মাস্কের ‘সুযোগ’ নিতে পারে অপরাধীরা

করোনাভাইরাস মহামারিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গোটা বিশ্বেই মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি যেখানে পাবলিক প্লেসে সবাই মাস্ক ব্যবহার করবে। মাস্ক ব্যবহারের সুযোগে ইতোমধ্যেই বেড়েছে অপরাধ। এটি ব্যবহারের ফলে অপরাধীদের অনুসন্ধান ও সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনার সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে সবাই এখন পাবলিক প্লেসে মাস্ক পরেই চলাফেরা করছেন। ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাস মহামারিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গোটা বিশ্বেই মাস্ক ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি যেখানে পাবলিক প্লেসে সবাই মাস্ক ব্যবহার করবে। মাস্ক ব্যবহারের সুযোগে ইতোমধ্যেই বেড়েছে অপরাধ। এটি ব্যবহারের ফলে অপরাধীদের অনুসন্ধান ও সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাস্ক প্রথা ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন।

সিএনএন জানায়, অধিকাংশ পশ্চিমা দেশেই লকডাউন শিথিল করতে গিয়ে মাস্ক ব্যবহার অপরিহার্য করা হয়েছে। মহামারির সময়ে পশ্চিমা রাজনীতিবিদদের অবাক করে দিয়ে অধিকাংশ নাগরিকই করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। তারা সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে চলেছেন, বাড়িতে থেকেছেন। তাই ‘স্বাস্থ্য সচেতন’ নাগরিকদের আতঙ্কিত না করে কীভাবে কোনো অভিযোগ ছাড়াই লকডাউন শিথিল করা যায় তা নিয়ে ভাবছে পশ্চিমা দেশগুলো। এক্ষেত্রে অনেকেই মাস্ক ব্যবহারের নিয়মের দিকে ঝুঁকছেন।

সম্প্রতি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন, ‘লকডাউন থেকে বের হয়ে আসার অংশ হিসেবে আমি মনে করি মুখ ঢেকে রাখা জরুরি।’ জনসাধারণের কাজে ফেরার জন্য ‘আত্মবিশ্বাস’ ফিরে পেতে মাস্ক সাহায্য করবে বলে মনে করেন তিনি।

কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিদ্যার সিনিয়র প্রভাষক ফ্রান্সিস ডডসওয়ার্থ বলেন, ‘মাস্ক পরে থাকার মূল সমস্যা হলো— এটা মুখমণ্ডলের বেশিরভাগ অংশ ঢেকে রাখে। এটা এমন মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেবে যারা অসৎ উদ্দেশ্যে মুখ ঢাকতে চায়। এখন তারা কারো মনে সন্দেহ তৈরি না করেই মাস্ক ব্যবহার করে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে পারবে।’

পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যেই মাস্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। স্পেনে, এমনকি অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে এমন একটি এলাকাতেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত মাসে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জঙ্গি সংগঠন আইএসের পলাতক সদস্য। সিরিয়া থেকে পালিয়ে দক্ষিণ আলমেরিয়ার লুকিয়ে ছিলেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মহামারির সময়ে তিনি সবার নজর এড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাস্কের কারণে তাকে শনাক্ত করা যায়নি।

অপরাধ অনুসন্ধানে জটিলতা

বিশেষজ্ঞরা জানান, জনসাধারণের মাস্ক ব্যবহারের কারণে অপরাধ অনুসন্ধান জটিল হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রচলিত অনুসন্ধান রীতিতে অপরাধীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের চেহারা, মুখমণ্ডলের অবয়বই ব্যবহার করা হয়।

মানুষ বিশেষ করে অন্যের চেহারাই মনে রাখে। পরিচিত মুখ সহজেই চিনতে পারে। এ ছাড়াও, মুখমণ্ডলের অ্যালগরিদমের সাহায্যেও অপরাধী শনাক্ত করা হয়ে থাকে। মাস্ক সংস্কৃতির কারণে এক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।

হাডার্সফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের প্রভাষক এলিধ নোয়েস জানান, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যপ্রদান প্রক্রিয়া নিয়ে ইতোমধ্যেই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কখনো কখনো সিসিটিভি ফুটেজই অপরাধ তদন্তের জন্য একমাত্র অবলম্বন হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা ঠিক জানিনা মাস্ক মানুষের চেহারা শনাক্তকরণের অ্যালগরিদমে কতটুকু প্রভাব ফেলবে।’

এদিকে, একটি চীনা সংস্থা দাবি করেছে যে, তারা এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছে, যা দিয়ে মাস্ক পরা থাকলেও মানুষকে শনাক্ত করা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাস্ক ব্যবহারের সংস্কৃতি অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে পারে। কারণ, মুখ ঢেকে রাখলে মানুষের সন্দেহজনক আচরণ সম্পর্কে জানা যায় না। কারো আচরণ সন্দেহজনক মনে হলেও তা অন্যের কাছে বর্ণনা করা কঠিন।

গত বছর হংকং ও ফ্রান্সে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে মাস্ক পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আইন পাস করা হয়। ডডসওয়ার্থ জানান, এখন মাস্ক ব্যবহারকারীদের নিয়ে পুলিশ দ্বিধায় পড়বে।

তিনি বলেন, ‘পুলিশের পক্ষে সন্দেহজনক কাউকে শনাক্ত করা কঠিন হবে। কাউকে জেরা করার সময় পুলিশকে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিও ভাবতে হবে।’

মহামারি চলাকালীন অনেক দেশে পুলিশ ইতোমধ্যেই অহেতুক হেনস্তার জন্য সমালোচিত হয়েছে। সংখ্যালঘু মানুষের জন্য এটি উদ্বেগজনক। কারণ, অনেক দেশেই পুলিশ সংখ্যালঘুদের যখন-তখন জিজ্ঞাসাবাদ এমনকি সন্দেহজনক মনে হলে গুলি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা

অনেক দেশে মাস্ক বাধ্যতামূলক না হলেও স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে মানুষ স্বেচ্ছায় পাবলিক প্লেসে মাস্ক ব্যবহার করছে। ডডসওয়ার্থ বলেন, ‘সাধারণত, মাস্ক পরা কাউকে দেখে সন্দেহ হলে আমরা অনেক সময় এড়িয়ে যাই। কিন্তু, এখন আপনি বুঝবেন না যে কখন আপনাকে উদ্বিগ্ন হতে হবে, কাকে এড়িয়ে চলতে হবে।’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের মেয়র জোর্জ এলোরজা জানান, যেসব নাগরিকরা মাস্ক পরেন না তাদেরকে ‘সামাজিকভাবে লজ্জিত’ করা উচিত যেন তারা ‘সঠিক লাইনে’ আসেন।

কেউ ক্ষতি করুক বা না করুক বেঁচে থাকার জন্য অন্যের মুখের সংকেত জানাটা জরুরি।

নোয়েস বলেন, ‘যখন আপনি কারো দিকে তাকান, তখন শুরুতেই আপনি তার চেহারা দেখেন। আপনার মস্তিষ্ক তখন ভাবতে শুরু করে, “আমি কি ওকে চিনি? কীভাবে চিনি?” মানুষের চেহারায় তার আবেগ ফুটে ওঠে। যাদেরকে আমরা চিনি তাদের চেহারা দেখেই আমরা নির্ধারণ করে থাকি সে আমার জন্য ক্ষতিকর কি না।’

যেসব দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা আছে, সেসব দেশের জন্য মাস্ক ব্যবহারের নিয়মের কারণে অপরাধ ও সহিংসতা বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।

Comments

The Daily Star  | English

Record job vacancies hurt govt services

More than a quarter of the 19 lakh posts in the civil administration are now vacant mainly due to the authorities’ reluctance to initiate the recruitment process.

8h ago