৫ স্থলবন্দর: এর নাম করোনা স্ক্রিনিং!

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন গোটা পৃথিবী। উদ্বিগ্ন বাংলাদেশও। তারপরও, দেশের ব্যস্ততম পাঁচ স্থলবন্দর দিয়ে দেশে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং চলছে ঢিলেঢালা ভাবেই।
গতকাল আখাউড়া স্থলবন্দরে এক স্বাস্থ্যকর্মী যাত্রীদের স্ক্রিনিং করছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্দরে প্রতিদিনের যাত্রী সংখ্যা এক হাজার ৪০০ থেকে শুধু ৪০০ তে নেমে এসেছে মূলত করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে। ছবি: স্টার

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন গোটা পৃথিবী। উদ্বিগ্ন বাংলাদেশও। তারপরও, দেশের ব্যস্ততম পাঁচ স্থলবন্দর দিয়ে দেশে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং চলছে ঢিলেঢালা ভাবেই।

একই অবস্থা চট্টগ্রাম ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও।

আমাদের সংবাদদাতারা গত সোমবার দিনাজপুরের হিলি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, লালমনিরহাটের বুড়িমারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরগুলো ঘুরে কোনোটিতেই থার্মাল আর্চওয়ে স্ক্যানার দেখতে পাননি।

বন্দরগুলোতে আসা যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে স্বাস্থ্যকর্মীরা হাত দিয়ে ব্যবহার করতে হয় এমন ইনফ্রারেড থার্মোমিটার ব্যবহার করছেন।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, এসব ইনফ্রারেড থার্মোমিটার কিছু ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দেখায়। স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবলও নেই।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে যাত্রীরা অভিযোগ করেন, সেখানে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ঘোষণা ফরমগুলো সংগ্রহ করতে তৎপর নন। বন্দরে আসা যাত্রীদেরই এই ফরম পূরণ করে হেলথ ডেস্কে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকই তা জমা না দিয়েই চলে যাচ্ছেন।

ডেইলি স্টারের সংবাদদাতারাও বেশ কয়েকজনকে পূরণকৃত ফরম জমা না দিয়েই বন্দর ছাড়তে দেখেন।

পূরণ করা ফরমটির মাধ্যমে যাত্রীদের সাম্প্রতিক ভ্রমণ ইতিহাস ও জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব, মাথা ব্যথা বা কাশি আছে কিনা সেসব তথ্য সংগ্রহ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব এয়ারলাইনস ও স্থলবন্দরে নির্দেশনা দিয়েছে ফরমগুলো যাত্রীদের কাছে সরবরাহ করতে ও তা পূরণ করার পর হেলথ ডেস্কে জমা দেওয়ার জন্যে।

একই সঙ্গে অনেক যাত্রী এসে পৌঁছলে স্পষ্টতই দেখা যায় সেখানকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সুশৃঙ্খলভাবে স্ক্রিনিং করতে পারছেন না।

স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অনেকে কোনো গ্লাভস বা ডিসপোজেবল এপ্রোন পড়েননি।

এ বিষয়ে ভাইরোলজিস্টদের সঙ্গে আলোচনা করলে তারা জানিয়েছেন, এভাবে কাজ করায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। তারা আক্রান্ত হলে ভাইরাসটি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কয়েকটি স্থলবন্দরে দেখা গেছে আন্তঃসীমান্ত পণ্যবাহী যানবাহনে যারা আসছেন তাদের স্ক্রিনিং করা হচ্ছে না। ফলে তাদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

গত সোমবার সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আর্চওয়ে থার্মাল স্ক্যানার দেখা যায়। তবে তা কার্যকর ছিল না। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নতুন স্ক্যানারটি গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছে। এর আগে বিমানবন্দরের স্বাস্থ্যকর্মীরা হাতে ধরা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার ব্যবহার করে যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করেছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং বেনাপোল স্থল বন্দরে তিনটি করে থার্মাল স্ক্যানার পাঠিয়েছে।

ঘটনাস্থলে থাকার সময় আমাদের সংবাদদাতারা স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে এমন কোনো কার্যক্রম দেখতে পাননি।

বেনাপোল

গতকাল পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দরের থার্মাল স্ক্যানার নষ্ট ছিল। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করছিলেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নতুন থার্মাল স্ক্যানার গতকাল সন্ধ্যায় স্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে মেডিকেল টিমের শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইউছুফ আলী জানিয়েছেন, ডিজিটাল থার্মাল স্ক্যানার স্থাপনের ফলে ভারতসহ দেশ-বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা, ঠাণ্ডা-কাশি বা অন্য কোনো ভাইরাস আছে কিনা সেটা সহজে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।

সোনামসজিদ

সোনামসজিদ স্থলবন্দরে হাত দিয়ে ব্যবহার করা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার ছাড়া স্ক্রিনিংয়ের আর কোনো সরঞ্জাম ছিল না।

স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরাই ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কারণ, তাদের নিরাপত্তামূলক কোনো উপকরণ ছিল না। তারা জানান, তাদের কাছে মাস্ক, এপ্রোন, গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক উপাদান নেই।

হিলি

স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার এই বন্দরে হাতে ধরা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, থার্মোমিটার সব সময় ঠিকমতো কাজ করে না।

বুড়িমারী

ভারত, নেপাল ও ভুটানে যাতায়াত করতে ব্যবহার করা হয় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দর। অথচ, এই বন্দরে করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষ এখনও থার্মাল স্ক্যানার স্থাপন করতে পারেনি।

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার স্থাপন করা হয়েছে গতকাল। এর আগে দীর্ঘদিন তা নষ্ট ছিল।

বিমানবন্দর সূত্র থেকে জানা যায়, এই বিমানবন্দর দিয়ে আসা সব যাত্রীদের স্ক্রিনিং করার জন্যও প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নেই।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এমজেডএ শরীফ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এক সঙ্গে ৩০০ থেকে ৪০০ যাত্রী নামলে আমরা খুবই সমস্যার মুখে পড়ি।’

এখন পর্যন্ত নোবেল করোনাভাইরাসটি ১০০টির বেশি দেশে এক লাখ ১৭ হাজার ৭৫১ জনকে সংক্রমিত করেছে। তাদের মধ্যে মারা গেছেন চার হাজার ২৯২ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৬৫ হাজার ৮৯৩ জন।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে তিন জন আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী। তিন জনের মধ্যে দুজন সম্প্রতি ইতালি থেকে ফিরেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে নভেল করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ গত বছর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রথম শনাক্ত করা হয়। ভাইরাসটি কোনো প্রকার লক্ষণ প্রকাশ না করে ১৪ দিন পর্যন্ত মানবদেহে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।

বাংলাদেশে এই ভাইরাস প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলেও বিশ্বের কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

স্ক্রিনিংয়ের শিথিলতার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, যে কোনো ছোটখাটো ফাঁকফোকরই ভয়ংকর পরিণতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক অধ্যাপক মোজাহেরুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘স্ক্রিনিংয়ের প্রক্রিয়াটি জোরদার হওয়া উচিত। কোনোভাবে নজর এড়িয়ে গেলেই তার জন্য অনেক মূল্য দিতে হবে।’

মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও মতামত নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

(বেনাপোল, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লালমনিরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিস থেকে আমাদের সংবাদদাতারা এই প্রতিবেদনে অবদান রেখেছেন)

Comments

The Daily Star  | English
Cyclone Remal | Sundarbans saves Bangladesh but pays a heavy price

Sundarbans saves Bangladesh but pays a heavy price

The Sundarbans, Bangladesh’s “silent protector”, the shield and first line of defense against natural disasters, has once again safeguarded the nation from a cyclone -- Remal.

12h ago