আলজেরিয়ার প্লেগ, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস এবং বাংলাদেশ

১৮৪৯ সাল। ফ্রান্স উপনিবেশ পরবর্তী আলজেরিয়ার ছোট্ট শহর ওরান। হঠাৎ এই শহরের অলিগলি-বাসাবাড়ি লাখে লাখে মরা ইঁদুরে ভরে যেতে লাগল। মানুষের চাপে শহরের কর্তৃপক্ষ সেসব জড়ো করে মাটি চাপা দিতে থাকল।
Ashkona Hajj Camp.jpg
আশকোনা হজ ক্যাম্প। ছবি: ইউএনবি

১৮৪৯ সাল। ফ্রান্স উপনিবেশ পরবর্তী আলজেরিয়ার ছোট্ট শহর ওরান। হঠাৎ এই শহরের অলিগলি-বাসাবাড়ি লাখে লাখে মরা ইঁদুরে ভরে যেতে লাগল। মানুষের চাপে শহরের কর্তৃপক্ষ সেসব জড়ো করে মাটি চাপা দিতে থাকল।

আলবেয়ার কামু তার উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’-এ সেই শহরের বর্ণনা দিয়েছেন এই ভাবে-

‘এমন একটা শহরের কথা কি কেউ ভাবতে পারে যেখানে পায়রা নেই, যেখানে গাছপালা বা বাগান বলতে কিছু চোখে পড়ে না, যেখানে কেউ কখনো পাখির ডানার ঝটপটানি বা গাছের পাতার শনশনানি শোনেনি- যে শহর বলতে গেলে এসব দিক থেকে একেবারে নিঃস্ব!”

ঠিক যেন আমাদের প্রিয় শহর ঢাকার মতোই!

এই শহরেই সুন্দর গোছানো একটা বাড়িতে বাস করতেন মধ্যবয়সী ডা. রিও। হঠাৎ তার এক প্রতিবেশী জ্বরে মারা গেল। ডা. রিও তার এক সহকর্মীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, এটা একটা নতুন রোগ এবং ওরান শহরের মানুষের সামনে সেটি ভয়ঙ্কর এক বিপদ ডেকে আনতে যাচ্ছে। তারা শহরের কর্তৃপক্ষকে জানালেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে এটিকে একটি মাত্র মৃত্যুর ঘটনা বলে তেমন পাত্তা দেয়নি; কোন সঠিক পদক্ষেপও নেয়নি। এই শহরের মানুষ এবং তাদের কর্তৃপক্ষ তখনও অনুমান করতে পারেনি সামনে কী নিদারুণ বিপদই না ধেয়ে আসছে।

তবে, এই বিষয়ে প্রস্তুতি আছে মর্মে কর্তৃপক্ষ নোটিশ জারি করলো। কিন্তু সেই নোটিশে ‘সব প্রস্তুতি আছে’ এবং ‘কোন সমস্যা হবে না’ এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে ঘটনার আসন্ন ভয়াবহতাকে ছোট করে দেখা হল। প্রস্তুতি হিসেবে শহরের একটি হাসপাতালে ৮০ শয্যা প্রস্তুত করা হলো; কিন্তু মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে সেগুলো রোগীতে ভরে গেল। মৃত্যুর সংখ্যা যত বাড়তে লাগল, কর্তৃপক্ষও তত জোরালো পদক্ষেপ নিতে লাগল। বাসা-বাড়িগুলোকে কোয়ারেন্টাইন করা হলো; মৃতদেহ আর সেগুলোর সৎকারকার্যকে কঠোর ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা হলো এবং অবশেষে প্লেগের ঔষধের সরবরাহও আসলো; কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় সেগুলো দিয়ে সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। যখন মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন ৩০-এ পৌঁছল, কর্তৃপক্ষ শহরকে চারদিকে থেকে বন্ধ করে দিল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্লেগকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হলো।

কিন্তু ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে। সেই ঘটনা নিয়ে ১৯৪০ সালে লেখক আলবেয়ার কামু তার সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য প্লেগ’ প্রকাশ করেন; কিন্তু তার পটভূমি ১৮৪৯ সালের সেই দুর্যোগ বলে মনে করা হয়।

সেই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডা. রিওর প্রতিটা দিন শুরু হতো খুব সকালে, সারাদিন কাটতো রোগীদের চিকিৎসায়; আর বাসায় ফিরতেন অনেক রাতে। প্রতিদিন চোখের সামনে অসংখ্য মৃত্যুর দৃশ্য তাকে অনুভূতিহীন বানিয়ে দিচ্ছিল।

আর তাই অন্য শহরে চিকিৎসাধীন নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর খবরটাও ডা. রিওর মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারেনি।

চীনের উহানের সেই চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের মত ডা. রিও মারা গিয়েছিলেন সেই মহামারীতে। যুগে যুগে ইতিহাসের পাতায় নানা ঘটনার কী অদ্ভুত মিল।

আমাদের এই ঢাকা শহরেও ডা. রিও বা ডা. ওয়েনলিয়াংরা আছেন। তাদের শহরের কর্তৃপক্ষের মতই আমাদের কর্তৃপক্ষরাও এইসব সতর্ককারীদের কথায় কর্ণপাত করছে না।

যখন লেখাটা লিখছি, তার ঘণ্টা দশেক আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নতুন করোনাভাইরাস জনিত অজানা রোগ কোভিড-১৯ কে বৈশ্বিক মহামারি বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, সব প্রস্তুতি আছে! কী সেই প্রস্তুতি?

চীন যখন থেকে করোনাভাইরাসের কথা ঘোষণা করেছে, তখন থেকেই সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠার (আইইডিসিআর) বলে আসছে, তাদের নাকি সব প্রস্তুতি আছে। বিশেষ করে প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিল যে, তাদের নতুন এই করোনাভাইরাস সনাক্তের সক্ষমতা আছে। সাংবাদিকরা ভাইরোলজিস্ট নয় বলে তাদের এই কথাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

কিন্তু গত মাসের (ফেব্রুয়ারির) মাঝামাঝি বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের এক সভায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য যখন বললেন যে, তার জানা মতে আইইডিসিআরের সেই সক্ষমতা নেই, তখন আইইডিসিআর পরিচালক ডা. মীরজাদী ফ্লোরা সেটা স্বীকার করলেন। এও বললেন, ‘স্যার ঠিকই বলেছেন; আমাদের এতদিন সক্ষমতা ছিল না, কিন্তু গত সপ্তাহে আমাদের কাছে কীট এসেছে। আমার এখন সক্ষম।’ অথচ তার আগে গণমাধ্যমের সামনে বারবার বলেছিলেন, তাদের সক্ষমতা আছে। দুর্যোগ যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার নামে কী নির্মম মিথ্যাচার। অথচ তথ্য গোপন করার এসব প্রবণতাই মানুষকে সরকারি ভাষ্যে অবিশ্বাসী করে তুলেছে। এটা সরকারি মহলে কারও বোঝার ক্ষমতা আছে বলে মনে হচ্ছে না।

সরকার বিশেষত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টাকে শুরু থেকেই কতটা হালকাভাবে নিয়েছে, তার প্রমাণ হলো- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি পাঠানো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুদ করার আহ্বান জানিয়ে সেই চিঠি- যার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মাত্র গত সপ্তাহে!

বিষয়টা যে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা হালকাভাবে নিয়েছেন, তার প্রমাণ হলো স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিতে কোন ভাইরোলজিস্ট নেই; অধিকাংশই আমলা আর কিছু বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধি। আরও বড় প্রমাণ হলো, চলতি মাসের তিন তারিখে সেই কমিটির সভা ডাকা হলো, কিন্তু বৈঠক না করেই আগত সবাই ফিরে গেলেন। আরেকটা প্রমাণ হলো, মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত তথাকথিত টেকনিক্যাল কমিটির সভা। সেখানেও ডাক্তারদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নেই, নার্সদেরও নেই। মিটিংয়ে উপস্থিত কর্মকর্তারা যখন বারবার বলেন, আমাদের দেশে তেমন কিছু হবে না, তখন আর বোঝার বাকি থাকে না প্রস্তুতির মাত্রাটা কোন পর্যায়ে। তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, এই বিপদ সবার, অন্যদের মত তারাও এই বিপদের মধ্যে; সামান্য ফাঁক-ফোকর সমূহ বিপদের কারণ হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন অনেকগুলো বিভাগ আছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, আইইডিসিআরসহ আরও অনেকগুলো। এর বাইরেও আরও সরকারি সংস্থা আছে যাদের এসব কাজে সংশ্লিষ্ট হওয়া জরুরি। কিন্তু শুরু থেকেই এসব বিভাগের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা চলছিল। তার বড় প্রমাণ, কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল সঠিক সময়ে প্রস্তুত না হওয়া। গত সপ্তাহ পর্যন্ত সেখানে ঘোষিত ১০টি আইসিইউ শয্যা স্থাপন করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

শুরু থেকেই একটা চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে করোনা সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি। তার প্রমাণ হলো আইইডিসিআর’র মত প্রতিষ্ঠান, যার কাজই হলো রোগতাত্ত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধান করে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া। এখানে শুরু থেকেই তথ্য গোপন করা হয়ে আসছে।

যেই তিনজনকে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হলো, তারা কবে এসেছেন, তাদের সঙ্গে আসা কতজনকে কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে, এসব তথ্য জানালে নাকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হবে। অথচ পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রোগী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সপ্তাহখানেকেরও বেশি আগে এরা বিমানবন্দর দিয়ে বাড়িতে গেছেন। আর সঙ্গে থাকা যাত্রীদের তথ্যও তারা জানতে চেয়েছে গত সোমবার (মার্চ ৯)।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে খাবি খাচ্ছে, তখন আমাদের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি আছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক আগে থেকেই সব ধরণের সবোর্চ্চ প্রস্তুতির কথা বলে আসছে সব দেশের জন্য। বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা আনমনা হলে এসব কথা বলা যায় এটাই তার প্রমাণ। এ ধরণের বক্তব্যই জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করছে প্রবলভাবে।

আমাদের যে সীমাবদ্ধতা আছে, সেটা স্বীকার করলে তো দোষ নেই; এটা বাস্তবতা। বাস্তবতাকে স্বীকার করেই সবাইকে নিয়ে সামনে এগুতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চার ধরণের জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে পরিকল্পনা সাজিয়েছে। এর আওতায় রোগী সনাক্ত এবং চিকিৎসা থেকে শুরু করে, অন্যদের কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন সব পরিকল্পনা আছে। এটা খুব ভালো দিক। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, গলদটা হলো রোগীদেরকে প্রচলিত হাসপাতালে নেওয়া মানে অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলা। তার মানে পুরো পরিকল্পনা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বড় যে বিষয়টিতে জোর দিচ্ছেন যেটা অনেক দেশ-ই করছে, সেটা হলো রোগী এবং রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সনাক্ত করা। কিন্তু সেই কাজটা মোটেও ঠিকভাবে হচ্ছে না। নীতিনির্ধারকরা ভুলে গেছেন, এটা শুধুমাত্র সরকারি জনবল দিয়ে সামাল দেওয়া যাবে না। আমাদের দেশে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর বড় নেটওয়ার্ক আছে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বিশাল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ আছে। এরকম জরুরি পরিস্থিতিতে তাদেরকে কাজে লাগানোর কি কোন পরিকল্পনা আছে? সম্ভবত নেই। প্রস্তুতি শুধু কতগুলো সংখ্যা নয়; সংখ্যার সঙ্গে গুণগত প্রস্তুতিও জরুরি।

নতুন করোনাভাইরাস নিয়ে চিন্তার অনেক কিছুই আছে। তবে কয়েকটা দিক আমাদের সাহস জোগাবে। যেমন- এই ভাইরাসে যারা আক্রান্ত হয়, তাদের প্রায় ৮২ শতাংশই সাধারণ সর্দি-জ্বরের মত ভালো হয়ে যায়। আর ১৫ শতাংশ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়। এই রোগে মৃত্যুর হার ২.৩ শতাংশ। কিন্তু বয়স্ক এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের জন্য ঝুঁকি বেশি, প্রায় ১৪ শতাংশ মৃত্যুর হার। এটা চীনসহ অন্যান্য দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের সমস্যা হলো অনেক বয়স্ক মারা যাবে, কিন্তু আমার হয়ত বুঝতেই পারবো না এটা কোভিড-১৯ ছিল।

আমরা জোর আশাবাদী, প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিটি প্রাণ ওরান শহরের সেই প্লেগ মহামারীর মত কোন বিপদে পড়বে না। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই সব আয়োজন হওয়া চাই। ভুলে গেলে চলবে না, এই বিপদ শুধু সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ জনগণের নয়, এটা সুবিধাভোগীদেরও, নীতিনির্ধারকদেরও। এই ভাইরাস কোন আমলাতান্ত্রিক আচরণ দিয়ে দমানো যাবে না। সুতরাং আর হেলা নয়; আমাদের ডা. রিও বা ডা. লি ওয়েনলিংদের কথা বলতে দিন, তাদের কথা শুনুন। সবাই নিরাপদের থাকুন, সুস্থ থাকুন।

Comments

The Daily Star  | English

Climate change to wreck global income by 2050: study

Researchers in Germany estimate that climate change will shrink global GDP at least 20% by 2050. Scientists said that figure would worsen if countries fail to meet emissions-cutting targets

2h ago