়।’
একই এলাকার জয়নাল মণ্ডল (৪৬) বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখন তেমন কাজ নেই। এখানে এসে দৈনিক ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরির কাজ পাওয়া যায়।’
রাজশাহী সদর উপজেলার রাবিউল ইসলাম জানান, তিনি ও তার সঙ্গে আসা আরও ১৪ জন শ্রমিক নাটোর ও রাজশাহী থেকে শিবচরে পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও ধোয়ার কাজে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আট দিনের জন্য চুক্তি হয়েছে। দিনে হাজার টাকা মজুরি পাব, পাশাপাশি তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে।’
ঈশ্বরদীর কাজিপুর গ্রামের মাহমুদুল প্রামাণিক (৩৮) বলেন, ‘পাঁচ দিন আগে ফরিদপুরে এসেছি। চরভদ্রাসনের চর হাজীগঞ্জ এলাকায় পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার কাজ করে পাঁচ দিনে পাঁচ হাজার টাকা আয় করেছি।’
মেহেরপুরের শাহাবুদ্দিন গত ২০ দিন ধরে জনহাটে আসছেন। নিজের জেলা ছেড়ে এত দূরে কেন আসেন, জানতে চাইলে বলেন, ‘মেহেরপুরে কাজ কম, মজুরিও কম। সেখানে দিনে ৩০০ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। এখানে এক সপ্তাহে যা আয় করি, বাড়িতে এক মাসেও তা আসে না।’
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বুইতা গ্রামের জহুরুল ইসলাম (৫৫) বলেন, ‘সব খরচ বাদ দিয়েও পাটের মৌসুমে মাসে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারি। তাই চার বছর ধরে এখানে আসছি।’
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট এলাকার বাসিন্দা শিরিনা বেগম জনহাটে এসেছেন পাট কাটার জন্য তিনজন শ্রমিক নিতে। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে পাট করেছি। স্বামী অসুস্থ, ছেলেও নেই। তাই নিজেই শ্রমিক খুঁজতে এসেছি।’
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বাঘাট গ্রামের কৃষক আবদুল হাই মিয়া বলেন, ‘পাট কাটার সময় এলাকায় শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। তাই জনহাট থেকে তিনজন শ্রমিক নিয়েছি। প্রত্যেককে ৯৫০ টাকা করে দিতে হবে।’
শুধু শ্রমিক নয়, জনহাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় নানা ব্যবসাও। বাজারের আশপাশে প্রায় ৬০-৭০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২০টি খাবারের হোটেল, আটটি সেলুন, চারটি পোশাকের দোকান, তিনটি লোহার সরঞ্জাম বিক্রির দোকান এবং দুটি কামারশালা।
হাটসংলগ্ন হোটেলের মালিক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় আড়াই-তিন হাজার শ্রমিক এখানে আসছেন। আমাদের ব্যবসাও ভালো চলছে।’
পাবনার সুজানগর উপজেলার সাগরকান্দা গ্রামের হালিমা খাতুন দুই বছর আগে স্বামীকে নিয়ে ফরিদপুরে এসেছেন। তার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন, আর তিনি হোটেল চালান। হালিমা বলেন, ‘পাটের মৌসুমে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হয়।’
জনহাটের কামার সুপলাল মণ্ডল জানান, পাটের মৌসুমে কাস্তে ধার দেওয়া, মেরামত ও বিক্রি করে তিনি প্রতিদিন চার থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়।
জনহাটের তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. রাব্বি হোসেন বলেন, ‘ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন লোকজন শ্রমিক নিতে আসেন। বর্তমানে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১ হাজার শ্রমিক কাজ পাচ্ছেন। এখন শ্রমিকের চাহিদা বেশি থাকায় দৈনিক মজুরি ৯০০ থেকে ১২০০ টাকায় পৌঁছেছে।’
তিনি বলেন, জনহাট শুধু কর্মসংস্থানই নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।