গৃহবন্দিকালের যোদ্ধা বাবা-মায়েরা চাপ সামলাবেন কীভাবে

সেলিনা হোসেন একজন কর্মজীবী নারী। করোনা নিয়ে বন্ধে বাড়িতে বসে কাজ করছেন। উনি সবচেয়ে সমস্যায় আছেন তার দুই টিনএজ ছেলেকে নিয়ে। বললেন, ‘ওদের স্কুল-কলেজ বন্ধ, টিউশনি বন্ধ, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই। ফলে ঘরে বসে বসে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই বাইরে যেতে চাইছে। যেতে মানা করলে রাগ হচ্ছে। রাতে দেরিতে ঘুমাচ্ছে, সকালে দেরি করে উঠছে। আর সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে আছে। পড়াশোনা করতে চাইছে না। এই নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে ওদের বাবার গোলযোগ চলছেই।’
Family-1.jpg
ছবি: সংগৃহীত

সেলিনা হোসেন একজন কর্মজীবী নারী। করোনা নিয়ে বন্ধে বাড়িতে বসে কাজ করছেন। উনি সবচেয়ে সমস্যায় আছেন তার দুই টিনএজ ছেলেকে নিয়ে। বললেন, ‘ওদের স্কুল-কলেজ বন্ধ, টিউশনি বন্ধ, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই। ফলে ঘরে বসে বসে অস্থির হয়ে যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই বাইরে যেতে চাইছে। যেতে মানা করলে রাগ হচ্ছে। রাতে দেরিতে ঘুমাচ্ছে, সকালে দেরি করে উঠছে। আর সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে আছে। পড়াশোনা করতে চাইছে না। এই নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে ওদের বাবার গোলযোগ চলছেই।’

সীমা রহমানের সমস্যাটা একটু অন্যরকম। উনিও ঘরে বসে অফিস করছেন। ক্লাস সেভেনে পড়ে ছেলে। সাধারণত ওর প্রিয় খাবার বার্গার, চিকেন ফ্রাই এবং এইসব হাবিজাবি। এখন এসব অর্ডার দিয়ে খেতে পারছে না বলে বাসায় খুব হইচই। বাসায় এসব বানিয়ে দিলেও হচ্ছে না। তাকে বোঝাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সবাই। সীমা বললেন, ‘একদিকে করোনাভাইরাস নিয়ে চিন্তার শেষ নাই, অন্যদিকে প্রতিদিন খাওয়া নিয়ে ওর জেদ। আর যেহেতু ঘরে বসে আছে, যন্ত্রণা করছে আরও বেশি।’

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মানুষকে নানাভাবে খুবই চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একে কেন্দ্র করে ভয় এবং দুশ্চিন্তা বয়স্ক মানুষ থেকে শুরু করে কমবয়সী ছেলে-মেয়ে এবং শিশুদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সেই সঙ্গে বয়স্ক মানুষকে করে তুলতে পারে আবেগাপ্লুত। যেমন: ৮৫ বছর বয়সী জোহরা আহমেদ খুবই চিন্তিত থাকছেন সবসময়। চিন্তা করছেন নিজের শরীর নিয়ে, চিন্তা নাতি-নাতনি এবং ছেলে-মেয়ের শরীর নিয়ে। উনি শুনেছেন ৫০ বছরের বেশি বয়স হলে এই ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে সহজেই।

কোয়ারেন্টিনে থাকাকালে এরকম আরও নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে আমাদের সবাইকে পড়তে হচ্ছে। আমরা কেউই এইভাবে ঘরবন্দি হয়ে থাকতে অভ্যস্ত নই। তাই সব বয়সের মানুষেরই বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং দিচ্ছেও। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষ চাপ, দুর্যোগ ও অশান্তির মধ্যে সবাই একভাবে আচরণ করে না। এরকম একটা পরিস্থিতিতে কে, কেমন আচরণ করবে এটা নির্ভর করে তার বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা করার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মানসিকতা কেমন- এর উপর।

গৃহবন্দি থাকাকালে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মা-বাবাকেই মানে সংসারের উপার্জনক্ষম ও স্থিতিশীল মানুষদেরই বহন করতে হচ্ছে। কারণ বাসায় থাকা বয়স্ক মানুষ, শয্যাশায়ী কেউ, শিশু-কিশোর ও মানসিক প্রতিবন্ধী সবার দায়িত্ব সংসার যিনি বা যারা চালান তাদের উপরই বর্তায়। সেই সংসারে যদি কোনো ডাক্তার বা নার্স বা অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী থাকেন, তখন তাদের দায়িত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। সবাইকে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রাখার দায়িত্ব স্বভাবতই বাবা-মায়ের ওপর এসে পড়ে।

এই দায়িত্বের মধ্যে পড়ছে বাবা-মায়ের নিজের স্বাস্থ্য ও প্রিয়জনের স্বাস্থ্য রক্ষা করা। বিভিন্ন মেডিকেল জার্নালে বলা হচ্ছে, এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাবা-মাকে লক্ষ্য রাখতে হবে পরিবারের শিশু-কিশোরদের ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না। বয়স্কদের এবং শিশুদের ঘুম ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। যেমন: স্কুল, কলেজ, পরীক্ষা না থাকায় পড়াশোনায় একটা ঢিলেমিভাব চলে আসাটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে পড়ার টেবিলে আটকে রাখা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয় মায়ের জন্য। কিন্তু এরপরও চাপ না দিয়ে অল্প অল্প করে পড়ার অংশটা গুছিয়ে নিতে হবে।

পরিবারের বাবা-মায়ের দায়িত্ব হচ্ছে একদিকে যেমন শিশুদের চিন্তামুক্ত রাখা, অন্যদিকে শিশুদের এই নতুন ভাইরাস সম্পর্কে সাবধান রাখা। কী কী নিয়ম মেনে চলতে হবে, তা প্রথমে নিজেদের জানতে হচ্ছে এবং তা মানা হচ্ছে কি না সেটাও কঠিনভাবে নজরে রাখতে হচ্ছে। কারণ নিয়মের ব্যত্যয় হলেই বিপদ। এর মধ্যে আবার এও দেখতে হচ্ছে, নিয়মের তোড়ে বাচ্চার যেন হাঁসফাঁস অবস্থা না হয়।

সামাজিক দূরত্ব মানে কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। এখন সবার কাছে ফোন আছে, কাজেই আত্মীয় বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতে হবে। হাতের কাছে যা থাকবে, তাই দিয়ে বাচ্চাদের খেলাধুলা চালু রাখতে হবে। যেমন: লুডু, ক্যারাম, দাবা, বাগাডুলি। মোবাইলেও নানা ধরনের গেম আছে। এ ছাড়া ছোটখাটো দু-একটা বাড়ির কাজে বাচ্চাদের লাগালে তারা উৎসাহিত বোধ করে, অন্যদিকে সময়ও পার করা যায়। আবার চালু হতে পারে চিঠি লেখা, ডায়েরি লেখা, গল্প-কবিতা লেখা, ছবি আঁকার অভ্যাস।

শিশু যেন এই অন্যরকম পরিস্থিতিতে ভয় না পায়। কোনোভাবেই শিশুর মনে আতঙ্ক ছড়ানো যাবে না। যেমন: সেদিন একজন জানালেন, তার ছোট মেয়েটি ফেসবুকে নাকি দেখেছে সাদা কাপড় পরা ৫/৬ জন মানুষ একজনকে কবর দিচ্ছে। এই ভিডিও দেখার পর সে আর একা ঘুমাতে যেতে পারে না। শুধু বারবার বলছে, ‘মা-বাবা তোমরা মারা গেলেও কি এই সাদা কাপড় পরা লোকগুলি তোমাদের নিয়ে যাবে?’

শুধু মহামারি সংক্রান্ত খবর দেখা, পড়া ও শোনা থেকে বিরত রেখে তাদের সঙ্গে নানা ধরনের খেলাধুলা করতে হবে, গল্পের বই পড়ে শোনাতে হবে। মনোচিকিৎকদের মতে, শিশুরা বেশিদিন ঘরে আটকে থাকলে ঘ্যান-ঘ্যান করতে পারে, বেশি কান্নাকাটি, জেদ প্রকাশ ও বিরক্ত করতে পারে। কারো কারো বেশি ভয় থেকে পুরনো অভ্যাসও দেখা দিতে পারে। যেমন: আবার বিছানায় প্রস্রাব করা শুরু করতে পারে। এগুলো অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। করোনা ও এর প্রভাব সম্পর্কে সময় নিয়ে কথা বলতে হবে শিশুদের সঙ্গে। সব তথ্য শেয়ার করতে হবে। যেভাবে বললে বুঝবে সেভাবেই বলতে হবে। তারা যে নিরাপদ এটাও তাদের বুঝাতে হবে।

বয়ঃসন্ধিকাল বা টিনএজের বাচ্চারা সাধারণত অভিভাবক বা বাবা-মায়েদের কাছে সবসময় থাকতে পছন্দ করে না। বাবা-মায়েদের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করতে পারে। বাবা-মা যদি শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন, তাহলেই সেটা হবে তাদের সন্তানদের জন্য একটা বড় পাওয়া। এরকম পরিস্থিতিতেও সন্তানের প্রতি বাবা-মাকে অনেকটাই সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে। নতুবা তারা এগ্রেসিভ হয়ে উঠতে পারে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার কলামিষ্ট ও বয়ঃসন্ধিকাল বিশেষজ্ঞ ডা. লিসা ড্যামুরের উক্তি দিয়ে ইউনিসেফ বলেছে যে, এই অস্থির সময়টাতেও শিশুদের একটা রুটিনের মধ্যে থাকতে হবে। তারা কখন কাজ করবে, কখন পড়বে। সেই রুটিন তৈরির সময় উনি মনে করেন বাচ্চাদেরও সম্পৃক্ত করা উচিৎ। তাদেরও বুঝতে দেওয়া উচিৎ কেন তারা এইসব নিয়ম কানুনের ভেতর দিয়ে যাবে। কারণ তবেই তারা বুঝবে এইভাবেই আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের, চারপাশের মানুষের যত্ন নেব।

তবে সবচেয়ে অসুবিধায় পড়েছে সেইসব শিশু, যাদের বাসায় পড়ানোর মত কেউ নেই। বাবা-মা পড়তে পারেন না। ওরা সবাই কোচিং করে। আমার পরিচিত একজন গৃহকর্মী জানাল, ওর দুই মেয়ে কোচিং এ গিয়ে পড়াশোনা করে। বাসায় কেউ ওদের পড়া দেখাতে পারে না। আজ একমাস যাবত পড়া, স্কুল সব বন্ধ। খুললেই পরীক্ষা। এই শ্রমজীবী নিরক্ষর পরিবারগুলোর শিশুরা কীভাবে কী করছে, তা সত্যিই আমরা জানি না। ওদের ভালো রাখার জন্য আমাদের কাছে কোনো ক্যাপস্যুলও নাই।

পরিবার যারা চালান, তাদের উচিৎ করোনা মোকাবিলায় স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কীভাবে করছেন, সেটা মাঝেমাঝে চেক করে নেওয়া। মেজাজটা ঠিক রাখা যাচ্ছে কী না, ব্যবহার ঠিক আছে কী না। মাঝেমধ্যে একা থাকাটাও কাজে দেয়। ঘরে বসে বসেই যাকে যেভাবে পারেন সাহায্য করলে খুব ভালো অনুভূতি হবে। যদি কেউ প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে স্ট্রেস রিলিফের জন্য বন্ধুবান্ধব বা ভাইবোনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।

কাজকর্মহীন বা ঘরে আবদ্ধ থাকার ফলে অনেকেরই অতিরিক্ত মেজাজ হয় ও খিটখিটে ভাব বৃদ্ধি পেতে পারে। বাড়তে পারে মাথাব্যথা বা শরীরব্যথার মত উপসর্গ। যেমন: আমার পরিচিত একজন ভদ্রমহিলা জানালেন, তার স্বামী এই কোয়ারেন্টিনের সময়টাতে খুব মুষড়ে পড়েছেন। ওনার দুইটা কাপড়ের দোকান আছে, আছে ছোট একটা ফ্যাক্টরি। ব্যাংক থেকে পহেলা বৈশাখ ও ঈদের জন্য লোন নিয়েছেন প্রডাকশন করবেন বলে। এক পয়সাও বিক্রি নাই গত একমাসে। তাই সাংঘাতিক রকম ভেঙে পড়েছেন। খুব খারাপ ব্যবহার করছেন সবার সঙ্গে। বোঝাই যাচ্ছে চিন্তা, ভয়, হতাশা থেকে উনি এই আচরণটি করছেন। বাসার সবাই মিলে এই অবস্থায় তাকে সান্ত্বনা দিতে হবে, বুঝাতে হবে। নতুবা নার্ভাস ব্রেকডাউন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সামনের দিনগুলোতে এইরকম পরিস্থিতি আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। কাজেই এখন থেকেই পরিবারের সবাইকে প্রস্তুতি নিতে হবে।

শুধু কি তাই, করোনা আক্রান্ত না হয়েও কেউ কেউ ভয় পেতে পারেন সাধারণ হাঁচি কাশিতে। সামান্য জ্বর এলেই ভয় হতে পারে, এই বুঝি করোনা এল। অথচ এটা হলো সিজন চেঞ্জের সময়। হাঁচি, কাশি, জ্বর হতেই পারে। সেই জন্যই আমাদের গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাতে হবে, যেন বিভিন্ন পরিবারের লোকজন করোনার উপসর্গগুলো ঠিকমতো বুঝতে পারেন। অহেতুক ভয় যেন না পান। বারবার ডাক্তারদের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ে কথা বলাতে হবে।

প্রিয়জন কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন থেকে বের হওয়ার পর তাকে নিয়ে পরিবারে ভয় সৃষ্টি হতে পারে, যা রোগীর জন্য বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্যেও অস্বস্তিকর হতে পারে। বন্ধু বা আত্মীয়রা কাউকে দেখে ভয় পাচ্ছে বা ছোঁয়াচে রোগ বলে মনে করছে, এই অনুভূতিতে দুঃখ, রাগ ও হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। এই কারণেই করোনা টেস্ট পজিটিভ আসার পর সম্প্রতি এক ছেলে ঢাকার দক্ষিণখান থেকে পালিয়ে গেছে। সেই জন্যেই প্রচারণা জোরদার করতে হবে। যাতে করোনা আক্রান্ত রোগী বা কোয়ারেন্টিনে থাকা কেউ নিজেকে অপরাধী না ভাবে।

করোনা যুদ্ধে, বিশেষ করে এই গৃহবন্দিকালে সবচেয়ে বড় যোদ্ধা হচ্ছেন পরিবারের বাবা-মায়েরা বা পরিবারের চালকরা। যাদের পরিবারের অন্য সবাইকে ভালো রাখার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, নিজেদের ভালো রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে এবং একইসঙ্গে করোনাকে সামলে নিয়ে জীবন জীবিকার চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং হবে। আসুন আমরা ভাবি তারা কীভাবে এই যুদ্ধে জয়ী হবেন।

শাহানা হুদা রঞ্জনা, যোগাযোগকর্মী

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

Why planting as many trees as possible may not be the solution to the climate crisis

The heatwave currently searing Bangladesh has led to renewed focus on reforestation efforts. On social media, calls to take up tree-planting drives, and even take on the challenge of creating a world record for planting trees are being peddled

40m ago