আন্তর্জাতিক

জাপানের শিল্পশক্তির প্রতীক বুলেট ট্রেন

রেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এক বিস্ময়কর পর্বের সূচনা করলো নীল-সাদা রঙের একটি ট্রেন। দিনটি ছিলো ১৯৬৪ সালে ১ অক্টোবর। জাপানের বুলেট ট্রেন যুগে পদার্পণের দিন। টোকিও থেকে ওসাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেলো ট্রেনটি। বুলেটের গতিতে ছুটে চলা ‘বুলেট ট্রেন’ জাপানে পরিচিত ‘শিনকানসেন’ নামে।
Shinkansen bullet trains
জাপানের ফুজি আগ্নেয়গিরির পাশ দিয়ে যাচ্ছে ‘শিনকানসেন বুলেট ট্রেন’। ছবি: সংগৃহীত

রেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এক বিস্ময়কর পর্বের সূচনা করলো নীল-সাদা রঙের একটি ট্রেন। দিনটি ছিলো ১৯৬৪ সালে ১ অক্টোবর। জাপানের বুলেট ট্রেন যুগে পদার্পণের দিন। টোকিও থেকে ওসাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেলো ট্রেনটি। বুলেটের গতিতে ছুটে চলা ‘বুলেট ট্রেন’ জাপানে পরিচিত ‘শিনকানসেন’ নামে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের বিধ্বস্ত জাপান মন দেয় নিজেদের উন্নয়নে। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রধান শহরগুলোর মধ্যে ভালো যোগাযোগ খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে মাত্র ১৯ বছরের মধ্যে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ১৯৬৪ সালে অলিম্পিক আয়োজনের মর্যাদা পায় টোকিও। টোকিওতে অনুষ্ঠিত সেই অলিম্পিকের পর্দা ওঠার মাত্র কয়েকদিন আগে বুলেট ট্রেন সারা পৃথিবীর কাছে জাপানকে তুলে ধরে এক অন্য মর্যাদায়।

প্রযুক্তির এই বিস্ময় জাপানকে নিয়ে যায় প্রযুক্তিতে শীর্ষে থাকা দেশগুলোর তালিকায়।

প্রথমদিন থেকে শুরু করে গত ৫৫ বছরে ‘শিনকানসেনকে’ উন্নত থেকে উন্নততর প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করেছে জাপান। গতি, সেবা, সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও ‘শিনকানসেন‘কে পরিপূরক শব্দে পরিণত করেছে জাপান। অত্যন্ত আরামদায়ক ভ্রমণে লম্বা যাত্রা, অল্প সময়ে পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে এর জুড়ি মেলা ভার। শুধু নিজের দেশে নয়, জাপানের হিতাচি এবং তোশিবার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী কয়েক বিলিয়ন ডলারের ট্রেন এবং সরঞ্জাম রফতানি করছে।

জাপান রেল প্রযুক্তিতে বিশ্বের শীর্ষস্থান দখল করে আছে। প্রতিনিয়ত নিজেদের সক্ষমতাকে আরও বেশি বাড়িয়ে তোলার কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে।

নিরাপত্তা ঠিক রেখে এই ট্রেনের গতি আরও কতোটা বাড়ানো যায় প্রতিনিয়ত চলছে সেই গবেষণা। সর্বশেষ যে ‘শিনকানসেন’টি নিয়ে জাপান কাজ করছে তার গতি বেগ হবে ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার। যে গতি দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট।

বর্তমানে জাপানের রাজধানী থেকে প্রায় ৩২২ কিলোমিটার গতিতে ‘শিনকানসেন’ ছুটে চলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ১৯৬৪ সালে টোকিও থেকে শিন-ওসাকা পর্যন্ত ৫০২ কিলোমিটার রেলপথ তৈরি হওয়ার পর থেকে এর নেটওয়ার্ক ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

জাপানের চারটি প্রধান দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার। এই দূরত্বের কারণে প্রধান শহরগুলির মধ্যে যাতায়াতে অনেক সময় ব্যয় করতে হতো। ধীর গতির বাহনগুলোর কারণে এতো লম্বা সময়ের ভ্রমণ ছিলো বিরক্তিকর।

টোকিও থেকে হিরোশিমা প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের দূরত্বে শিনকানসেন পৌঁছে দেয় সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে। ট্রেন পৌঁছতে যদি দু-এক মিনিট দেরি হয় তাহলে যাত্রীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে কর্তৃপক্ষ।

জমিয়ে দেওয়ার মত ঠাণ্ডা যেমন রয়েছে জাপানে তেমনি রয়েছে প্রচণ্ড গরম। প্রকৃতির এমন অবস্থানের কারণে সেখানকার প্রকৌশলীদের নানা ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। সব সমস্যা মোকাবেলা করে সফলভাবে সারাদেশে শিনকানসেন ছড়িয়ে দেওয়ায় তারা হয়ে উঠেছেন অনেক বেশি দক্ষ।

শুধু যে এই সমস্যাই তাদের সামনে পরেছে তা নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ জাপানের নিত্যদিনের সঙ্গী। ভূমিকম্প ও সুনামির মতো দুর্যোগগুলো প্রায়শই তাদের লণ্ডভণ্ড করে দেয়।

জাপানের ‘শিনকানসেন বুলেট ট্রেন’। ছবি: সংগৃহীত

সিএনএন’র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতো সব প্রতিকূলতা থাকার পরও গত ৫৫ বছরে শিনকানসেন নেটওয়ার্কে একজন যাত্রীও নিহত বা আহত হননি। শিনকানসেনে যাত্রীদের নিরাপত্তায় কতোটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।

জাপানের ট্রেনগুলো কয়েক কোটি যাত্রীকে গতি এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ভ্রমণ সেবা দিয়েছে। আর এর সবই হয়েছে যথাযথ সময় মেনে। বিশেষ কোনো কারণ না থাকলে জাপানের কোনো ট্রেন কখনোই দেরি করে না। প্রতিটি স্টেশনে সঠিক সময়েই পৌঁছে এবং ছেড়ে যায়।

পৃথিবীর অনেক দেশই এখন জাপানের এই পরিবহন ব্যবস্থা অনুসরণ করছে। গত চার দশকে বেশ কয়েকটি দেশ এই উচ্চগতির ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করেছে।

জাপানের মতো ফ্রান্সও এই প্রযুক্তি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছে। দেশগুলো মধ্যে স্পেন, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য এবং সর্বশেষ মরক্কো উল্লেখযোগ্য।

ফ্রান্সের টিজিভি নেটওয়ার্ক এ কাজে দারুণ সাফল্য পেয়েছে। সেদেশের বড় শহরগুলির মধ্যকার দীর্ঘ দূরত্বে যাত্রার সময়কে কমিয়ে দিয়েছে।

ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, তাইওয়ান, তুরস্ক এবং সৌদি আরব এখন তাদের প্রধান শহরগুলোতে যোগাযোগ সহজ করতে এবং সময় বাঁচাতে এই প্রযুক্তির ট্রেন ব্যবহার করছে।

দ্রুত গতি সম্পন্ন ইউরোস্টার ট্রেনগুলো ইউরোপের সবল বড় শহরকে কাছে নিয়ে এসেছে। হিতাচি-নির্মিত ‘ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ট্রেন’ ব্রিটিশ যাত্রীদের বুলেট ট্রেনের কাছাকাছি গতি দেয়। এগুলোর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার।

সম্প্রতি, ভারত এবং থাইল্যান্ড এই রেল নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ করছে। ২০২০-এর মধ্যে সেগুলোর কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা সাধারণত সড়ক ও বিমান পথে যাতায়াত করলেও ক্যালিফোর্নিয়া এবং টেক্সাসে দ্রুতগতির রেলপথের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে দ্রুত গতির ট্রেন লাইন তৈরির পরিকল্পনা আছে তাদের।

শক্তিশালী অর্থনীতিতে ভর করে চীন তাদের দীর্ঘতম দ্রুতগতির ট্রেন নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ হাজার কিলোমিটার- যা সারা পৃথিবীর বুলেট ট্রেন লাইনের যোগফলের দুই-তৃতীয়াংশ।

এই ট্রেনগুলো চীনের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে ৩১টি তে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করেছে। বিশাল দেশটির সব জায়গায় দ্রুত পণ্য সরবরাহ করে অর্থনৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখছে।

প্রথমদিকে, জাপান এবং পশ্চিম ইউরোপ থেকে প্রযুক্তি নিয়ে তা ব্যবহার করে চীন। এখন নিজেদের এই খাতের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার জন্য নিজেদের গড়ে তুলছে তারা।

পৃথিবীজুড়ে রেল যোগাযোগে যে বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে তার সূচনা শিনকানসেনের হাত ধরেই।

‘শিনকানসেন: ফ্রম বুলেট ট্রেন টু সিম্বল অব মডার্ন জাপান’ গ্রন্থের লেখক ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ক্রিস্টোফার পি. হুড বলেছেন, “শিনকানসেন পরিবহন মাধ্যমের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি জাপানের পুনর্গঠন এবং উদীয়মান শিল্প শক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।”

২০২০ সালে টোকিওতে পুনরায় বসতে যাচ্ছে অলিম্পিকের আসর। ১৯৬৪ সালে এমনই এক অলিম্পিক আসরে জাপান তাদের বুলেট ট্রেন ‘শিনকানসেন’ সবার সামনে তুলে ধরেছিলো। সময়ের সঙ্গে এটি এখন অনিবার্য হয়ে পরেছে সময় বাঁচানোর মাধ্যম হিসেবে। তাই এবারের অলিম্পিক আসরে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে শিনকানসেন ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা দায়। ভাড়া উড়োজাহাজের চেয়ে কম নয়, অনেক ক্ষেত্রে বেশি। তবুও পছন্দের তালিকায় উড়োজাহাজের চেয়ে সব সময় এগিয়ে থাকে শিনকানসেন।

Comments

The Daily Star  | English

145 countries now recognise a Palestinian state

Norway, Spain and Ireland on Tuesday became the latest countries to recognise a state of Palestine

1h ago