৭ মার্চের ভাষণ: যোগাযোগ প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ ভাষণের মূলভাবগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কথাবীজ দিয়ে তিনি এক নতুন মানচিত্রের ছবি এঁকেছেন। বাংলাদেশ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের রূপকল্প তুলে ধরেছেন।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ ভাষণের মূলভাবগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কথাবীজ দিয়ে তিনি এক নতুন মানচিত্রের ছবি এঁকেছেন। বাংলাদেশ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের রূপকল্প তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে পাকিস্তানের মৃত্যু ও বাংলাদেশের জন্ম ত্বরান্বিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পটভূমি, সম্বোধন, স্বরের ওঠা-নামা, উপমা ও অভিব্যক্তি স্বতন্ত্র রূপ। এখানে যোগাযোগকলার পরিপ্রেক্ষিত থেকে ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্লেষণ করা হবে।

সম্বোধন: ভাষণের শুরু এক দারুণ সম্বোধন দিয়ে। অতি নিরপেক্ষ সম্বোধন 'ভাইয়েরা আমার'। প্রচলিত অভ্যাসে রাজনীতিবিদগণ যেভাবে ধর্মীয় রীতিতে জনতাকে সম্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু সেই পথে যাননি। তিনি আশ্রয় নিয়েছেন নিরপেক্ষ শব্দবন্ধের। আমরা জানি, সম্বোধন খুলে দেয় সম্ভাবনার অমিত দ্বার। এ সম্বোধন জনতার হৃদয়ে অনুরণন জাগিয়েছে। প্রতীতি জন্মেছে এ সম্বোধন তো আপন ভাইয়ের প্রতি, আপন বোনের প্রতি।

অনার্য সংস্কৃতির মৌলচরিত্র অন্যকে আপন করার অদম্য শক্তি বঙ্গবন্ধু হৃদয়ে ধারণ করতেন। ৭ মার্চের ভাষণ 'আমার' ও 'আমাদের' শব্দের শাসন শাসিত। শুরুতেই এ সম্বোধন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হয়ে উঠেছে সংযুক্তির এক বিশেষ স্মারক। স্বাধীনতার স্বপ্ন: সম্বোধনের পর সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু অতিদ্রুত জাতীয় স্বপ্নটি জনতার সামনে আনেন। পরম্পরা বক্তব্য নিয়ে এগুতে থাকেন। নিশানা ধরিয়ে দেন, 'আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়... এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।' এ ভাষ্যে সংযুক্তি বা এনগেজমেন্ট আরও বেড়ে যায়। দর্শক-শ্রোতা আরও নিবিষ্ট হন, নড়ে-চড়ে বসেন।

ইতিহাস স্মরণ: এ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের দগদগে অংশ পরিভ্রমণ করেন দারুণ ভঙ্গিমায়। অডিয়েন্সকে স্মরণ করিয়ে দেন লাল অংশগুলো। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে জন-স্মৃতিতে টোকা দিলেন বিশেষ পারঙ্গমতায়; বলেন 'তেইশ বৎসরের করুন ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের ইতিহাস, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস।' ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৫৮, মার্শাল ল, ১৯৬৬ ছয় দফা ১৯৬৯ সালের আইয়ুব শাহীর পতন. . .ও ইয়াহিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ...১৯৭০ নির্বাচন নির্বাচন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ও অ্যাসেম্বলি নিয়ে টালবাহানা। 

দ্রুত ফ্ল্যাশব্যাক হয়। ইতিহাসের দগদগে অংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠে। ৭ মার্চের ভাষণ মূলত ছবিময় উপস্থাপনা। যার পেছনে রয়েছে কথাছবি, নিশ্চিত এটি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করেছে।

অবস্থান স্পষ্টীকরণ: এরপর তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। কী করতে চান, কী করা উচিত তা স্পষ্ট করেন। মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ তার রাজনীতির মূল আধেয়। সে মানুষ আজ নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং আক্রান্ত। ৭ মার্চ ভাষণে মোট আট বার রক্ত শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের রক্ত মূল্যহীন নয়। মানুষের রক্তের সঙ্গে একজন জাতীয়তাবাদী নেতা বেইমানী করতে পারেন না-তিনি তা স্পষ্ট করেন। 'রক্তের দাগ শুকায় নাই। শহীদের রক্তের ওপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান অ্যাসেম্বলিতে যোগদান করতে পারে না।'

দাবি: অতঃপর বাঙালির মুখপত্র হিসেবে তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে অপশন দেন। প্রস্তাব তুলে ধরেন। মোট চারটি দাবি।

১. মার্শাল ল উইথ ড্র করতে হবে;

২. সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে;

৩. যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা তদন্ত করতে হবে;

৪. জনগণের জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।...আসুন, অ্যাসেম্বলিতে বসি, আলাপ-আলোচনা করি।

তিনি ক্রমশ বক্তব্যটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে নিতে থাকেন।

দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থান: এবার বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি ধারণা দেন ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া তার কাছে কোনো ইস্যু না। বাংলার মানুষের মুক্তি তার মূল আরাধ্য। তিনি পরিষ্কার করে বলেন- 'আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।...একজনও যদি ন্যায্য কথা বলে আমরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় তার কথা মেনে নেব।' এ অভিব্যক্তি জনতার সঙ্গে জাতির পিতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে। ইস্পাত কঠিন সম্পর্কের এক ভিত্তি গড়ে উঠে।

নির্দেশনা: বার্তার কার্যকারিতা বক্তার দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থান ওপর নির্ভরশীল। বক্তার গ্রহণযোগ্যতা আসে তার জীবনাভ্যাস, অনুশীলন ও নৈতিকতার চর্চার মধ্য থেকে। বঙ্গবন্ধু শৈশব থেকে পরার্থবোধ নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, জেলে-জুলুম সহ্য করেছেন, সাদামাটা জীবনযাপন করেছেন, জনগণের সঙ্গে মিশেছেন, ক্ষমতার মোহ ছিল না। তিনি একজন পরীক্ষিত জননেতা। ফলে তিনি যখন নির্দেশনা দিচ্ছেন তখন অমোঘ নির্দেশ হয়েছে। 'আপনারা জানেন, আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই , যে আইজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্টকাছারি, আদালত ফৌজদারি, এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, তারপরে আর কি? সেমিগভার্মেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনও কিছু চলবে না।'

জনগণের করণীয় বিষয়ে পূর্ণ ও নিদর্শনামূলক বক্তব্যের প্রপাত পড়েছে রেসকোর্স ময়দানে। তিনি বলছেন, 'আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।' নেতাকে দিতে হয় দিকনির্দেশনা, পথ গন্তব্য। জনগণ বুঝে যান তাদের করণীয়।

সহমর্মিতা: বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের নৈতিকভিত্তি ছিল সহমর্মিতাবোধ। সহমর্মিতার পরশে আপন করে নিতে পারতেন। তিনি ধনী-নির্ধন, সমমত, ভিন্নমত সকলকে ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন গ্রহণোউন্মুক্ত ও সমন্বয়বাদী নেতা, মানবিক গুণের আধার। তিনি যেমন বৃহৎ-এ মনোযোগ দিতেন তেমনি ক্ষুদ্রেও নিমগ্ন থাকতেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের বক্তব্য সহমর্মিতার পরাকাষ্ঠা। ৭ মার্চের ভাষণে গরিব ও শ্রমিকের প্রতি ফুটে উঠেছে সহমর্মিতা। তিনি বলছেন,  'গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেইজন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে... রিকশা ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, সব চলবে, লঞ্চ চলবে।' গরিববান্ধব পরিবহনের ব্যাপারে তাঁর সূক্ষ্মমমতা সহজে ধরা পড়ে।

তিনি আরও বলছেন, 'আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, সান্ধ্য আইনের জন্য যোগদান করতে পারেন নাই, প্রত্যেকটা, প্রত্যেকটায় শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন।' মানুষকেন্দ্রিকতা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের মূল পাটাতন। সহমর্মিতাবোধ সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিকগুণ যা যোগাযোগ সহজ করে।

হুঁশিয়ারি: এ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু সংশ্লিষ্ট সকলকে বার্তা দিয়েছেন। তিনি আপসহীন নেতা এবং সাহসী প্রপঞ্চ। তিনি দেশের সাধারণ নাগরিক, শ্রমিক-কর্মচারী, মিলিটারি, শাসকগোষ্ঠী, দলীয় নেতা কর্মী প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তানী শাসকদের প্রতি আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন, 'আমরা ভাতে মারবো। আমরা পানিতে মারবো।... আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। ভালো হবেনা। সাত কোটি মানুষকে দাবায় রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।' এ হুঁশিয়ারি সাধারণ মানুষের মনে বিশেষ প্রণোদনা যুগিয়েছে।

যৌথ-দায়িত্ব: বঙ্গবন্ধু ভাষণে যৌথ দায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তিনি বলেছেন, 'একটা অনুরোধ আপনাদের কাছে, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, ছদ্মবেশে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি, যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে।' প্রত্যেকের দায়িত্ব ও বোধ সম্পর্কে সর্তক করছেন। কর্তব্যগুলো ভাগ করে দিয়েছেন। ভূমিকা নির্ধারণ করে দেওয়া যোগাযোগের কার্যকারিতার একটি বিশেষ দিক।

গ্রহণোমুক্ত দর্শক ও সংযুক্তি: ৭ মার্চের ভাষণের আরেকটি দিক হলো বক্তা, বক্তব্য ও উপস্থিত জনতা। দারুণ গ্রহণোমুক্ত জনতা পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে- একটি পবিত্র অনুভূতি নিয়ে উপস্থিত জনতা সভাস্থল ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় চার মিনিট দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি ইন্টারেকশনে করেন। প্রশ্নোত্তর চলেছে। সম্মতি আদায় করেছেন। সেই দিন রেসকোর্স ময়দান হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের গণপার্লামেন্ট। বক্তৃতার মঞ্চে জনতার সাথে বঙ্গবন্ধুর এই পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্যদিয়ে তিনি আরও আত্মবিশ্বাসী ও আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। হয়ে উঠেছেন বেঙ্গল পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনে স্বতন্ত্র স্মারক।

ভাষার ব্যবহার: ভাষার সহজ-সরল ব্যবহার ও প্রাণোজ্বলতা ছিল এ বক্তব্যের একটি বিশেষ দিক। সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী ভাষা ব্যবহার করেছেন তিনি। যে অংশে নির্দেশনা ছিল-তা ছিল খুব ছোট ছোট বাক্যে। প্রমিত শব্দের পাশাপাশি চলিত শব্দ বিশেষত আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। যেমন- 'দাবায়া রাখতে পারবা না' বা 'হুকুম দিবার নাও পারি'। শব্দকৌশলের এ স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ বক্তব্যকে গতিশীল করেছে।

৭ মার্চের ভাষণ বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ একটি অনুপঙ্খু পাঠ প্রবন্ধে শামসুজ্জামান খান উল্লেখ করেন, 'বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতা- শৈলীর অতুলনীয় ভঙ্গিতে কখনো আবেগ, কখনও যুক্তি, কখনো প্রশ্ন বা পুনরুক্তির মাধ্যমে সোচ্চার করে তুলেছেন; বিশেষ স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সংগত কারণে কৌশলময় ভাষা বা ইঙ্গিতে শ্রোতাদের মনে গেঁথে দিয়েছেন।'

ভাষার প্রায়োগিক গুণের কারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নৈকট্য তৈরি হয়েছে সহজেই। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় কোনো পুনরাবৃত্তি নেই, নেই কোনো বাহুল্য, নেই অতিকথন। কখনো কখনো তিনি বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন এবং তা করেছেন বক্তব্যের অর্থকে আরও গতিশীল ও তির্যক করার জন্য।

চূড়ান্ত ডাক: ভাষণের শেষাংশে তিনি চূড়ান্ত ডাক দিয়েছেন। পৃথিবীর যেকোনো বিখ্যাত পলিটিকাল রেটোরিকের পরিসমাপ্তিতে একটি ডাক থাকে, একটি আহ্বান থাকে। এ ছাড়া বক্তব্য সম্পন্ন হয় না। ৭ মার্চের বক্তব্যেও শেষাংশে এসেছে সেই সিংহনাদ বা স্বাধীনতার ডাক, 'মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায় সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো। পর্যায়ক্রমিকতা ও সংহতি এক বিশেষ সুষমা ৭ মার্চের ভাষণ, যা ধারাবাহিক ও সফল যোগাযোগের নতুন সূচক।

শ্রবণ নান্দনিকতা: ৭ মার্চের ভাষণের একটি বিশেষ দিক হলো এর শ্রবণ নান্দনিকতা। ভাষণটি শুনতে ভালো লাগে। এ ভাষণের গূঢ়ে রয়েছে এক প্রচ্ছন্ন সুর, যা খুবই হৃদয়গ্রাহী। স্বরের উঠানামা, প্রক্ষেপণ, শব্দচয়ন, নিবিষ্টতা ও পরিপ্রেক্ষিত মিলিয়ে ৭ মার্চের ভাষণ এক অপূর্ব সুরের মূর্ছনা। শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে এ ভাষণ দেয় স্বস্তিদায়ক এবং বিক্ষুব্ধ এক অনুভূতি। এ ভাষণ শ্রোতাকে গ্রেপ্তার করে তার গভীরে। শ্রবণ নান্দনিকতার এ ভাষণের আবেদন জিয়ে রেখেছে।

যুক্তিবাদীতা ও মর্যাদা আরোপণ: বঙ্গবন্ধু যুক্তিপূর্ণ উপায়ে তার বক্তৃতা উপস্থাপন করেছেন। আবেগ, যুক্তি, পরিসংখ্যানের মিশেলে এ বক্তব্য হয়ে উঠেছে মুক্তির মহামন্ত্র। উপস্থিত জনতাকে বঙ্গবন্ধু গভীর আস্থায় নিয়েছে-মর্যাদা আরোপণ করেছেন। ৭ মার্চের বক্তব্যের তৃতীয় বাক্যটি হলো, 'আপনার সবই জানেন ও বোঝেন।'

কর্তৃপক্ষীয় নেতৃত্ব: আবুল মনসুর আহমদ তার 'আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃপক্ষীয় নেতৃত্ব অর্জন করে। জনগণের ম্যান্ডেট পান। এ বিশাল জনসর্মথন কারণেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব হয়, 'আর সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। কাউকে যেন সেক্রেটারিয়েটে, হাইকোর্টে বা জজকোর্ট এ দেখা না হয়। দ্বিতীয় কথা, যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হল, কেউ দেবে না।'

শেষকথা: প্রাণ, প্রকৃতি আর মানবিক সম্পর্কের মিশেলে বঙ্গবন্ধুর হৃদয় হয়ে উঠেছে এক অখণ্ড সত্তা। তিনি সমগ্রকের প্রতিনিধি। ৭ মার্চের ভাষণ যোগাযোগকলার পর্যায়ক্রমিকতা, সংহতি ও শ্রবণ নান্দনিকতার দিক থেকে এক ক্লাসিক উদাহরণ।

Comments

The Daily Star  | English