অতীত যাদের কাছে শুধুই অতীত নয়!

প্রায়ই মাঝরাতে বিছানা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসে নাহিয়ান। খুঁজতে থাকে তার বাবা টেকনাফ পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হককে। কিন্তু, সে চেষ্টা বৃথা জেনেই অজানা ভয় ও আতঙ্কে বাবার বিছানাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ১২ বছরের এই কিশোরী।
Akramul Haque
একরামুল হক। ছবি: সংগৃহীত

প্রায়ই মাঝরাতে বিছানা থেকে ধড়ফড় করে উঠে বসে নাহিয়ান। খুঁজতে থাকে তার বাবা টেকনাফ পৌরসভার ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হককে। কিন্তু, সে চেষ্টা বৃথা জেনেই অজানা ভয় ও আতঙ্কে বাবার বিছানাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ১২ বছরের এই কিশোরী।

ছোট বোনের কান্না টের পেয়ে, শুরু হয় বড় বোন তাহিয়াতের আর্তনাদ। 

গত বছরের ২৬ মে র‌্যাবের সঙ্গে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে একরাম মারা যাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে নয় মাস।  কিন্তু, এখন পর্যন্ত দুই বোন প্রতিদিন বাবার মোবাইল নম্বরে বারবার ফোন করে। তবে, সেটিকে কেবল বন্ধই পাওয়া যায়।

একরামের বিধবা স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, “ওই ঘটনার পর থেকে প্রতিমাসের ২৬ তারিখের পুরো দিনটি দুই বোনের কেবল কেঁদেই কাটে। জোর করেও তাদের মুখে খাবার দেওয়া যায় না। এছাড়াও, প্রতিদিন অন্তত একবারের জন্য হলেও ওরা বাবার নম্বরে ফোন করে, এই আশায়- যদি কেউ সাড়া দেয়। কিন্তু, তা আর কখনোই ঘটে না।”

টেকনাফ বিজিবি পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া তাহিয়াত ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিয়ান এখন পর্যন্ত বাবার ব্যবহৃত আধোয়া কাপড়-চোপড় মাকে ধুতে দেয়নি। কারণ- তাহলে নাকি বাবার শরীরের গন্ধ আর কখনও পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন: [অডিওসহ] একরামুলকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে’​

আয়েশা বেগম নিজের কান্না কোনোরকমে সংবরণ করে তার টেকনাফের বাসায় বসে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “মাঝে-মধ্যে অবুঝ মেয়েরা তাদের বাবার পোশাক পরে শুতে যায়। বাবাকে নিয়ে প্রতিদিনই তারা ডায়েরিতে কিছু না কিছু আঁকে অথবা লিখে রাখে।”

ডায়েরির কোন কোন পাতায় নাহিয়ান উগড়ে দেয় ক্ষোভ। লিখে- “বাংলাদেশে কোনো বিচার নেই...এই দেশকে আমি ঘৃণা করি...জীবন পুরোটাই যন্ত্রণার...”

বেঁচে থাকতে বাবা তার দুই কন্যাকে নিয়ে প্রায়ই বাইরে ঘুরতে যেতেন, নানারকম খাবার কিনে খাওয়াতেন। কিন্তু, হঠাৎ করে ফুরিয়ে গেল সোনালি সেসব দিন। একরামের মৃত্যুর পর থেকে পরিবারটি এখন আত্মীয়-স্বজনদের সহায়তার ওপর ভর করে চলছে।

শোকে মুহ্যমান থাকায় নাহিয়ান এই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চায়নি। তার মা ও কাকা নজরুল ইসলামের কাছ থেকে জানা গেলো, ওই ঘটনার পর থেকেই ওর কথা বলা কমে গেছে।

যদিও পরিবারটি এখনও এই ভয়ংকর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তার ওপর প্রায়শই কারা নাকি তাদেরকে কারো কাছে (বিশেষ করে গণমাধ্যমের সঙ্গে) মুখ খুলতে, অথবা কোনো কথা না বলার জন্যে সতর্ক করে দিয়ে যায়।

একরামের বড় ভাই নজরুল ইসলাম বলেন, “এ ঘটনায় আমরা একটি মামলা পর্যন্ত করতে পারিনি। কোনো আইনজীবীই আমাদের পক্ষে লড়তে রাজি নয়।”

“তারপরেও আমরা যদি কোনো আইনজীবীকে রাজি করাতে পারি, চেম্বার থেকে বের হয়ে আসার পরেই তিনি আমাদের মামলাটি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দেন। আমরা এখনও ন্যায় বিচার পাইনি। তার ওপর আগে যেসব স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাও এখন আমাদের মুখ বন্ধ রাখতে বলছেন”, যোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন: একরামুলের স্ত্রী-কন্যার দিকে তাকিয়ে, নিজের স্ত্রী-কন্যাকে দেখুন

এদিকে, টেকনাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বাশার বলেন, “স্থানীয় রাজনীতিকদের কেউ একরামের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে এমন তথ্য আমাদের জানা নেই এবং আমরা মনে করি ব্যাপারটি সত্য নয়।”

“কেন্দ্রীয় নেতারা এই বিষয়টি দেখাশুনা করছেন বিধায় আমরা একরামের মামলাটি নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি না”, যোগ করেন তিনি।

সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান চলার মধ্যেই গত বছরের ২৬ মে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)-এর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একরাম নিহত হন। তার মৃত্যুর পর র‌্যাব দাবি করে, তিনি ছিলেন একজন শীর্ষস্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী।

কিন্তু, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় লোকজন (যারা দীর্ঘদিন ধরে একরামকে চিনতেন) র‌্যাবের দাবিকে নাকচ করেছেন। তারা বলেন, “দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে টেকনাফ যুবলীগের সভাপতি পদে থাকা একরাম ওই অঞ্চলে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সোচ্চার ছিলেন।”

তাছাড়া, আব্দুস সাত্তারের ছেলে একরাম টেকনাফ পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও ছিলেন। 

তার স্ত্রী বলেন, “আমি এখনও জানি না যে, আমার স্বামীকে কেনো হত্যা করা হলো।”

তিনি বলেন, “প্রাথমিকভাবে, দুই জন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছিলেন যে, তারা আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন এবং সেজন্য আমাদের পরিবারের যেসব সদস্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাবে তাদের নাম পর্যন্ত লিখে নিয়ে যান। কিন্তু, নয় মাস পেরিয়ে গেলেও এই প্রতিশ্রুতির আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। 

“উপরন্তু, কিছু লোক আমাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা কথোপকথনের ক্লিপগুলো (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেগুলো ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে) সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। এগুলো পেতে প্রথমে তারা আমাদের হুমকি দেন, তারপর টাকা দিতে চান”, অভিযোগ করেন তিনি।

২০১৮ সালের ৩১ মে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আয়েশা বেগম অভিযোগ করেন যে, তার স্বামীকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। তার অভিযোগের ভিত্তিস্বরুপ তিনি সাংবাদিকদের হাতে পৃথক চারটি অডিও ক্লিপ সরবরাহ করেন।

একটি ক্লিপে শোনা যায়, “হ্যালো! আমি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি।… আমি উনার মিসেস বলতেছি… হ্যালো! হ্যালো!...”- উৎকণ্ঠায় উচ্চস্বরে এমনিভাবে কথা বলছেন মোবাইল ফোনের একপ্রান্ত থেকে। অপর প্রান্তের কথার স্বর অনুচ্চ। এর খানিক পর গুলির শব্দ… উহ্… গোঙানি… । এরপর আরেকটি গুলির শব্দ। এপাশে চিৎকার- “ও আল্লা…!”

আয়েশা দাবি করেন, তিনি গত ২৬ মে রাতে তার স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। মোবাইল ফোনে নারীর কণ্ঠটি তার এবং তার স্বামীকে হত্যার সময়ই ওই বন্দুকের গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। 

গতকাল এই সংবাদপত্রের সঙ্গে আলাপের সময় আয়েশা বলেন, “একরামের সঙ্গে তিনটি মোবাইল ফোন ছিল। কিন্তু, পুলিশ জব্দকৃত জিনিসপত্রের তালিকায় একটি ফোন দেখিয়েছে। তার অপর দুইটি ফোন কোথায় গেলো তা আমরা এখনও জানি না।”

তিনি বলেন, “যারা একরামকে হত্যা করেছে, তারাই আবার তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে।”

“এখন পর্যন্ত আমরা আতঙ্কে দিনযাপন করছি...কিন্তু, জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত আমরা একরাম হত্যার আসল কারণটি জানার চেষ্টা করে যাবো”, যোগ করেন তিনি।

তথাকথিত ওই বন্দুকযুদ্ধের পর একরামের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় একটি মামলা দায়ের করে র‌্যাব। 

মামলার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, “আমরা এখনও তদন্ত সম্পন্ন করে উঠতে পারিনি।”

একরামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রায়ই তাদের দেখতে যান জানিয়ে তিনি বলেন, “এই মামলার বিষয়ে একরামের পরিবারের যদি কিছু বলার থাকে, তাহলে তদন্ত শেষ হওয়ার পর অবশ্যই তারা তা বলার সুযোগ পাবেন।”

অপরদিকে, একরামের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এই মামলার বিষয়ে তাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। 

 

Comments

The Daily Star  | English

288 Myanmar security personnel sent back from Bangladesh

Bangladesh this morning repatriated 288 members of Myanmar's security forces, who had crossed the border to flee the conflict between Myanmar's military junta and the Arakan Army

31m ago