আম্পানের পর কয়রা

লোনা পানিবন্দি ধ্বংসস্তূপের জীবন

শুনলাম সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে খুলনার কয়রা উপজেলা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। কিন্তু, দূরত্ব ও দুর্গমতার কারণে প্রকৃত সংবাদ জানা কঠিন। ফলে গণমাধ্যমেও তার প্রতিফলন নেই। প্রকৃত অবস্থা দেখতে-জানতে-বুঝতে হবে, শুধু শুনে লেখা যাবে না। যাত্রা করলাম কয়রার উদ্দেশে।
সদ্যজাত শিশু সন্তানকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের এক সদস্য। কিন্তু যাওয়ার এই পথটাই অনিরাপদ। পা পিছলে ঘটতে পারে ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ছবি: দীপংকর রায়

শুনলাম সাইক্লোন আম্পানের আঘাতে খুলনার কয়রা উপজেলা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। কিন্তু, দূরত্ব ও দুর্গমতার কারণে প্রকৃত সংবাদ জানা কঠিন। ফলে গণমাধ্যমেও তার প্রতিফলন নেই। প্রকৃত অবস্থা দেখতে-জানতে-বুঝতে হবে, শুধু শুনে লেখা যাবে না। যাত্রা করলাম কয়রার উদ্দেশে।

গতকাল শনিবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটে খুলনার বয়রা থেকে যাত্রা শুরু। গন্তব্য খুলনা থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরের উপজেলা কয়রা।

গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সঙ্গী বন্ধুর মোটরসাইকেল। ফাঁকা পথঘাট। এগিয়ে চলছি, চারপাশের ক্ষয়ক্ষতি চোখে পড়ছে। তবে, তা অতটা বেশি না। এরই মধ্যে কিছু কিছু দোকানপাট খুলেছে। কিছু মানুষ ঈদের কেনাকাটার জন্য বের হয়েছেন।

খুলনা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে চুকনগর মোড়। সেখান থেকে বামে ঢুকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলা হয়ে কয়রা পৌঁছানো যায়। তালায় পৌঁছে যাত্রাবিরতি নিলাম। ১৫ মিনিট। পাশেই  দুটো আম বাগান, লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।

ছড়িয়ে-ছিঁটিয়ে বাগানজুড়ে পরে আছে কাঁচা আম। কথা হলো মালিকের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এই ঝড়ে তার আড়াই লাখ টাকার আমের ক্ষতি হয়েছে।

তারপর পাইকগাছার ব্রিজের টোল প্লাজায় আরও ১০ মিনিটের যাত্রাবিরতি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করি, ঝড়ে কী কী ক্ষতি হয়েছে। সবার একই কথা, সব হারিয়েছেন এই ঝড়ে।

পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তার কংক্রিটের এক পোলের উপর দাঁড়িয়ে একটি পরিবারের সদস্যরা। ছবি: দীপংকর রায়

দেখলাম পাইকগাছা নদীর পানি অনেক বেড়েছে। আগে কখনো এই নদীতে এত পানি দেখিনি।

যত সামনে এগোচ্ছি, তাণ্ডবের চিত্র দৃশ্যমান। চোখে পড়ে পেঁপে বাগান, সবজি খেত, মাছের ঘের— সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। রাস্তায় এখনো শত শত গাছ পড়ে আছে। স্থানীয়রা কোনোরকমে গাছ কেটে রাস্তার পাশে সরিয়ে রেখেছেন।

উপজেলা সদরে আসার আগে কয়রা আমাদী ও বাঙ্গালী ইউনিয়ন হয়ে আসতে হয়। সেখানে কোথাও পানি দেখিনি। শুকনো মাঠ, মাঠে গরু চরছে শত শত। যদিও মাঠে কোনো ফসল নেই। অতিরিক্ত লবণের কারণে বেশিরভাগ জমিতেই কোনো ফসল ফলে না।

কয়রা সদরে মোটরসাইকেল থেকে নেমে গন্তব্য কপোতাক্ষ কলেজ।

কিন্তু যাব কীভাবে? সেখানে হাঁটুপানি। এক পথচারী জানালেন, শুধু এখানে না, উপজেলা চত্বরও পানিতে ডুবে আছে। পরিচিত স্থানীয় সাংবাদিক সিরাজউদ্দৌলা লিংকনের সঙ্গে দেখা হলো। তাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখতে।

কয়রার সবচেয়ে বড় ভাঙ্গন হরিণখোলা। সেদিকেই যাব ঠিক করলাম। সেটা প্রায় নয় কিলোমিটার দূরে। ওই দিকে যাব শুনে স্থানীয়রা জানান, পানির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

আম্পানের প্রভাবে বাঁধ ভেঙ্গে ডুবে যাওয়া নয় কিলোমিটার কয়রা-বেদকাশী সড়কের পাশে বিধ্বস্ত এক ঘরের সামনে রাস্তায় খড় ফেলে পানিতে ধুয়ে যাওয়া মাটি আটকানোর চেষ্টা। ছবি: দীপংকর রায়

বেড়িবাঁধ ভেঙে এখানকার রাস্তা সব পানির নিচে চলে গেছে। জোয়ারের সময় রাস্তা ডুবে যাচ্ছে, আবার ভেসে উঠছে ভাটার সময়।

সুতরাং পোশাক বদল করে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্লাস্টিকের জুতো, মোবাইলের প্লাস্টিকের কাভার এবং পানি থেকে নিজের সরঞ্জাম বাঁচাতে যথাসম্ভব প্রস্তুতি নেই। মোটরসাইকেল, ল্যাপটপ আর ব্যাগ রেখে আসি কয়রা ডাকবাংলোর এক রুমে।

তারপর রওনা হই ওই সড়ক ধরে। কিছুদূর যাওয়ার পরই দেখি রাস্তা পানির নিচে।  ২ নম্বর কয়রা গ্রাম দিয়ে পায়ে হেঁটেই রওনা দেই।

কমপক্ষে চারটি বড় বড় বিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পেলাম, পানির নিচে গ্রামের পর গ্রাম। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় জোয়ারের পানি প্রবল আকারে বাঁধ ভেঙে ঢুকেছে। অমাবস্যার জন্য পানি বেশি হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে আরও প্রায় চার কিলোমিটার বাকি। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি।

চারদিক যেন ধ্বংসস্তূপ। মানুষ ঘরের মালপত্র সরাচ্ছে, ছাগল-গরু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ সড়কে উঁচু জায়গায় টং করে বাস করার চেষ্টা করছে।

এক দম্পতি অর্ধেক ডুবে যাওয়া টিউবওয়েল থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করছেন। এই এলাকায় প্রায় সব খাবার পানির উৎস লবণাক্ত পানির কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। এক কিশোর বাড়ি থেকে আশেপাশে যাওয়ার জন্য কলার ভেলা তৈরি করেছে। ছবি: দীপংকর রায়

এগিয়ে যেতে যেতে বেলা আড়াইটার দিকে পৌঁছে যাই হরিনখোলা ঘাটা এলাকাতে।

রুহুল কুদ্দুস শেখের বয়স ৭২। হরিণখোলায় একসময় তার ২০ বিঘা জমি ছিল। কপোতাক্ষর ভাঙ্গনে সব হারিয়েছেন তিনি। পাঁচ বার বাড়ি পাল্টাতে হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। এখন ২ নম্বর কয়রায় কোনোরকমে বাড়ি তুলে থাকেন। তিনি বললেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষতির কাছে আইলা সিডরের ক্ষতি কিছুই না।’

তার কাছে জানা গেল, ২০০৯ সালে সাইক্লোন আইলা আঘাত হানার পর এই এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম লোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। চার বছর ধরে মানুষ বাস করেছে লোনা পানিতে বেষ্টিত হয়ে। বাঁধগুলো ঠিক হয়েছে মাত্র তিন বছর হলো। এখন আবার আগের মতো অবস্থা।

এবার লবণ পানির ক্ষতি কত বছর বয়ে বেড়াতে হবে কে জানে!

Comments

The Daily Star  | English

A different Eid for residents of St Martin's Island

Number of animals sacrificed half than usual, price of essentials high

36m ago