করোনায় এক অকুতোভয় নারী রোজিনা আক্তার

করোনাভাইরাসের হটস্পট নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। কিন্তু, প্রতি সপ্তাহেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মৃতদের দাফন কিংবা সৎকার করা নিয়ে দুর্ভোগে পরতে হচ্ছে স্বজনদের।
নারীদের মরদেহ গোসল করানোর কাজে নিয়োজিত রোজিনা আক্তার (ছবিতে ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাসের হটস্পট নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। কিন্তু, প্রতি সপ্তাহেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মৃতদের দাফন কিংবা সৎকার করা নিয়ে দুর্ভোগে পরতে হচ্ছে স্বজনদের।

স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলো মৃতদেহ দাফন ও সৎকার করে থাকলেও নারীদের মরদেহ গোসল করানো নিয়ে প্রতিনিয়ত বিপাকে পরতে হয়। এ পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসেছেন নারায়ণগঞ্জে সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দুই বারের নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্য রোজিনা আক্তার।

রোজিনা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আগে কখনো মরদেহ গোসল করানোর অভিজ্ঞতা না থাকলেও শিখে নিয়েছি।’

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ২৭ জন নারীর মরদেহ গোসল করিয়েছেন তিনি। এছাড়া, তার নেতৃত্বে গঠিত মরদেহ দাফন কমিটি আরও ৫৯টি মরদেহের শেষকৃত্য করেছে।

এনায়েতনগর ইউনিয়নের নারী সদস্য হলেও, মরদেহ গোসল করাতে ইউনিয়নের বাইরেও গিয়েছেন তিনি। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই তিনি মাস্ক, লিফলেট ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন। তার নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জে মরদেহ দাফনে গঠন করা হয় ‘মাসদাইর যুব কল্যাণ সংঘ (এমজেকেএস)-টিম রোজিনা কোভিড-১৯’।

রোজিনা আক্তার পশ্চিম মাসদাইর এলাকার মরহুম আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী। তার দুই ছেলের মধ্যে রেজোয়ান আহমেদ রাজু বড় আর রায়হান আহমেদ ছোট।

রোজিনা আক্তার বলেন, ‘প্রথম যখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়, আর কাউন্সিলর খোরশেদ ভাই করোনায় মৃতদের মরদেহ দাফন ও সৎকারের কাজ করছিলেন তখন ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেই, “যদি কোনো মা-বোন মারা যায় তাহলে গোসলের কাজটি আমি সম্পূর্ণ করব।” সে সময়, নারীরা মারা গেলে কেউ এগিয়ে আসছিল না কিংবা নারীদের গোসল করাতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল।’

তিনি বলেন, ‘২৫ এপ্রিল থেকে মৃত নারীদের গোসল করানো শুরু করি। সেদিন শহরের আমলাপাড়া এলাকায় হোসনে আরা বেগম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মাসদাইর কবরস্থানের মনি আক্তারকে, যিনি নারীদের মরদেহ গোসল করান, তিন ঘণ্টা ধরে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন কাউন্সিলর খোরশেদ ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলেন হোসনে আরা বেগমের মরদেহ গোসল করানোর জন্য। তখন আমি যাই।’

‘আর তারপর থেকে এখন পর্যন্ত ২৭ জন নারীর মরদেহ গোসল করিয়েছি,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘এমনও হয়েছে এক নারী মারা গেছেন তার মরদেহ গোসল করানোর জন্য বাইরে বের করতে দেয়নি প্রতিবেশীরা। তারা বলেন, বাথরুমে গোসল করান। শেষে বারান্দায় গোসল করিয়েছি। আবার মৃতের পরিবার বলছে, গোসল করিয়ে জায়গা পরিষ্কার করে দিয়ে যান।’

রোজিনা আক্তার বলেন, ‘এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। মারা গেলে আত্মীয়রা বাড়িতে আসে, কিন্তু মরদেহ ধরতে চায় না। স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও, ডেকে পাঠায় যাওয়ার জন্য। যতদিন পর্যন্ত করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হবে আমার আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবো।’

তিনি এখনও করোনায় আক্রান্ত হননি বলে জানান রোজিনা আক্তার। তিনি বলেন, ‘একবার পরীক্ষা করিয়েছি। তখন রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। তারপর আর নমুনা দেইনি। কোনো উপসর্গও নেই। আর আমি পরিবার থেকে আলাদা থাকছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছি।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নারীর মরদেহ দাফনে আমরা সব থেকে বেশি সমস্যায় পরেছি গোসল করানোর জন্য। করোনার ভয়ে গোসল করানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসছিল না। তখন রোজিনা আক্তার আসায় আমাদের সব কিছু সহজ হয়ে যায়। এখনও পর্যন্ত আমরা যখনই তাকে জানিয়েছি মরদেহ গোসল করাতে হবে, সেটা রাত কিংবা দিন, সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছেন। তিনি একজন করোনার অকুতোভয় নারী।’

এনায়েতনগর ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জ এলাকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাসিমা বেগম (৪০)। আর তারও গোসল করান রোজিনা আক্তার।

নাসিমা বেগমের ননদ এনায়েতনগর ইউনিয়নের সাবেক নারী সদস্য সখিনা বেগম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে মরদেহ দিবে না বলে জানায়। রোজিনা আপার জন্যই আমার ভাবির মরদেহটা পেয়েছি। কিন্তু করোনার ভয়ে আমরাই কাছে যাইনি। কিন্তু, তিনি ভাবিকে গোসল করিয়েছেন। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা করোনা বিষয়ক ফোকাল পারসন ও সদর উপজেলার স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রোজিনা আক্তার মহৎ কাজ করছেন। আমাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। আমরা তাদেরকে নমুনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে রোগী ভর্তি, চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। এছাড়াও, তিনিসহ তার টিমের কেউ করোনায় যেন আক্রান্ত না হয়, সে জন্য তাদের স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত তারা সুস্থ আছেন।’

Comments

The Daily Star  | English

Sea-level rise in Bangladesh: Faster than global average

Bangladesh is experiencing a faster sea-level rise than the global average of 3.42mm a year, which will impact food production and livelihoods even more than previously thought, government studies have found.

8h ago