অল্প কথায় সৌন্দর্য শেখানো মানুষ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আমরা তার কাছে যতটা সময় ধরে শুনতে চাইতাম তার অনেক আগেই তিনি বক্তব্য শেষ করে দিতেন। খুব অল্প কথায় তিনি যা বলতে চান তা বলে ফেলতে পারতেন। তার এই সক্ষমতা আমাদের, তার শ্রোতাদের, আরও বেশি কিছু শোনার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিত।

আমরা তার কাছে যতটা সময় ধরে শুনতে চাইতাম তার অনেক আগেই তিনি বক্তব্য শেষ করে দিতেন। খুব অল্প কথায় তিনি যা বলতে চান তা বলে ফেলতে পারতেন। তার এই সক্ষমতা আমাদের, তার শ্রোতাদের, আরও বেশি কিছু শোনার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিত।

অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে তার বক্তব্যে এত অল্প কথায় এত বেশি কিছু বলার যে ক্ষমতা, তা আমাদের হতবাক করে দিত। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, অনুধাবন করিয়েছেন অল্প কথা কতটা সৌন্দর্যমণ্ডিত। এটা যেমন ছিল তার বক্তব্যে, ঠিক তেমনি ছিল তার লেখায়। আক্ষরিক অর্থেই একটিও অতিরিক্ত শব্দ তিনি ব্যবহার করতেন না। নির্মেদ ভাষা বলতে যা বোঝায়, তার লেখা-বলা ঠিক তেমনি।

তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাকে দেখলেই মন থেকে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হতো। তার কিছু বলতে হতো না। শুধু পাশে থাকলেই তাকে দেখে বিস্মিত হতে বাধ্য হতে হতো। তিনি অনন্য স্নেহ, শালীনতা আর এক বিশেষ উষ্ণতা প্রকাশ করতেন, যা শুধুমাত্র একজন শিক্ষকই পারেন। সত্যিকারের নম্রতার সঙ্গে জ্ঞানের সংমিশ্রণে এই নরম কথার মানুষটির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদনে বাধ্য করতো।

তার একটি উন্মুক্ত দিক ছিল। তার কাছে পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা চাইলে তিনি কাউকে নিরাশ করতেন না। আর তার কাছে পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা পেতে বিশেষ কেউ হওয়ারও দরকার ছিল না। যত পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীই হোক, তিনি তার হাত ছাড়তেন না।

তার কণ্ঠ ছিল যত্ন আর নম্রতায় ভরা। সেই কণ্ঠ ছুঁয়ে দিত গভীরভাবে। তিনি যখন কথা বলতেন,  নীরব হয়ে শুনতে হতো। একেবারে যেন মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা। তার বলা প্রতিটি শব্দে আটকে থাকতে হতো। মনে হতো এর ওপরই নির্ভর করছে জীবন। জীবন এর ওপর নির্ভর না করলেও অন্তত মনের ভেতরে থাকা বেশির ভাগ বিভ্রান্তি দূর করে দেয় তার কথাগুলো।

আমিসহ যারাই তার প্রত্যক্ষ ছাত্র এবং এর বাইরেও আরও অনেকেরই যখনই প্রয়োজন পড়েছে তখনই তার ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছি। একসময় পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র বা নজরুল জয়ন্তী উদযাপন কিংবা সাধারণ গানের অনুষ্ঠান, নৃত্য-নাটক আয়োজন করা এমনকী আলোচনা সভা, বিতর্ক করা অবাধ্যতার নিদর্শন ছিল। তখন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো শিক্ষক আমাদের শক্তি ও নির্দেশনার উত্স ছিলেন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সময়টা সম্ভবত রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা লৌহমানব জেনারেল আইয়ুবের পতন, জেনারেল ইয়াহিয়ার অধীনে আরেকটি সামরিক আইনের শাসন, ছাত্র নেতৃত্বাধীন ১১ দফা আন্দোলন, পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন, নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর বিজয়, সর্বাধিক নাটকীয় ও অভূতপূর্ব অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, শক্তিশালী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপরে একজন মানুষের কণ্ঠের অবিশ্বাস্য প্রভাব, তৎকালীন সংযুক্ত পাকিস্তানের শেষ কয়েকটি নাটকীয় দিন, সংলাপের নামে সময়ক্ষেপণ করে গোপনে অস্ত্র এনে বাঙালির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও বর্বর গণহত্যা, আমাদের আন্দোলন অহিংস থেকে সশস্ত্রতে রূপ নেওয়া, স্বাধীনতার জন্য আমাদের আপামর জনসাধারণকে এক হওয়া এবং দুর্দান্ত বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ দেখেছি। সেই অশান্ত সময়ে শিক্ষকদের মধ্যে যারা আমাদের সমর্থন, উত্সাহ, অনুপ্রেরণা দিয়ে আগলে রেখেছেন, বিভিন্ন উদাহরণ দেখিয়ে আমাদের যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি সমানভাবে প্রিয় ছিলেন।

তিনি কথা বলতেন গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে। অবসর নেওয়ার পরবর্তী জীবনে কেউ যদি তাকে বইয়ের রিভিউ করে দিতে, কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে, একটি নিবন্ধ লিখে দিতে বা কোনো সেমিনারে সভাপতিত্ব করার অনুরোধ করতেন তিনি সাধারণত তাদের ফেরাতেন না। তার মতে, ‘আমার উচিত সবাইকে উত্সাহিত করা।’

১৯৫২ সালে স্কুল ছাত্র থাকলেও তিনি পঞ্চাশের দশকে ভাষা আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি জেনারেল আইয়ুবের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিটি কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেখানকার নেতাদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। আমাদের স্বাধীনতায় ভারত ও অন্যান্য দেশের সমর্থন পেতে তিনি সহায়তা করেছেন।

স্বাধীনতার পর তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং আমাদের সংবিধানের বাংলা সংস্করণ তৈরির কাজে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশনের অংশ ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশের শিক্ষানীতি প্রণয়নে অবদান রেখেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও আদর্শ পুনঃস্থাপনে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। শেখ হাসিনার সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলে তিনি তাতে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দেন এবং নিজে সাক্ষ্যও দিয়েছেন। তার কৃতিত্ব বলে শেষ করা সম্ভব না। এখানে দু-একটি উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি মাত্র।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শিক্ষক হিসেবে ছিলেন শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন। তিনি সকলের জন্য এতটাই উন্মুক্ত ছিলেন যে, কোনো মতামতই তার কাছে আলোচনার অযোগ্য ছিল না এবং কোনো শিক্ষার্থীই তার কাছে অযোগ্য বলে বিবেচিত হত না। তার কাছে শিখতে চায় এমন শিক্ষার্থীদের তিনি সবসময় স্বাগত জানাতেন।

কোথাও তিনি শিক্ষক বা বক্তা হিসেবে কথা বলা শুরু করলে তার উষ্ণ কণ্ঠ সবার মনোযোগ কেড়ে নিত। তার নরম কথামালা অল্প সময়ের মধ্যেই সবাইকে তার কথার প্রতি আগ্রহী করে তুলতো এবং তার সঙ্গে কোনো বিষয়ে যারা আলোচনা করতে আসতেন তাদের উত্সাহিত করে তুলতো।

কোথাও আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যেতো এই অধ্যাপকের ব্যক্তিত্বের অনন্য দিক-তার ধৈর্য। কোনো বাধা না দিয়ে তিনি শিক্ষার্থীর যা কিছু বলার আছে তা বলতে দিতেন। মনোযোগ দিয়ে তা শুনতেন। এরপর তিনি খুব কোমলভাবে ও ধীরে ধীরে যা বলা হয়েছে তার মধ্যে থাকা ভুলগুলো ধরিয়ে দিতেন এবং তা থেকে উত্তরণের পদ্ধতি সম্পর্কে পরামর্শ দিতেন।

আলোচনার সময় কোনোভাবেই মনে হতো না যে তিনি তার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টা করছেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য যে শ্রদ্ধা ও ধৈর্য তিনি দেখিয়েছেন তা সত্যিই অনুকরণীয়-অনুস্মরণীয়।

শিক্ষকতার বাইরে আর কোনো জগৎ নিয়ে তার ভাবনা ছিল না। তার লেখা ও গবেষণার সবই ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য এবং সেই সঙ্গে আরও ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য।

তার নম্রতা ছিল অসাধারণ। অবসর নেওয়ার পর, তার কাছে অনুরোধ নিয়ে যাওয়া প্রায় সবার অনুষ্ঠানেই তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকেছেন। তার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে দিনব্যাপী সেমিনার ও বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিজের বৈশিষ্ট্যযুক্ত ‘হ্যাঁ’ বলে দিতেন। তিনি এই বৈশিষ্ট্যটি তার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন। এই কারণে তাকে যারা ভালোবাসে সবাই তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন।

বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধার মতো তিনিও বর্তমান বাংলাদেশের অনেক কিছুই পছন্দ করতেন না। বৈষম্য, ন্যায়বিচারহীনতা, স্বাধীনতার অভাব, মৌলিক অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা তাকে চরম ব্যথিত করত। তবে একেবারে শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ছিলেন এবং ছোট বা বড় যে কোনো বিজয়ে তিনি আনন্দিত হতেন।

তিনি অনন্য জ্ঞানের ভান্ডার ছিলেন। আমাদের এই সত্য নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে যে তার মতো আর কেউ কখনও হতে পারবে না। সুতরাং তিনি আমাদের কাছে যে বিশ্ব রেখে গেলেন, তা তার স্বপ্নের মতো জ্ঞান ও বুদ্ধিদীপ্ততার সঙ্গে গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব।

পুনশ্চ:

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হারানো খুবই মর্মান্তিক। তবে তার মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে না পারার যে গভীর বেদনা, তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ তার মরদেহ বহনকারী গাড়িতে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে করতে সমাধিস্থ করতে নিয়ে যাবে। এটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, হৃদয় ডুকরে কেঁদে ওঠে যখনই মনে পড়ে সেটা সম্ভব হলো না।

আমার কল্পনায় ভেসে ওঠে শহীদ মিনারে তার কফিনের চারপাশ আমরা ঘিরে আছি। তাকে শেষবারের মতো দেখতে আমরা একত্রিত হয়েছি। হাজারো মানুষ তার মরদেহ কাঁধে তুলে নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানের দিকে যাচ্ছে। আমরাও যাচ্ছি। সেখানে তাকে চিরশায়িত করা হচ্ছে।

আমাদের প্রিয় অধ্যাপক, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক, বন্ধু এই মানুষটির মৃত্যুতে দূর থেকে শোক প্রকাশ করে, দুঃখ প্রকাশ করে, ঘরে থেকে তার আত্মার শান্তি কামনা করে, তাকে বিদায় জানানো আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়। আজ তার প্রতি যে শ্রদ্ধা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি তা যেন আমরা আমাদের কাজের মাধ্যমে তার স্বপ্ন পূরণ করে দেখিয়ে দিতে পারি। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রতি আমাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকবে।

মাহফুজ আনাম, দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক

Comments

The Daily Star  | English

Five Transcom officials get bail in property dispute cases

A Dhaka court today granted bail to five officials of Transcom Group in connection with cases filed over property disputes

28m ago