ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়ে গম সংগ্রহ, শুরুতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শঙ্কা

করোনা পরিস্থিতিতে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় চলতি মৌসুমে সরকারি খাদ্যগুদামে গম সংগ্রহ অভিযানের শুরুতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
ঠাকুরগাঁওয়ে গত ১৫ এপ্রিল গম সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাংসদ রমেশ চন্দ্র সেন। ছবি: স্টার

করোনা পরিস্থিতিতে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় চলতি মৌসুমে সরকারি খাদ্যগুদামে গম সংগ্রহ অভিযানের শুরুতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

গমের বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় সরকার ঘোষিত দামের ব্যবধান খুব কাছাকাছি হওয়ায় কৃষকেরা গুদামে গম সরবরাহ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না বলে এ অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে— এমনটি জানিয়েছেন খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা, গম চাষি ও ব্যবসায়ীরা।

ঠাকুরগাঁও জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক বাবুল হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ২৮ টাকা দরে চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলায় গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ১২ হাজার ৩১০ মেট্রিক টন ও ৪ হাজার ৪৪ মেট্রিক টন।’

দুই জেলায় লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত প্রায় ১৬ হাজার ৩৫৪ কৃষক গম সরবরাহের সুযোগ পাবেন বলেও জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ে গত ১৫ এপ্রিল গম সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সাংসদ রমেশ চন্দ্র সেন এবং ১৬ এপ্রিল পঞ্চগড়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন পঞ্চগড়-১ আসনের সাংসদ মজাহারুল হক প্রধান।

আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এই দুই জেলায় গম পাওয়া গেছে মাত্র বিশ টন। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে ১৭ টন ও পঞ্চগড়ে ৩ টন।

গত কয়েকদিনে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বিভিন্ন হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব হাটে প্রতি ৮০ কেজির বস্তায় সদ্য মাড়াই করা কাঁচা গম বিক্রি হচ্ছে ২,০০০ থেকে ২,১০০ টাকা দরে।

সেই হিসাবে প্রতি কেজি গমের দাম পড়ছে ২৫/২৬ টাকা। আর সরকার গুদামে গম সংগ্রহের দাম দিয়েছে প্রতি কেজি ২৮ টাকা।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ফাড়াবাড়ী গ্রামের গমচাষি আমজাদ হোসেন জানান, জেলার বিভিন্ন হাটে গমের বর্তমান বাজার মূল্য ২৬ টাকা বা তার কিছু বেশি।

তিনি আরও জানান, সরকারি খাদ্য গুদামে গম সরবরাহ করতে হলে গমের ১৪ ভাগ আর্দ্রতার প্রয়োজন। মাড়াইয়ের পর গম শুকিয়ে ১৪ ভাগ আর্দ্রতায় আনতে গেলে প্রতি মণে গড়ে আড়াই থেকে তিন কেজি ঘাটতি হয়, যা টাকার অংকে বিচার করলে প্রতিমণে প্রায় ৬৫ টাকা পড়ে।

‘সেই হিসাবে শুকানোর পর একমণ গমের দাম পড়ে যায় ১,১০০ টাকা। সরকারি গুদামে সেই গম প্রতি কেজি ২৮ টাকা দরে বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ১,১২০ টাকা,’ যোগ করেন তিনি।

তার মতে, ‘এরপর রয়েছে পরিবহন খরচসহ নানান ঝামেলা। এজন্য এ অবস্থায় বাজারে বিক্রি করাটাই কৃষকের জন্য লাভজনক বলে তিনি মনে করেন।‘

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাকোয়া গ্রামের আরেকজন গম চাষি শামসুজ্জোহা বলেন, ‘এ বছর দুই বিঘা জমিতে গম চাষ করে ২৮ মণ গম পেয়েছিলাম। সরকারিভাবে ক্রয়ের জন্য যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বাজার মূল্যের সঙ্গে তার পার্থক্য যৎসামান্য।’

আরও বলেন, ‘এবার বাজারে ভালো দাম পাওয়ায়, খাওয়ার জন্য অল্পকিছু রেখে ২৬ টাকা কেজি দরে স্থানীয় হাটে গম বিক্রি করে ফেলেছি মাড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে।’

পঞ্চগড়ের বোদা বাজারের ব্যবসায়ী খাদেমুল ইসলাম বলেন, ‘বাজার দরের সঙ্গে সরকারি দরে পার্থক্য সামান্য হওয়ার কারণে চাষিরা এবছর গুদামে গম সরবরাহ করতে কম আগ্রহী হবেন বলে মনে হচ্ছে।’

এ অবস্থায় গুদামে গম সংগ্রহ অভিযান সফল করা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিগগির গমের সরকারি সংগ্রহমূল্য পুনর্বিবেচনা করলে চলতি মৌসুমে গম সংগ্রহ অভিযান সফল করা সম্ভব।’

এদিকে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শিবগঞ্জ খাদ্য গুদামে লটারিতে নাম আসা এক গমচাষি গত সোমবার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরকারের নিয়মানুযায়ী গম সরবরাহের পর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গমের মূল্য পরিশোধ করা হবে। সে কারণে ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন সীমিত ব্যাংকিং এর জন্য এই মুহূর্তে হিসাব খুলতে পারছেন না। তাই সরকারি গুদামে গম সরবরাহ করা এখন সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (উপ-মহাব্যবস্থাপক) মো. আশরাফুল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সীমিত ব্যাংকিংয়ের কারণে সময় স্বল্পতার জন্য একসঙ্গে অনেক হিসাব খোলা সম্ভব নয়। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু কিছু করে হিসাব খোলা যাবে।’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বাবুল হোসেন বলেন, ‘বাজারে গমের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার খাদ্যগুদামে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কিনা, শঙ্কার মধ্যে আছি। এরপরও গম চাষিদের সঙ্গে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাগণ যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন অভিযান সফল করতে।’

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আফতাব আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৫০ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে গম আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে প্রায় দুই লাখ সাত হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, পঞ্চগড় জেলায় এবার ১৭ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে। যা থেকে গমের উৎপাদন হয়েছে ৬৭ হাজার ৩২৮ মেট্রিক টন।

Comments

The Daily Star  | English
Dhaka brick kiln

Dhaka's toxic air: An invisible killer on the loose

Dhaka's air did not become unbreathable overnight, nor is there any instant solution to it.

12h ago