আইনি জটিলতায় আটকে যাচ্ছে বিএনপি

বিএনপির অবরোধ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর নতুন সংকটে পড়েছে বিএনপি।

বিএনপি মনোনীত দুই প্রার্থী ইতোমধ্যে কারাগারে। হাইকোর্ট বিভাগ আরও দুই নেতাকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। দুই দিনের রিমান্ডে রয়েছেন আরও এক প্রার্থী। এই অবস্থায় দলটির নীতি-নির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন, যাচাই-বাছাই পর্বে এসব নেতাদের মনোনয়ন বাতিল করে দিতে পারেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

এর আগে হাইকোর্ট বিভাগ এক আদেশে বলেন, কোনো ব্যক্তি দুই বছরের বেশি দণ্ড বা সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ওয়াদুদ ভূঁইয়া, আবদুল ওহাব ও মশিউর রহমান দুর্নীতির মামলায় আদালতের দেওয়া দণ্ড ও সাজা স্থগিত চেয়ে আবেদন করলে হাইকোর্ট বিভাগে এই আদেশ দেন।

দুটি আলাদা মামলায় গতকাল নরসিংদী-১ ও মাগুরা-১ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী খায়রুল কবির খোকন এবং মনোয়ার হোসেনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন বিচারিক আদালত। এছাড়াও, ঢাকা-৬ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইসরাক হোসেনকে দুর্নীতির দুই মামলায় নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ।

বিএনপি’র নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, সরকার বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনের বাইরে রাখতে চেষ্টা করছে। তারা যেন নির্বাচনী কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেই চেষ্টাও করা হচ্ছে।

রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর দায়ের হওয়া মামলায় বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য নিপুন রায় চৌধুরীকে গত ২২ নভেম্বর কারাগারে পাঠান আদালত। ঢাকা-৩ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা রয়েছে। তিনি কারাগারে থাকায় দলের কর্মীরা তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

এদিকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ঢাকা-৭ আসনে বিএনপি প্রার্থী মোশাররফ হোসেন খোকন মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হন। তবে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শুভাস কুমার পাল ডেইলি স্টারকে জানান, নাশকতার একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই মামলায় তিনি দুই দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

“আমাদের প্রত্যাশা ছিল তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায়নি,” - অভিযোগ করেন সাবেক সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।

ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল আলম নীরবের পক্ষে তার প্রতিনিধি মনোনয়নপত্র জমা দেন। ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাস এবং শরীয়তপুর-৩ আসনে মিয়া নুরুদ্দিনের পক্ষে তাদের প্রতিনিধিরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, আওয়ামী লীগ এবং প্রশাসন নানা ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে।

এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারিক আদালত যদি নৈতিক স্খলনের কারণে কোনো ব্যক্তিকে দুই বছর বা তার বেশি সাজা বা দণ্ড দেন তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল চলাকালেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সাজা বা দণ্ড স্থগিত বা বাতিল চেয়ে আবেদন সংবিধান পরিপন্থী। দণ্ড ও সাজা বাতিল হলে কিংবা কেউ কারা ভোগ করে বের হওয়ার পরও নির্বাচনে অংশ নিতে তাকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

যশোর-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবিরা সুলতানাকে দণ্ড ও সাজা দেন নিম্ন আদালত। আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই রায় স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট বিভাগ। সাবিরা সুলতানার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই আদেশের ফলে নির্বাচনে অংশ নিতে আইনি বাধা থাকছে না। সাবিরা সুলতানার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। তাকে সহযোগিতা করেন আমিনুল ইসলাম এবং এস কে গোলাম রসূল।

আজ (৩০ নভেম্বর) ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাসুদ হাসান চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “সাবিরা সুলতানাকে বিচারিক আদালতের দেওয়া দণ্ড ও সাজা স্থগিতের যে আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ আগামীকাল আমরা তার বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে যাব। সেখানকার আদেশের ওপর সব কিছু নির্ভর করছে। এর আগেও পাঁচজন দণ্ড ও সাজা বাতিল বা স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছিলেন, সেটি ‘নো অর্ডার’ হয়ে আছে।”

আইনজীবী আমিনুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, “গতকালের এই রায় একটি মাইল ফলক। অ্যাটর্নি জেনারেল আমাকে ফোন করেছিলেন, আমাকে জানানো হয়েছে তারা চেম্বার আদালতে যাচ্ছেন। আগামীকাল শনিবার, ছুটির দিন। ছুটির দিনে চেম্বার আদালত বসার নজির নেই এমন নয়, তবে বিষয়টি একটু অস্বাভাবিক। আবার রাষ্ট্রপক্ষের অনুরোধে চেম্বার আদালত বসছে, এখানে রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতাও অস্বাভাবিক। আগামী ২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের বিষয় রয়েছে, তার আগেই রাষ্ট্রপক্ষ তড়িঘড়ি করে কিছু একটা করতে চায়- তাদের তৎপরতা থেকে সেটাই প্রতীয়মান হয়।”

তিনি আরও বলেন, “এর আগে সরকারদলীয় অনেক সাংসদ সাজা ও দণ্ড পাওয়ার পর স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছেন। স্থগিতাদেশ নিয়ে তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। এখন যখন বিরোধীদল নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছে, ধানের শীষ প্রতীকে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে দলের চেয়ারপারসনসহ অধিকাংশ নেতাদের বঞ্চিত করার জন্য, তারা যেনো নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন সেই অপতৎপরতা দেখতে পাচ্ছি আমরা।”

সরকারের এই কার্যক্রমের নিন্দা জানিয়ে আমিনুল বলেন, “গতকাল আমরা একটি আইন সম্মত আদেশ পেয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, চেম্বার আদালত বা আপিল বিভাগের পূর্ণ বেঞ্চ যেখানেই শুনানি হোক- আমরা ন্যায় বিচার পাব।”

Comments

The Daily Star  | English
Mirza Fakhrul on polls

Efforts on to make polls questionable and delayed: Fakhrul

Says Chief Adviser Yunus has assured BNP that the election will be held in February 2026

3h ago