কৃষিতে ‘নিম কোটেড ইউরিয়া সার’ ব্যবহারের সম্ভাবনা

এখন থেকে প্রায় ৭০ বছর পূর্বে অ্যামোনিয়াম সালফেট প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের সূচনা হয়। তবে সবুজ বিপ্লবের সূচনা লগ্ন থেকে ইউরিয়াসহ অন্যান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার বাড়তে শুরু করে।
রয়টার্স ফাইল ছবি

এখন থেকে প্রায় ৭০ বছর পূর্বে অ্যামোনিয়াম সালফেট প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের সূচনা হয়। তবে সবুজ বিপ্লবের সূচনা লগ্ন থেকে ইউরিয়াসহ অন্যান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার বাড়তে শুরু করে।

রাসায়নিক সার ফসল উৎপাদনের চালিকা শক্তি হিসাবে আজ বিবেচিত। অবশ্য পরিমাণের দিক দিয়ে ইউরিয়া সারের ব্যবহার সব চাইতে বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে ইউরিয়া সার ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন। তার মধ্যে ১০ লক্ষ মেট্রিক টন দেশে উৎপাদন হয় এবং বাকী ১৫ লক্ষ টন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আবার মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৭৫-৮০ ভাগ একমাত্র ধান চাষে ব্যবহার হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের আপামর জনগণের কাছে রাসায়নিক সার সুপরিচিত। আর কৃষক সমাজের কাছে সার বিশেষ করে ইউরিয়া সারের প্রাপ্যতা অতি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের উত্তরাঞ্চলে সারের দাবিতে ১৯৯৫ সালে কৃষকের মৃত্যুর ঘটনাটি আজও সচেতন দেশবাসীর মন থেকে মুছে যায়নি। ইউরিয়া সার ফসলের জমিতে ক্ষণস্থায়ী এবং গাছের খাদ্য হিসাবে তুলনামূলক কম পরিমাণে ক্রিয়াশীল/কার্যকর বিধায় বাংলাদেশ সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কৃষি বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ফসলের মাঠ থেকে ইউরিয়া সারের অপচয় হয় যা ভূগর্ভস্থ পানি ও ভূউপরিস্থ বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে। কীভাবে এই ইউরিয়া সারের অপচয় রোধ করে গাছের খাদ্য হিসাবে তার দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায় তা নিয়ে দেশে বিদেশে বিভিন্ন ধরণের গবেষণা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া গেলেও তা কৃষক বান্ধব নয় বিধায় জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। এহেন অবস্থার প্রেক্ষিতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে নিম কোটেড ইউরিয়া অর্থাৎ নিমবীজ হতে সংগৃহীত তেলের পাতলা আবরণযুক্ত ইউরিয়া সার।

গাছের প্রাণ আছে বিধায় তার খাদ্যের দরকার। বৈজ্ঞানিক ভাবে এ কথা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত যে গাছের জন্য যে সকল মৌলিক খাদ্য উপাদান অত্যাবশ্যক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে তার মধ্যে নাইট্রোজেন অন্যতম। গাছের বাড়তি ও ফলন বৃদ্ধির জন্য এই নাইট্রোজেন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। গাছ সাধারণত মাটি থেকেই নাইট্রোজেন সহ সব মৌলিক খাদ্য উপাদান পেয়ে থাকে। কিন্তু অধিক ফলনসহ ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির কারণে মাটি ফসলের চাহিদা মোতাবেক পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন সরবরাহ করতে পারে না বিধায় নাইট্রোজেন বাহক ইউরিয়া সারের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফসলি জমিতে এই ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর পরই মাটির জলকণার সংস্পর্শে এটা দ্রুত গলে যায় এবং অনধিক তিন দিনের মধ্যে অণুজৈব প্রক্রিয়ায় গাছের খাদ্য উপযোগী উপাদানে রূপান্তরিত হয়, যার কিছু অংশ গাছ গ্রহণ করে, কিছু অংশ মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায় এবং কিছু অংশ ভূউপরিস্থ বায়ু মণ্ডলে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। মাটির  প্রকৃতি ও পানির প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে এই প্রক্রিয়ায় ইউরিয়া সারের অপচয় প্রায় ৭০-৭৫ ভাগ হতে পারে।

পক্ষান্তরে নিম তেলে ট্রাইটারপেনস নামক রাসায়নিক পদার্থ থাকায় মাটিতে নিম কোটেড ইউরিয়া থেকে নাইট্রোজেনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া ধীর গতিতে চলে। এতে নাইট্রোজেনের অপচয় কম হয় এবং গাছ বেশি দিন ধরে শিকড়ের মাধ্যমে এই অত্যাবশ্যকীয় মৌলিক খাদ্য উপাদান গ্রহণ করতে পারে। ফলে সাধারণ ইউরিয়া সারের তুলনায় নিম কোটেড ইউরিয়া ১৫-২০ ভাগ কম ব্যবহার করেও সমপরিমাণ ফসল পাওয়া যায়। এমনকি ৫-১০ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পায় বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন। বাংলাদেশে ধান বা অন্য কোন ফসলে এমন গুরুত্বপূর্ণ নিম কোটেড ইউরিয়ার কার্যকারিতার উপর বিক্ষিপ্তভাবে গবেষণা হলেও আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তবে প্রতিবেশী বৃহৎ দেশ ভারতে নিম কোটেড ইউরিয়ার ওপর বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ফসলে বিশেষ করে ধান ও গমের ওপর প্রচুর গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ পরিচালিত হয়েছে। সাধারণ ইউরিয়ার তুলনায় নিমকোটেড ইউরিয়া অধিকতর দক্ষ এবং বাড়তি ফলনে সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়। তা ছাড়া নাইট্রোজেনের অপচয় কম হওয়ায় পরিবেশ বান্ধব এবং পরোক্ষ ভাবে ফসলে পোকা-মাকড় দমনেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এত সব বহুবিধ উপকারের কারণে ভারতের কৃষিতে আস্তে আস্তে নিম কোটেড ইউরিয়া সারের ব্যবহার বাড়তে থাকে। উল্লেখ্য যে ২০১৫ সালে ভারতের চাষি পর্যায়ে প্রায় ৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমান ভারত সরকার সব ইউরিয়া সার কারখানা মালিকদের প্রতি সাধারণ ইউরিয়া সারের পরিবর্তে নিম কোটেড ইউরিয়া সার উৎপাদনের নির্দেশনা জারি করেছে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি বিএডিসি এর রাজশাহী অঞ্চলের টেবুনিয়া বীজ উৎপাদন খামার, পাবনা ধানের ওপর সাধারণ ইউরিয়ার তুলনায় নিম কোটেড ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা মূল্যায়নের গবেষণায় দেখা যায় শতকরা ১৫ ভাগ কম নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহার করেও সাধারণ ইউরিয়া সারের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গবেষণার ফল অধিকতর যাচাই এবং বৈধতার দাবি রাখে। বাংলাদেশের কৃষিতে এমন বহুবিধ গুণ সম্পন্ন নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহার করার কথা আজ অনেকে ভাবছেন।

গত ৩ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে দেশে নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহারের সম্ভাবনার ওপর কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মিলনায়তনে একটি পরামর্শমূলক মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে নার্সভূক্ত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীগণ ছাড়াও বেসরকারি সংস্থা/কোম্পানির প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এপিএ প্যানেলের তিনজন সদস্য ড. এম. এ. সাত্তার মন্ডল, এমিরিটাস প্রফেসর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; ড. এস. এম. নাজমুল ইসলাম, প্রাক্তন সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জনাব এম. এনামুল হক, প্রাক্তন মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপস্থিত থেকে আলোচনায় নিম কোটেড ইউরিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। ওই সভা নিম কোটেড ইউরিয়া সারের উপর কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করে। সভার এই সুপারিশটি যৌক্তিক বলে বিবেচনা করা যায় কারণ দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে প্রধান প্রধান ফসলে নিম কোটেড ইউরিয়া সারের কার্যকারিতার ওপর কিছু তথ্য উপাত্ত ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে শুধু ভারতের অনুসরণে নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহারে কোন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মনে হয় না। দেশের নীতি নির্ধারক ও সচেতন মহলের কাছে যে সব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আসতে পারে তা হলো এই সার ব্যবহারে আর্থিক সাশ্রয় কেমন হবে, খরচ কত বাড়তে পারে, কীভাবে প্রস্তুত হবে, নিম তেলের উৎস কোথায় ইত্যাদি।

উপর্যুক্ত প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক উত্তরে বলা যায় যে নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহারে যদি ১৫ শতাংশ দক্ষতা (ইউরিয়া সারের সক্ষমতা) বৃদ্ধি পায় তা হলে বছরে দেশের কৃষিতে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি ইউরিয়া সারের ব্যবহার কম হবে যার বাজার মূল্য সহজেই হিসাব করা যায়। তাছাড়া বাড়তি ৫ শতাংশ ধানের ফলন বৃদ্ধি হলে তার সঙ্গে যোগ হবে আরও শত শত কোটি টাকা। তবে ভারতের গবেষণা তথ্য মতে প্রতি টন ইউরিয়ার জন্য নিম তেলের দরকার হয় আধা লিটার। সে হিসাবে ২৫ লক্ষ টন ইউরিয়া সারকে নিম কোটেড ইউরিয়ায় রূপান্তরিত করতে নিম তেলের প্রয়োজন হবে প্রায় ১২৫০ মেট্রিক টন। দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বিশেষ করে বরেন্দ্র এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণ নিম গাছ আছে। বর্তমানে কিছু নিম তেল স্থানীয় ভাবেও তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনে সে সব এলাকায় আরও নিমের চারা রোপণ করা যাবে।

এ সব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য মাঠ পর্যায়ে একটি জরিপ করার দরকার হতে পারে। নিম কোটেড ইউরিয়া উৎপাদনে কেমন খরচ বাড়বে সে প্রশ্নের উত্তরে প্রাথমিক হিসাব মতে কেজি প্রতি এক টাকা বাড়তে পারে। কারখানায় বেশি পরিমাণ নিম কোটেড ইউরিয়া সার প্রস্তুত করার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে দেশের প্রচলিত ইউরিয়া সার কারখানাগুলির সামান্য পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করার জন্য কিছু বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। আপাত দৃষ্টিতে নিম কোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে কৃষক সমাজ লাভবান হবে, পরিবেশের উন্নয়ন হবে, অকৃষি খাতে ইউরিয়া সার ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করবে, ইউরিয়া সারের আমদানির পরিমাণ কমবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশ লাভবান হবে। তবে উল্লিখিত মত বিনিময় সভার সুপারিশের আলোকে গবেষণা, সম্প্রসারণ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নিম কোটেড ইউরিয়া বাংলাদেশের কৃষিতে ব্যবহার হবে কিনা তার উত্তর পাওয়া যাবে।

 

ড. ওয়ায়েস কবীর: নির্বাহী পরিচালক

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ)

[email protected]

 

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

Personal data up for sale online!

A section of government officials are selling citizens’ NID card and phone call details through hundreds of Facebook, Telegram, and WhatsApp groups, the National Telecommunication Monitoring Center has found.

1h ago