ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে: ব্যয় বেড়ে হচ্ছে পদ্মা সেতুর কাছাকাছি
চীনের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ব্যয় এক লাফে ৫৪ শতাংশ বাড়তে যাচ্ছে। প্রায় ৯ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা বেড়ে প্রকল্পটির মোট ব্যয় গিয়ে ঠেকতে পারে ২৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকায়। টাকার এই অঙ্ক দেশের মেগা প্রজেক্ট পদ্মা সেতু নির্মাণের খরচের চেয়ে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকা কম।
প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব আগামী বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত প্রকৌশল কাজ, জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, কর ও ভ্যাটের ব্যয় বৃদ্ধি—এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ২০১৭ সালে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এর মধ্যে চীনের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
২০২২ সালের জুনে অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় ৬৫২ কোটি টাকা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা হয়। তবে সে সময় চীনের অর্থায়নের অংশ কমিয়ে ৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা হবে। অন্যদিকে চীনের অর্থায়ন ৩৭ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা হবে।
জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা সংশোধন ও প্রকল্পে নতুন উপাদান যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদও বাড়িয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই বছরের ত্রুটিদায় (ডিফেক্ট লাইয়াবিলিটি) সময়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, যা প্রথম সংশোধিত প্রকল্প ব্যয়ের ৮৩ শতাংশ এবং নতুন প্রস্তাবিত ব্যয়ের ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।
নির্মাণকাজ শুরুর আগেই প্রকল্পটি দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়ে। চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (এক্সিম ব্যাংক) সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করতে প্রায় চার বছর লেগে যায়। ফলে প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে।
এই বিলম্ব, বিশ্ববাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রথম সংশোধনীতে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮৬ টাকা। সর্বশেষ সংশোধনীতে তা ধরা হয়েছে ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা।
শুধু টাকার অবমূল্যায়নের কারণেই প্রকল্প ব্যয় ৩ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা বেড়েছে, যা মোট প্রস্তাবিত ব্যয় বৃদ্ধির প্রায় ৩৯ শতাংশ।
এ ছাড়া নকশা পরিবর্তনের কারণে প্রয়োজনীয় প্রকৌশল কাজের জন্য আরও ১ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে।
এক্সপ্রেসওয়ের পথ টঙ্গী ও সাভার অংশে তুরাগ নদের তিনটি শাখা অতিক্রম করবে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নৌপথের নাব্যতার শ্রেণি উন্নীত করায় সেতুর নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভবন ও টোল প্লাজার প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বাড়ানোও রয়েছে।
ঢাকা-টঙ্গী অংশে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভবিষ্যৎ ট্রানজিট করিডোরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পিয়ারের উচ্চতা ও স্প্যানের দৈর্ঘ্যও বাড়ানো হয়েছে।
বাইপাইলে প্রাথমিক নকশায় শুধু চন্দ্রামুখী একটি ভায়াডাক্ট ছিল। সংশোধিত প্রস্তাবে সেখানে সাভার-নবীনগর সড়কের সঙ্গে সংযোগ উন্নত করা এবং দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে একটি ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা যাত্রীদের জন্য এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সরাসরি সংযোগ দিতে কাওলায় একটি অতিরিক্ত প্রবেশ ও বের হওয়ার র্যাম্প নির্মাণ করা হবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারি অনুমোদিত এসব নকশা পরিবর্তনের ফলে নির্মাণকাজের সময় বেড়েছে এবং প্রকল্পের পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির বাকি ৩ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর এবং কর ও ভ্যাটের হার বৃদ্ধির কারণে যুক্ত হয়েছে।
২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো ও বাইপাইল অতিক্রম করবে। এরপর ঢাকা ইপিজেড এড়িয়ে সাভারের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হবে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত এই সড়কটি চালু হলে ঢাকার যানজটপূর্ণ সড়ক এড়িয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে একটি দ্রুতগতির যোগাযোগ করিডোর তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা, নগরীর যানজট কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সরকারি লক্ষ্যের সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় ও যাতায়াতের সময়ও কমে আসবে।