‘দক্ষ জনবল ছাড়া লজিস্টিকস খাতের সুফল পাওয়া যাবে না’

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি লজিস্টিক খাত। বৈশ্বিক বাণিজ্য যত বাড়ছে, লজিস্টিক খাতের গুরুত্বও ততই বাড়ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি লজিস্টিক খাতের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য করে তুলেছে। তাই এখন লজিস্টিক খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া দ্রুত করার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি লজিস্টিক খাত। বৈশ্বিক বাণিজ্য যত বাড়ছে, লজিস্টিক খাতের গুরুত্বও ততই বাড়ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি লজিস্টিক খাতের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য করে তুলেছে। তাই এখন লজিস্টিক খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া দ্রুত করার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

তবে এই খাতে দক্ষ মানবসম্পদের বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। অথচ দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা না হলে লজিস্টিক খাতের সুফল পাওয়া যাবে না।

লজিস্টিক খাতের মধ্যে রয়েছে পরিবহন, পণ্য সংরক্ষণাগার, বেসরকারি কনটেইনার ডিপো ও বন্দর সেবাসমূহ। 

এই খাতের সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো হলো বন্দর, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, ডিপো পরিচালনাকারী ও পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো। 

দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে এসব সেবা খাতের কার্যক্রমও বেড়ে চলেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৫২ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে গত অর্থবছরে আমদানি-রপ্তানি মিলে বৈদেশিক বাণিজ্যের আকার ছিল ১৪১ বিলিয়ন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে গত অর্থবছরে বৈদেশিক বাণিজ্য ৩৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বৈদেশিক বাণিজ্যের আকার ছিল ১০৪ বিলিয়ন ডলার।  

চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের চিত্রেও লজিস্টিক খাতের আকার বাড়ার চিত্র ওঠে এসেছে। যেমন, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছরে ১৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে। পরবর্তী ৫ বছরে (২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২) এই সংখ্যা বেড়ে বছরে গড়ে ২৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনারে উন্নীত হয়েছে। অর্থ্যাৎ ৫ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ৪৬ শতাংশ। 

কনটেইনার ছাড়াও বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিংও বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছরে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টন বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে। পরবর্তী ৫ বছরে (২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২) পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ বেড়ে বছরে গড়ে ৭ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। 

এ সময় জাহাজ আগমনের হারও বেড়েছে। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছরে ২ হাজার ৫৯২টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। পরবর্তী ৫ বছরে এই সংখ্যা বেড়ে গড়ে বছরে ৩ হাজার ৯৪২টিতে উন্নীত হয়েছে। 

এই চিত্র থেকে স্পষ্ট যে, আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য বড় হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য বন্দর থেকে ডিপো ও কারখানায় নেওয়া এবং রপ্তানি পণ্য কারখানা থেকে ডিপো হয়ে বন্দর দিয়ে জাহাজীকরণে বিশাল কর্মযজ্ঞ হচ্ছে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা করা গেলে এসব পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে খরচ কমবে। উৎপাদনেও খরচ কমবে। যে দেশের লজিস্টিকস সেবার মান ভালো সে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ তত কম। লজিস্টিক সেবার মান ভালো হলে অর্থনীতিও দ্র্রুত উন্নতি করছে। 

তবে বৈশ্বিক ক্রমতালিকায় আমরা এখনো লজিস্টিক খাতে পিছিয়ে রয়েছি। বিশ্বের শীর্ষ লজিস্টিক সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাজিলিটি লজিস্টিকস এ বছর উদীয়মান ৫০টি দেশের লজিস্টিক খাত নিয়ে একটি সূচক তৈরি করেছে। এই সূচকে বাংলাদেশ সার্বিকভাবে ৩৯তম অবস্থানে রয়েছে। এই তালিকার শীর্ষ ৫টি দেশ হচ্ছে চীন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। এই তালিকায় এশিয়ার অপর দুই দেশ পাকিস্তান (২৭) ও শ্রীলঙ্কার (৩৩) চেয়েও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এর অর্থ হলো, লজিস্টিক খাতে আমাদের সামনে আরও উন্নতি করতে হবে। 

বৈদেশিক বাণিজ্য গতিশীল করতে হলে লজিস্টিক খাতের সম্প্রসারণ অপরিহার্য হয়ে ওঠছে। পাশাপাশি দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়বে সামনে। আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে একটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত করতে লজিস্টিক খাতের গুরুত্ব বেশি। ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পদ্মা সেতু চালু হয়েছে। আগামী দিনে দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। শিল্পকারখানা গড়ে ওঠবে। এতে লজিস্টিক খাতে চাপ তৈরি করবে। আবার দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে সরকার। কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে রপ্তানি শুরু হয়েছে। পণ্য আমদানি হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল পুরোদমে চালু হলে বিশাল চাপ তৈরি হবে লজিস্টিক খাতে। নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়বে।

প্রসঙ্গত, আমাদের প্রতিবেশী ভারত সরকার ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় বাজেটে লজিস্টিক এবং সাপ্লাই চেইন সেক্টরকে অত্যাধিক অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার 'গতি শক্তি' নামের মহাপরিকল্পনার আওতায় আগামী ৩ বছরে এই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি পণের চলাচলকে নিশ্চিত করার জন্য এই টাকা আগামী ৩ বছরে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কার্গো টার্মিনাল তৈরির জন্য ব্যয় করবে।

লজিস্টিকস কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রাণালয় বা বাণিজ্য মন্ত্রালয়ের অধীনে একজন সচিবের অধীনে একটি লজিস্টিকস বিভাগ স্থাপন প্রয়োজন।

লজিস্টিক খাতে দক্ষ জনবল না থাকায় বর্তমানে লজিস্টিক সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহে বিদেশ থেকে দক্ষ লোক আনতে হচ্ছে। অথচ দেশে শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৩৭ শতাংশই বেকার। এই শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তারা লজিস্টিকসহ নানা খাতের জন্য দক্ষ জনবল হয়ে ওঠতে পারে।  

দক্ষ জনবল যেমন দেশের লজিস্টিক খাতের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে। বিদেশ থেকে কর্মী আনতে হবে না। আবার দক্ষ জনবল যত বাড়বে ততই বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পথও সুগম হবে। রেমিট্যান্স আয়েও প্রভাব পড়বে।

 

খায়রুল আলম সুজন: সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)

 

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments