গনি মিয়াদের বাজেট: লাভের গুড় খায় পিঁপড়ায়

গনি মিয়ার কথা তো আমরা সবাই জানি। হ্যাঁ, সেই যে গনি মিয়া একজন দরিদ্র কৃষক। তার নিজের কোনো জমি নেই, সরকারের দেওয়া কৃষক কার্ডও তার নেই। সে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে। এবার বোরো চাষে তার তেমন কোনো লাভ হয়নি, বরং দেনা এখনো রয়ে গেছে। সেই গনি মিয়ার মতো কৃষকদের জন্য বাজেটে কী রয়েছে?
স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

গনি মিয়ার কথা তো আমরা সবাই জানি। হ্যাঁ, সেই যে গনি মিয়া একজন দরিদ্র কৃষক। তার নিজের কোনো জমি নেই, সরকারের দেওয়া কৃষক কার্ডও তার নেই। সে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে। এবার বোরো চাষে তার তেমন কোনো লাভ হয়নি, বরং দেনা এখনো রয়ে গেছে। সেই গনি মিয়ার মতো কৃষকদের জন্য বাজেটে কী রয়েছে?

সারাদেশে কৃষকদের ক্ষোভ দেখে সরকার তড়িৎ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ধানের দাম বাড়াতে এর মধ্যেই যেসব উদ্যোগের কথা ঘোষণা করা হয়েছিলো, সেগুলোই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা হয়েছে বাজেটে। তাদের জন্য আসলে বাজেটে নতুন কিছু নেই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ বছর ধান কাটার সময় শ্রমিকের মজুরির হার নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়। এক একজন দিনমজুরের মজুরি এক মন/দেড় মন ধান। কৃষক অসহায়। অনেকে সময় মতো ক্ষেত থেকে ধান সংগ্রহ করতে পারেননি।

এ সমস্যার সমাধানে সরকার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, ফসল কাটা আর মাড়াইয়ের যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাজেটে। এ ভর্তুকির ঘোষণা অবশ্য কয়েকদিন আগেই দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু, জরুরি আলাপ হচ্ছে, এর ফলে কি ভবিষ্যতে কৃষকের ঘরে ঘরে ধান কাটা আর মাড়াইয়ের যন্ত্র পৌঁছবে? যে গরিব চাষী সিলভার কার্প মাছ খেয়ে এবার ঈদ পালন করলেন, তিনি কী এই মাড়াই যন্ত্র দাম দিয়ে কেনার সামর্থ্য রাখেন?

নাকি কৃষিযন্ত্রে এই ভর্তুকির সুফল ধনী কৃষক আর যন্ত্রের ব্যবসায়ীরা পাবেন।

যদি সরকারের কার্ডধারী কৃষকদেরকে সরাসরি এই প্রণোদনা দেওয়া হয় তাতেও কী কৃষকের হাহাকার বন্ধ হবে? গরিব বর্গাচাষীর নাম তো কৃষক তালিকায় নেই।

সরকারের নেওয়া অন্য একটি উদ্যোগ হচ্ছে, চাল রপ্তানির উপর ২০ ভাগ প্রণোদনা দেওয়া। আর চাল আমদানির উপর ২৫ ভাগ শুল্ক বহাল রাখা। এই প্রণোদনার টাকা-পয়সা যদি ঠিকভাবে ব্যয় হয় তাতে প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন মিল মালিকেরা, যারা গত আমন মৌসুমে ধান মজুত করে রেখেছেন বেশি দামে বিক্রি করার জন্য। মিল মালিক আর মজুতদাররা সরকারের প্রণোদনা নিয়ে  তাদের মজুদ করা চাল রপ্তানি করে আবার কৃষকের ধান কেনা শুরু করলে অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ বাজারে ধানের চাহিদা বাড়লে দামও বাড়বে। আর কৃষকেরা তখন হয়তো এই সুবিধা পাবেন।

কিন্তু, ততোদিনে হয়তো কৃষকের ধান চলে যাবে মজুতদারের গোলায়। কারণ বেশিরভাগ গরিব কৃষকের তো ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ইতিমধ্যে সার, বীজ, বিষের দাম শোধ করতে বা এনজিওর ধারের কিস্তি শোধ করতে কম দামেই সে তার ধান বেচে দিয়েছে। তখন আমন চাষের সময়ও হয়তো এসে যাবে। আবার ধার, আবারও অনিশ্চয়তা।

তবে সত্যি সুখবর হচ্ছে, বাজেটে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে শস্যবীমা চালু করার ঘোষণা এসেছে। প্রতি বছর বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড়, কাল-বৈশাখীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়ে।

কিন্তু, এই ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। কতো কৃষক এর আওতায় আসবেন সেটা বোঝা গেলো না। তাই কৃষক সমাজের জন্য এখনই এটি কোনো সুখবর বয়ে আনছে না- তা বলা যায়।

ডিজেলে আর যন্ত্রের বিদ্যুৎ বিলের ওপর শতকরা ২০ ভাগ ভর্তুকি আগের মতোই চালু থাকছে।

এগুলো ছাড়া কৃষকদের জন্য বাজেটে কি নতুন কিছু রয়েছে? তারপরও অর্থমন্ত্রী কৃষকদের একটি সুখবর দিয়েছেন। সেটা হচ্ছে যদিও সরকারের উৎপাদন খরচ বেড়েছে, এবার নতুন করে রাসায়নিক সারের দাম আর বাড়ছে না। সার, বীজ বাবদ সরকার আগের মতোই ভর্তুকি বহাল রাখছে।

সার বাবদ সরকার ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ৫,২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। সার-বীজ বাবদ যেসব ভর্তুকি ছিলো সেগুলো সরকার আগের মতো চালিয়ে যাবে।

কিন্তু, আমার আশংকা এই কারণে গরিব কৃষক কি সত্যিই লাভবান হয়? এই ভর্তুকি তো গত বছর চালু ছিলো। তারপরও প্রান্তিক কৃষকরা বিপদে পড়েছে, ধানের বাজার দরের চেয়ে ধান উৎপাদন খরচ বেশি ছিলো। তার মানে সারে ভর্তুকি খুব কার্যকরী কোনো বিষয় না।

বেশ কিছু বর্গা চাষির সাথে কথা বলে দেখা গেছে, সরকারের দেওয়া ভর্তুকি তাদের কাছে খুব একটা পৌঁছায় না, কারণ সরকারের কৃষক তালিকায় মূলত ভূমি মালিকদের কৃষক হিসেবে দেখানো হয়েছে। গত ২৫ বছর কৃষি কাজের সাথে যুক্ত নন এমন ভূমি মালিকদেরও কৃষক তালিকায় রাখা হয়েছে। এই তালিকায় ব্যবসায়ী, মুদি দোকানদার, ফড়িয়া, ঠিকাদার, সিটি কর্পোরেশনের কমিশনারের নামও আছে। এই রকম তালিকাভুক্ত কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৮০ লাখ।

সরকারকে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হলে এই তালিকা সংশোধন করে, ফসল ক্রয়ের নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে।

যেহেতু সরকারের তালিকাভুক্ত কৃষকদের থেকেই খাদ্য বিভাগ ধান সংগ্রহ করে থাকে। তাই সরকার ঘোষিত আরো আড়াই লাখ টন ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গরিব কৃষকদের কোনো সুফল দিবে কী না সন্দেহ। অর্থাৎ, লাভের গুড় হয়তো পিঁপড়ায় খেয়ে যাবে।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, দেশের শ্রম শক্তির ৪২ ভাগ কৃষির সাথে জড়িত। আর কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাজেটের ২১ ভাগ।

যদিও তিনি বলেছেন বাজেট প্রণয়নের সময় কৃষক, কামার, কুমোর, জেলে, ব্যবসায়ী, বেদে, বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, তৃতীয় লিঙ্গ, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী তথা সর্বস্তরের শ্রম-পেশার মানুষের কথা না কী মাথায় রাখা হয়েছে।

গত ১০ বছর ধরে দেশে কৃষি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৭। কৃষিতে টানা এই অর্জন মূলত  কৃষকের করণে সম্ভব হয়েছে। তাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির জন্যই দেশ আজ ধান আর মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে অষ্টম, আম উৎপাদনে সপ্তম, সবজিতে তৃতীয়। যদিও কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমছে!

কৃষকদের এসব অবদান অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন। এভাবে বললে বিষয়টি একটু মহান বলে মনে হয়। কিন্তু, আদতে ঐসব প্রান্তিক পেশাজীবীরা সরকার ঘোষিত সুফলের কতোটুকু ভোগ করেন। এসব বরাদ্দ কি তাদের মনে কোনো স্বস্তি বয়ে আনে? বাজেট প্রণয়নে সেটিও মাথায় রাখতে হবে।

তা না হলে গনি মিয়া চিরদিন একজন অসহায় গরিব কৃষকই থেকে যাবেন।

পিনাকী রায়, প্রধান প্রতিবেদক, দ্য ডেইলি স্টার

[email protected]

Comments

The Daily Star  | English

Nuke war risks ‘real’: Putin

The Russian president warns of 'destruction of civilisation' if the West escalates the conflict in Ukraine

25m ago