‘কত রবি জ্বলে রে, কেবা আঁখি মেলে রে’ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুন, যোদ্ধাদের বাঁচান

তখন মিরপুর রোডে রিকশা চলতো। আসাদগেট থেকে রিকশায় করে এলিফেন্ট রোড যাচ্ছিলাম। পথে চালকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম তার বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ, নাম বশির। আমার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী শুনে সে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শুরু করলো। আমি জানতে চাইলাম তিনি কি ঢাকায় নতুন এসেছেন? বশির খুব কনফিডেন্টলি বলল, ‘কছেন কি? এই দুই বছ্ছর ধরি ঢাকাত ইকশা চালাছো। পুরা শহর মোর হাতের মুঠাত। (বলছেন কি, আমি দুবছর ধরে রিকশা চালাচ্ছি। ঢাকা শহর আমার হাতের মুঠোয়।)’
mitford
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

তখন মিরপুর রোডে রিকশা চলতো। আসাদগেট থেকে রিকশায় করে এলিফেন্ট রোড যাচ্ছিলাম। পথে চালকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম তার বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ, নাম বশির। আমার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী শুনে সে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শুরু করলো। আমি জানতে চাইলাম তিনি কি ঢাকায় নতুন এসেছেন? বশির খুব কনফিডেন্টলি বলল, ‘কছেন কি? এই দুই বছ্ছর ধরি ঢাকাত ইকশা চালাছো। পুরা শহর মোর হাতের মুঠাত। (বলছেন কি, আমি দুবছর ধরে রিকশা চালাচ্ছি। ঢাকা শহর আমার হাতের মুঠোয়।)’

আমি বললাম, ‘বলেন কি? এই শহর আপনার হাতের মুঠোয়?’ সে জানালো, হ্যাঁ, মিরপুর থেকে আজিমপুর, আর ঐ দিকে সংসদ ভবন, এলিফেন্ট রোড, গাউছিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, মতিঝিল, গুলিস্তান সব রাস্তার নাম মুখস্থ। বশির কখনো উত্তরা, বনানী, গুলশান, মহাখালী, নিকেতন, উত্তরখান, খিলগাঁও, বাসাবো, পুরান ঢাকা ঐ দিকে যায়নি এবং চিনেও না বলে জানালো।

আমিও খুব বিস্মিত হওয়ার ভান করে বললাম, ‘বাপরে, আপনি তো সত্যিই অনেক জায়গা চেনেন।’ সেও বলল, ‘হুম মুই কনুনা, ঢাকা মোর হাতের মুঠাত (হুম, বললাম না, ঢাকা আমার হাতের মুঠায়।)’ লোকটার জন্য মায়াই লাগলো। শহরের এতগুলো বড় বড় জায়গায় সে যায়নি, অথচ তাতে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। যেটুকুতে গেছে সেটাতেই সে মনে করছে ঢাকা তার হাতের মুঠোয়।

এত বছর পর বুঝলাম তার কথার একটা মূল্য ছিল। আমাদের বড় বড় ডাইসাইটে নেতা ও নীতিনির্ধারকরা কেন করোনাকে তাদের হাতের মুঠোয় মনে করেছেন। বশিরের মতোই তারা বলেছিলেন আমরা প্রস্তুত। করোনা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। বশিরের যেমন ঢাকা নগরীর মানচিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণা ও মাথাব্যথা ছিল না, তেমনি আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদেরও করোনা বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না এবং এখনো সম্ভবত ধারণাও নেই। আমার ঐ দেশি চালক যেমন ঢাকা শহরের চার ভাগের একভাগ চিনেই খুশি ছিল, আমরাও তাই। এলেবেলে ভাবে ম্যানেজ করতে পেরেই ভেবেছি করোনা মোকাবিলা আমাদের হাতের মুঠোয়।

আর তাইতো আমাদের এই যুদ্ধে যারা যোদ্ধা, যারা আমাদের বাঁচাবেন, যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস যোগাবেন, তাদের অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ। এতটাই খারাপ যে মিটফোর্ড হাসপাতাল লকডাউন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কেউ কখনো কি শুনেছেন হাসপাতাল লকডাউন করার কথা? এরকম অবস্থা অনেকগুলো সরকারি হাসপাতালের।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ইতিমধ্যে ২০০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন (বিডিএফ)। তাদের মতে ‘বিশ্বে চিকিৎসকদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। দেশে যে পরিমাণ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তার মধ্যে চিকিৎসক ১৩ শতাংশ। সব স্বাস্থ্যকর্মী মিলে হিসাব করলে এটা ১৫ শতাংশের বেশি। এই হার সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ইতালিতে এই হার আট দশমিক সাত শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ।’

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে আমাদের চিকিৎসকদের কি অবস্থা। তারা কোন বিপদ কাঁধে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। সরকার আগে থেকেই ধারণা পেয়েছিল করোনা ধেয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ দেশের চিকিৎসক, গণমাধ্যম, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা বারবার সাবধান করে আসছিলেন যে করোনা আসছে। আমরা তখনো ঘুমে। কোনো প্রস্তুতি নেই, কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নেই। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি বুঝতে পারছিল না ঘটনার ভয়াবহতা? একটা মাস শুধু নৈব নৈব করে সংবাদ সম্মেলন করে কাটালো।

করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) ভেতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মাস্ক। এরপর গ্লাভস। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এন-৯৫ মাস্কের নামে যা দেওয়া হচ্ছে সেগুলো মানহীন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসকদের যদি আসল এন-৯৫ মাস্ক না দেওয়া যায় তাহলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) বা হাইডিপেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) দিয়েও শেষ রক্ষা করা যাবে না। ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেক মাস্ক রাখলেও এন-৯৫ বা তার সমমানের মাস্কে যে কাপড় ব্যবহার করা হয় তা অনেক ধরনের ভাইরাস থেকে রক্ষা করে।

বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে আমরা দেখছি করোনা রোগীর জন্য নির্ধারিত কুয়েত মৈত্রী ও কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য তেমন কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। আর তাই তারা রোগীদের পাশে সেভাবে থাকতে পারছেন না বলে রোগীরা অভিযোগ করছেন। খাওয়া ও বিশ্রামের সুযোগও নাই। এটা একটা যুদ্ধ। এই যুদ্ধের জন্য যোদ্ধাদের প্রস্তুত করার সঠিক উদ্যোগ আমরা নিতে পারলাম না কেন? চিকিৎসকরা বলছেন, এন-৯৫ বলে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে যা দেওয়া হয়েছে সেগুলো খালি চোখে দেখলেই বোঝা যায় এগুলো ‘ভুয়া’। পত্রিকায় দেখলাম সারা দেশের চিকিৎসকরা বলছেন, এসব মাস্কের মান অত্যন্ত খারাপ।

শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অনারারি মেডিসিন কর্মকর্তা ডা. ফয়সাল ইসলাম ফাহিম গণমাধ্যমকে বলেছেন, মাস্ক হিসেবে তাদের এন-৯৫ এর বদলে পাতলা গেঞ্জির কাপড়ে সেলাই করা জোড়াতালির মাস্ক দেওয়া হয়েছে। যা দিয়ে ধুলা কিছু আটকালেও কখনোই কোনো ভাইরাস আটকাবে না।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে বিশ্বের অসংখ্য দেশে। আমেরিকা, ব্রিটেন, ইতালির মতো দেশেও কিছু কিছু সময় এন-৯৫ মাস্কের ও কিটের সমস্যা হয়ে ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো দেশেই শুনলাম না পিপিই নিয়ে, বিশেষ করে মাস্ক নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। আমাদের দুর্নীতির মাত্রা এত বেশি যে প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত এ বিষয়ে কথা বলতে হয়েছে। উনি বলতে বাধ্য হয়েছেন পিপিইর বাক্সগুলো খুলে পরীক্ষা করে গ্রহণ করুন।

এন-৯৫ মাস্কের মোড়কে সাধারণ মাস্ক দেওয়ার ঘটনা তদন্তের জন্য সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। অথচ অনেক দিন ধরেই চিকিৎসক, সাংবাদিকরা এই দুর্নীতির কথা বলে আসছেন। কোনো কিছুতেই কারো কিছু আসে যায় না। এইসব ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত অমানুষগুলো একবারও ভাবে না, করোনায় তারা নিজেরা বা তাদের পরিবার আক্রান্ত হতে পারে। তখন আর কাউকে না, এই ডাক্তারদেরই পাশে লাগবে। এখন তো আর ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া যাওয়া যাবে না। দেশেই শয্যা নিতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা কোথাও নাকি এই মাস্ক পাচ্ছে না। তাহলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র চীন থেকে এই মাস্ক আনলেন কেমন করে? শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিম্নমানের মাস্ক নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে, উল্টো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ওষুধ বিভাগ (সিএমএসডি)। এমনকি যারা এ নিয়ে সমালোচনা করবে তাদের বিরুদ্ধে তথ্য অধিকার আইনে মামলা করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

করোনা রোগীদের দায়িত্বে নিয়োজিত চিকিৎসকদের রাজধানীর বড় হোটেলগুলোতে রাখার বন্দোবস্ত হওয়ার কথা শুনেছিলাম, যাতে তাদের বাসায় ফিরতে না হয়। অথচ হোটেল কর্তৃপক্ষের সংস্থা একটি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখনো তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। মহাপরিচালক সাহেবকে এই প্রশ্ন করলে তিনি প্রতিবেদককে বেশ চড়া গলায় ধমকে দেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালের দৈন্যদশা ও বিভিন্ন দুর্নীতির কথা উঠে এসেছে গণমাধ্যমে কিন্তু লাভ হয়নি।

দুর্নীতির অভ্যস্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে ক্রান্তিকালেও দুর্নীতি না করে থাকা যাচ্ছে না। সব যেন লেজে গোবরে অবস্থা। আর তাই আজকে যখন ঘাড়ের উপর মহামারি এসে পড়েছে, তখনও আমরা সেই পাকেই ডুবে আছি। আমাদের পরীক্ষা করার কিটের অভাব, পিপিইর অভাব, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের নূন্যতম সুবিধার অভাব, ভালো মানের চিকিৎসা সামগ্রীর অভাব, মানুষের মুভমেন্ট ঠেকাতে না পারা, সমন্বয়ের অভাব - সর্বোপরি আমাদের সততার অভাব। এই কঠিন দুর্যোগের মধ্যে দাঁড়িয়েও আমরা চুরি করছি। শুধু ঢাকার চিত্র থেকেই বোঝা যায় দেশব্যাপী কি অবস্থা বিরাজ করছে।

মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘চিকিৎসকরা যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন, এ পরিস্থিতি খুবই ভীতিকর এবং উদ্বেগজনক। এভাবে যদি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হতে থাকেন, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে সব মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলবে।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরকে অনুরোধ করে ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘শুরুতে তারা যেভাবে বিলম্ব করেছেন, আর বিলম্ব না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাঁচ হাজার চিকিৎসক, পাঁচ হাজার নার্স এবং এক হাজার হেলথ টেকনোলজিস্টকে নিয়ে পুল তৈরি করুক এবং আগামী ১৫ দিন তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত রাখা হোক। ভবিষ্যতে যদি দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসক আক্রান্ত হয়ে পড়েন তাহলে সে পুল থেকে যেন চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যদের দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালানো যায়।’

আমাদের পি পু ঘু শু (পিঠ পুড়ে যায়, ঘুরে শুই) এর দিন শেষ। দয়া করে আঁখি মেলেন। নতুবা শুধু চিকিৎসকরা নন, আপনারা কেউ সেই আগুনের হাত থেকে বাঁচবেন না। ভিআইপি হাসপাতাল করেও কিন্তু পার পাওয়া যাবে না। আসুন, একা না বেঁচে, সবাইকে নিয়ে বাঁচি।

শাহানা হুদা রঞ্জনা, যোগাযোগকর্মী

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments

The Daily Star  | English

Sundarbans: Bangladesh's shield against cyclones

The coastline of Bangladesh has been hammered by cyclones over and over since time immemorial

51m ago