করোনাকাল, তারপর-১

দুনিয়া কাঁপানো ২০২০। পৃথিবীর জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সর্বোপরি রাজনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে এর অদৃশ্য ছায়া। এটা কি মানব তৈরি না অন্য কোনো জীব-জন্তু থেকে? কিংবা কোনো ‘কন্সপিরেসি থিওরি’ নিয়ে এ লেখা নয়। ৯/১১ এর পরে যেমন আমরা আর আগের বিশ্বকে পাইনি, তেমনি ২০২০ এর আগের পৃথিবীকেও আগামী বিশ্ব আর পাবে না।
ছবি: ফিরোজ আহমেদ

দুনিয়া কাঁপানো ২০২০। পৃথিবীর জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সর্বোপরি রাজনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে এর অদৃশ্য ছায়া। এটা কি মানব তৈরি না অন্য কোনো জীব-জন্তু থেকে? কিংবা কোনো ‘কন্সপিরেসি থিওরি’ নিয়ে এ লেখা নয়। ৯/১১ এর পরে যেমন আমরা আর আগের বিশ্বকে পাইনি, তেমনি ২০২০ এর আগের পৃথিবীকেও আগামী বিশ্ব আর পাবে না।

এবার নিজের দেশের কথায় ফিরে আসি। আমার দীর্ঘ ও বিচিত্র অভিজ্ঞতায় নতুন কটি বিষয় উল্লেখ করতে এই লেখার প্রয়াস।

মানুষের চরিত্র বদলানো নাকি খুবই কঠিন কাজ। ‘পাহাড়কেও হেলানো যেতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বভাবকে?’ স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্তৃপক্ষ দিনে দিনে একটা বিশেষ চরিত্র নিয়ে বড় হয়েছে। বছরের পর বছর বুড়িগঙ্গার পানি ঘোলা থেকে আরও ঘোলা হয়েছে। জনগণের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সমাজ-সংস্কার-অর্থনীতি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তা একাধিক অর্থনীতিবিদ বলে গেলেও, এখনো স্বাস্থ্য-প্রেস ব্রিফিংয়ে পরিষ্কার করে কথা বলা হয় না। ধরুন করোনা আক্রান্ত মৃতদেহের প্রসঙ্গ! অথবা খবরের কাগজ এর গ্রহণযোগ্যতা অর্থাৎ কিনা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত! অথবা বিভিন্ন ধরনের মাস্ক সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তথ্য। এসবসহ আরও কিছু প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরিষ্কারভাবে তথ্য জানতে চায় জনগণ।

স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে জড়িত একটা বড় অংশ ইতিমধ্যেই এর শিকারে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যেই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে ২৫ শতাংশ চিকিৎসা কর্মী কোনো পিপিই পাননি। আর পিপিই এর মান নিয়ে যথেষ্ট কথা ভেসে বেড়াচ্ছে, যা নিয়ে কিছু বলার ইচ্ছে নেই। ডাক্তার-নার্সদের আবাসন কিংবা মানসম্পন্ন খাবারের ব্যবস্থা আদৌ কি সম্ভব? হয়তো এখনও বলার সময় আসেনি।

স্বীকার করছি লক্ষণসহ ২০ শতাংশ এবং পাঁচ শতাংশ গুরুতর আক্রান্তদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু এটাও তো সত্যি এর চেয়ে কয়েকগুণ সাধারণ রোগী ভয়ানক বিপদে পড়েছেন এবং পড়বেন। করোনা-বিহীন এসকল অসুস্থ মানুষদের মৃত্যুর দায় কে নেবে? ‘কমনওয়েলথ গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিস (Commonwealth Global Burden of Disease)’ এর প্রতিবেদন বলছে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ টু ডায়াবেটিস, স্ট্রোক, হৃদযন্ত্রের অসুখ; গত আড়াই দশকে বাংলাদেশে মারাত্মক বেড়েছে। বেড়েছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে অকালমৃত্যু। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত অকাল মৃত্যুর হার এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি এখন বাংলাদেশে। করোনা ভিন্ন অসুস্থ রোগীদের বাঁচাতে হলে পর্যায়ক্রমে লকডাউন ধাপে ধাপে শিথিল না করে উপায় কী? অবশ্যই সামাজিক দূরত্বের মানদণ্ড, মাস্ক, ক্যাপ, গ্লাভস এবং জুতা সঠিক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের জীবনযাপনকে ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে মহামারির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। আমাদের চিকিৎসকদের আরও কাজে লাগানো যেতে পারে। অন্তত বিকেল থেকে রাত ৯টা অব্দি তাদেরকে তাদের ব্যক্তিগত কর্মস্থলে বসার ব্যবস্থা করুন। রোগীদের জন্য সে সময় বিশেষ বাস-ট্যাক্সি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাও কঠিন নয়। আশা এবং মানবিকতা, মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। আসুন, শুধু আতঙ্কের কথা না বলে সতর্কতার এবং ভাল-বাস্তব দিনের কথা বলি।

এটা কিন্তু ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু নয়। এখন ২০২০। চিকিৎসা বিজ্ঞান একদম হেলাফেলা করবার স্থানে নেই। আমরা ‘তাইওয়ান–কোরিয়ার’ মডেল অথবা ‘তুরস্ক–সুইডেনের’ মডেল, এবং ভিয়েতনামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে পারি।

আমাদের বাংলাদেশের প্রচুর ডাক্তার যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে কর্মরত। সেসব দেশে মহামারী প্রবলভাবে আঘাত হেনেছে। তারা তাদের প্রত্যক্ষ আলোকে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চান। জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে চার-পাঁচজন বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ আছেন, তাদেরকে কথা বলতে দিন।

ইতিমধ্যেই কিন্তু কেউ কেউ বলছেন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় চলমান লকডাউন পদ্ধতিতে এই মহামারি আরও দীর্ঘায়িত করছে। এরকম মত প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মহামারি বিশেষজ্ঞ নট উইটকোভস্কি। তিনি নিউইয়র্ক সিটির রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব পরিসংখ্যান, মহামারিতত্ত্ব ও গবেষণা ডিজাইন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক। প্রেস অ্যান্ড পাবলিক প্রোজেক্টের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘যদি আমরা জনগণকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে দিতাম। বিপদ কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবচেয়ে অসুস্থদের সহায়তা দিয়ে যেতাম তাহলেই বরং করোনাভাইরাসকে নির্মূল করা সহজ হতো সবাই যা করছে সেটি হলো বক্ররেখাটিকে সমতল করার চেষ্টা। আমি বুঝতে পারছি না কেন এমনটা করা হচ্ছে। যখন আপনি বক্ররেখাকে সমতল করেন তখন আসলে আপনি একে প্রশস্ত করে আরও দীর্ঘায়িত করলেন। আর একটা শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগকে আমি বিনা কারণে জনগণের মধ্যে দীর্ঘায়িত করার কোনো যুক্তি দেখছি না’। বাংলাদেশের কোন কোন ভাইরোলজিস্ট (বি.এস.এম.এম.ইউ) বিশ্বাস করেন ইতিমধ্যে দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ লোকের হয়তো রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তারা এন্টিবডি পরীক্ষার গুরুত্বের কথা বলছেন। ডা. আব্দুল্লাহও এন্টিবডি পরীক্ষার বিরুদ্ধে নন।

সময়টা জটিল, শেষ কথা বলবার এখনো সময় আসেনি। তাই এখন সবার কথাই শুনতে হবে।

স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। ইতিমধ্যেই তেলের মূল্য ইতিহাসে এই প্রথম মাইনাসে চলে গেছে। জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সম্মতিক্রমে, ধাপে ধাপে এলাকাভিত্তিক লকডাউন প্রত্যাহার করলে সাথে সাথে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এবং ধীরে ধীরে অর্থনীতির সচলতার পথও হয়তো খুঁজে পাবো আমরা। ধীরে ধীরে অর্থনীতির একটি-দুটি চাকাতো চলতে শুরু করবে! নইলে হয়তো আবারো সেই গান শুনতে হবে আমাদের, ‘তারপর, তার আর পর নেই, নেই কোন ঠিকানা...’। (চলবে...)

ডা. রুবায়ুল মোরশেদ: চিকিৎসক, গবেষক, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠাতা, সম্মান ফাউন্ডেশন

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।) 

Comments

The Daily Star  | English

Extreme heat sears the nation

The scorching heat continues to disrupt lives across the country, forcing the authorities to close down all schools and colleges till April 27.

5h ago