জরিমানা করেও থামানো যাচ্ছে না পাহাড় কাটা

নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রামের মীরসরাই এবং সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রকৃতি ও পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আর্থিক জরিমানার বিধান দিয়ে কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে পাহাড় কর্তন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বারবকুণ্ড এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়। গত তিনি বছরে পাহাড় কাটায় যুক্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও থেমে নেই পরিবেশ বিনাশী কার্যক্রম। ছবি: সংগৃহীত

নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রামের মীরসরাই এবং সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রকৃতি ও পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। আর্থিক জরিমানার বিধান দিয়ে কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে পাহাড় কর্তন।

পাহাড় কাটার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর গত তিন বছরে ছয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে। ২০১৭-১৮ সালে এই এলাকায় পাহাড় কাটা বন্ধ করতে ১৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করে। এর পরও বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কর্তন।

মামলা করার আগে ২০১৮ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর পাহাড় কাটায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে। তালিকাটির একটি কপি ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে।

গত ৩০ নভেম্বর সীতাকুণ্ড উপজেলায় সরেজমিন দেখা যায় বারবকুণ্ড পাহাড়ি এলাকায় বেশকিছু প্রতিষ্ঠান পাহাড় কেটে চলেছে। চট্টগ্রামের এমএইচ গ্রুপ, ঢাকার এফআর রিফাইনারি এবং একটি টায়ার ফ্যাক্টরিকে পাহাড় ঘিরে রেখে ভিতরে মাটি কাটতে দেখা যায়।  

এ মাসের শুরুতে এমএইচ গ্রুপের একজন পরিচালক মোহাম্মদ রাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে, অন্য কেউ তাদের ফ্যাক্টরির আশেপাশের পাহাড় থেকে মাটি কাটছে।

“পাহাড় কাটার মতো কাজ আমরা কখনো করিনি। আমরা কেবল আমাদের যতটুকু জমি ততটুকু ঘিরে রেখেছি”, যোগ করেন তিনি। এরকম অবশ্য আগেও অনেকে বলেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৈরি করা তালিকা থেকে দেখা যায় মীরসরাই এবং সীতাকুন্ড উপজেলার অন্তত ১,৬০,০০০ বর্গফুট পাহাড়ি এলাকা ধ্বংস করেছে কেএসআরএম, বিএসআরএম, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, গোল্ডেন ইস্পাত, ইলিয়াস ব্রাদার্স (এমইবি ব্রিক্স) এবং আবুল খায়ের গ্রুপ।  

এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে জরিমানা করা হলেও, তাদের পাহাড় কাটা এখনও বন্ধ হয়নি।

আবুল খায়ের গ্রুপকে ২০১৮ সালে ৮,৩৬,০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা প্রসঙ্গে গ্রুপের প্রতিনিধি ইমরুল কাদের ভুঁইয়াকে গত মে মাসে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সেটাকে “ভুল বোঝাবুঝি” বলে দাবি করেন। তার ভাষ্যমতে পাহাড় কেটেছিল অন্য কেউ। তিনি বলেন, “ফ্যাক্টরির পাশে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান পাহাড় কেটেছিল। সেটার কোনো প্রমাণ না থাকায় আমাদেরকে পাহাড় কাটার দায়ে জরিমানা করা হয়।” যদিও তার বক্তব্যের কোনো ভিত্তি খুঁজে পায়নি দ্য ডেইলি স্টার।

শাস্তিপ্রাপ্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তেমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শাস্তি হিসেবে নগণ্য জরিমানা

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন গত মে মাসে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, জরিমানা করার সময় সব প্রতিষ্ঠানই ভবিষ্যতে আর পাহাড় কাটবে না বলে অঙ্গীকার করে। কিন্তু, গোপনে ঠিকই তারা একই কাজ চালিয়ে যায়।

পাহাড় কাটার অপরাধে গোল্ডেন ইস্পাত, বিএসআরএম, কেএসআরএম এবং পিএইচপিকে দুইবার করে জরিমানা করা হয় ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে। আবুল খায়ের গ্রুপকে জরিমানা করা হয় ২০১৮ তে এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স ২০১৭ সালে একবার জরিমানার টাকা গোনে।

দেশের সর্ববৃহৎ ইস্পাত কারখানা বিএসআরএম চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে চিটাগং পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার সময় ১,০৫,০০০ বর্গফুট পাহাড় ধ্বংস করে। এই ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর কোম্পানিটিকে ৫২ লক্ষ টাকা জরিমানা করে।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি থেকে দেখা যায়, ইলিয়াস ব্রাদার্স, গোল্ডেন ইস্পাত এবং আবুল খায়ের গ্রুপ ধ্বংস করে প্রায় ২১,০০০ বর্গফুট পাহাড়। সীতাকুণ্ডে কেএসআরএম এবং পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ফ্যাক্টরি যথাক্রমে ৫,০০০ এবং ২২,০০০ বর্গফুট পাহাড়ি এলাকা নষ্ট করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কেএসআরএম, পিএইচপি, গোল্ডেন ইস্পাত এবং আবুল খায়ের গ্রুপকে জরিমানা করে যথাক্রমে পাঁচ লাখ, চার লাখ, চার লাখ ৮০ হাজার ও আট লাখ ৩৬ হাজার টাকা। 

পুরো একটি পাহাড় ধসিয়ে ফেলার অপরাধে ইলিয়াস ব্রাদার্সকে সর্বোচ্চ সাড়ে ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

পাহাড়ি এলাকা খাস জমি হলেও, বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পাহাড় দখল করে গড়ে তোলে ভারি শিল্প কারখানা। পাহাড় দখলকারীদেরকে সাধারণত জরিমানার চাইতে বেশি শাস্তি পেতে দেখা যায় না।

পরিবেশ আইনে জরিমানা ছাড়াও দুটি পৃথক শাস্তির বিধান আছে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে অভিযান পরিচালনা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আদালতে মামলা করা। পাহাড় কাটার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায় অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে না পরিবেশ অধিদপ্তর। তখন অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই অভিযোগ অস্বীকার করে। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তির একটা দাপট তো আছেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র হতে জানা যায়, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে। এতে করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া অনেকক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।

গোল্ডেন ইস্পাতের মহাব্যাবস্থাপক বিপুল চাকমার সঙ্গে দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ  থেকে এ বছরের শুরুতে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান যে, তাদের কারখানার পাশে পাহাড়ের একাংশ কর্তন করার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর তাদেরকে জরিমানা করে। “এরপর থেকে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশ মোতাবেক চলার চেষ্টা করছি”, যোগ করেন তিনি।                

বিএসআরএম এর নির্বাহী পরিচালক তপন সেন গুপ্ত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন যে তাদের প্রতিষ্ঠানকে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে জরিমানা করা হয়েছিল। এর বেশি আর কিছু তিনি বলতে চাননি। পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ফ্যাক্টরি এবং কেএসআরএম এর কর্তৃপক্ষ কোন ধরনের মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিল।      

স্থানীয় জনগণ মনে করেন যে, এই সবগুলো প্রতিষ্ঠানই পাহাড় ধ্বংসের জন্য দায়ী।

“পাহাড় কেটেই পিএইচপি তাদের ফ্যাক্টরি বড় করেছে। কেএসআরএম-ও পাহাড় কেটেই তাদের একটা স্ক্র্যাপ রাখার গোডাউন করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তাদেরকে কোনো পাহাড় কাটতে দেখা না গেলেও, যেকোনো সময় তারা তাদের ফ্যাক্টরির আশেপাশের পাহাড় কেটে সমান করে ফেলতে পারে”, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমতলার একজন স্থানীয় বাসিন্দা ডেইলি স্টারকে বলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ভূভাগের মাত্র ১২ শতাংশ জুড়ে আছে পাহাড়। পরিবেশের জন্য পাহাড় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “জীববৈচিত্র্যের শতকরা ৮০ ভাগ বেঁচে থাকে পাহাড়ের উপর নির্ভর করে। নির্বিচারে পাহাড় কেটে চললে পরিবেশগত ভারসাম্য আর কোনভাবেই বজায় থাকবে না।”

“দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভারী শিল্প-কারখানা স্থাপনের ফলে পাহাড়ের অনেক স্থানে পানির প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এতে করে সেখানকার আদিবাসীরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হচ্ছে”, তিনি যোগ করেন।

তার মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় কাটা বেড়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের মাত্রাও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশের পাহাড়গুলো অধিকাংশই বেলেমাটির। পাহাড় কাটার ফলে সেখানে বৃষ্টির পানি প্রবাহে বাধা পড়ে। তার ফলে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, “ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ওইসব বড় বড় শিল্প-কারখানার মালিকেরাও চায়। আমাদের সবার মঙ্গলের কথা চিন্তা করে তাদের অতিদ্রুত সচেতন হওয়া প্রয়োজন।”

“জরিমানায় কাজ না হলে সামনে আমরা আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব,” যোগ করেন তিনি।

Comments

The Daily Star  | English

New School Curriculum: Implementation limps along

One and a half years after it was launched, implementation of the new curriculum at schools is still in a shambles as the authorities are yet to finalise a method of evaluating the students.

8h ago