বাংলাদেশ

শিক্ষার্থী-সাংবাদিক পেটানো ছাত্রলীগ নেতার অস্ত্রের লাইসেন্সের আবেদন

নিয়ম অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের বিষয়ে চিঠি যায় জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে। গত সেপ্টেম্বরে এই ছাত্রলীগ নেতার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদনের বিপরীতে অনাপত্তি দেয় পুলিশ সুপার কার্যালয়। বর্তমানে আবেদনটি জেলা প্রশাসক তথা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ। ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদের বিরুদ্ধে সরকারি তোলারাম কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও ছাত্রনেতার ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ আছে।

তোলারাম কলেজে দীর্ঘসময় ছাত্র-ছাত্রী সংসদের নির্বাচন না হলেও, নিজেকে কলেজের ভিপি পরিচয় দিতেন রিয়াদ। কথিত এই ভিপির কলেজের ভেতরে টর্চার সেল আছে বলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সভা-সমাবেশে অভিযোগ তোলা হয়েছে।

ইউপি নির্বাচন চলাকালে দলবল নিয়ে কেন্দ্র দখল করতে গিয়ে র‌্যাব সদস্যদের পিটুনির শিকার ছাত্রলীগের এই নেতা এবার অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জানুয়ারি মাসে নিজেকে ব্যবসায়ী দাবি করে একটি শটগানের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন হাবিবুর রহমান রিয়াদ। আবেদনে তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে 'জালাল এন্টারপ্রাইজ' উল্লেখ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

নিয়ম অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের বিষয়ে চিঠি যায় জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে। গত সেপ্টেম্বরে এই ছাত্রলীগ নেতার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদনের বিপরীতে অনাপত্তি দেয় পুলিশ সুপার কার্যালয়। বর্তমানে আবেদনটি জেলা প্রশাসক তথা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

এদিকে, সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতাকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হলে তিনি এর অপব্যবহার করবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তাকে লাইসেন্স না দিতে জেলা প্রশাসকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন সুশীল সমাজের নেতারা।

হাবিবুর রহমান রিয়াদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১৫ জুলাই রাতে সরকারি তোলারাম কলেজের সামনের সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ছাত্রদলের ৪ নেতাকর্মীকে পেটায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনার নেতৃত্ব দেন হাবিবুর রহমান রিয়াদ। ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে গেলে ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দিয়ে দুই সাংবাদিককে মারধর করেন তারা। তাদের মোবাইলফোনও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সরকারি তোলারাম কলেজে ফরম পূরণ করতে গিয়ে রিয়াদ ও তার লোকজনের মারধরের শিকার হন ওই কলেজের দুই শিক্ষার্থী আতা-ই-রাব্বি ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। তারা দুজন ওই কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন।

যোগাযোগ করা হলে জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ও সরকারি তোলারাম কলেজের প্রাক্তন ছাত্র আতা-ই-রাব্বি বলেন, 'আমি সেদিন তোলারাম কলেজে পরীক্ষার খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলাম। তখন কলেজের ভেতরেই হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তার অনুসারী লোকজন আমাকে ও আরেক ছাত্রকে ব্যাপক মারধর করে। এর আগেও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তিনি আমাকে হুমকি-ধমকি দিয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে থানায় গেলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয় বলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাইনি। আর তোলারাম কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদের রুমটিকে তো টর্চারসেল বানিয়ে রাখা হয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'রিয়াদ অস্ত্রের লাইসেন্স চান বলে শুনেছি। যে অস্ত্র ছাড়াই এই ধরনের কাজ করতে পারে, সে অস্ত্র পেলে ভালো কাজে তা ব্যবহার করবে তা আমরা বিশ্বাস করি না।'

২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে কলেজের সামনের সড়কে আরেক শিক্ষার্থী শাহজাহান আলীকে পেটায় রিয়াদের নেতৃত্বে তোলারাম কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ করার জেরে সাংবাদিকের ওপর দুই বার হামলার অভিযোগও আছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক সৌরভ হোসেন সিয়াম ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।

শুধু সাধারণ শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের পিটিয়েই মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক এই সভাপতি আলোচিত নন, ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।

২০২১ সালের ১১ নভেম্বর সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউপির একটি ভোটকেন্দ্র দখলে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন হাবিবুর রহমান রিয়াদ। ভোটকেন্দ্রের সামনে বিশৃঙ্খলা করতে থাকা রিয়াদ ও তার দলবলকে লাঠিপেটা করে র‍্যাব। পরে তাদের কাছ থেকে ককটেল, ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোটাও উদ্ধার করে র‌্যাব।

হাবিবুর রহমান রিয়াদ এলাকার প্রভাবশালীর ঘনিষ্ঠজন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হলেও, ছাত্রলীগের একটি অংশকে এখনো নেতৃত্ব দেন রিয়াদ।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শহরের চাষাঢ়ায় আল-আমিন ওরফে দানিয়েলকে (২৮) কুপিয়ে হত্যা করে মরদেহ মাসদাইরে তার বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরাও হাবিবুর রহমান রিয়াদের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত। 

প্রতিটি ঘটনায় স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রিয়াদের নাম এলেও, প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে রিয়াদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সাহস কেউ করে না বলে অভিযোগ আছে।

অস্ত্রের লাইসেন্স

রিয়াদের মতো বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারো অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়াকে ভালোভাবে দেখছেন না নারায়ণগঞ্জের স্থানীয়রা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সারাদেশে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের ছাত্র সংগঠন নানা ধরনের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সারাদেশেই এমন ঘটনার খবর পাচ্ছি। তাদের এই অপকর্মের জন্য তো লাইসেন্সের প্রয়োজন আছে। তাই তারা বেশি শক্তিতে বলিয়ান হতে অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে।'

'লাইসেন্স পেলে এই অস্ত্র তারা কী কাজে ব্যবহার করবেন, তাও দেশের মানুষ জানে। ফলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসনের লোকজনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কেউ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেয়ে গেলে সমাজে আর সুশাসন থাকবে না,' যোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যে কেউ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ক্রাইটেরিয়া থাকে। সেসব বিষয় ঠিক থাকলে আবেদনকারী অস্ত্রের লাইসেন্স পান, না হলে পান না। সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রেই একইরকম সিস্টেম।'

এ বিষয়ে হাবিবুর রহমান রিয়াদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

Comments

The Daily Star  | English

The bond behind the fried chicken stall in front of Charukala

For close to a quarter-century, a business built on mutual trust and respect between two people from different faiths has thrived in front of Dhaka University's Faculty of Fine Arts

8m ago