সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের তোড়জোড়!

মৌলভীবাজার জেলার একটি সংরক্ষিত বনের ঠিক মধ্যবর্তী ভূমি চা-বাগান সম্প্রসারণের জন্য একটি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনকারী কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।
Reserve Forest.jpg
মৌলভীবাজারের জুড়ীর হাজারগজ সংরক্ষিত বন। লাল সীমানা চিহ্নিত বনের মধ্যবর্তী অংশটিতে চা-বাগান সম্প্রসারণের তোড়জোড় চলছে। ছবি: সংগৃহীত

মৌলভীবাজার জেলার একটি সংরক্ষিত বনের ঠিক মধ্যবর্তী ভূমি চা-বাগান সম্প্রসারণের জন্য একটি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনকারী কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।

ত্রুটিপূর্ণ ভূমি জরিপ এবং তা সংশোধনে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বনবিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের মধ্যেই বেশ কিছু কোম্পানি এই ২১৭৪.৩৫ একর ভূমি ইজারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তবে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেশের প্রথম সারির একটি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাইব্যুনালে চলতে থাকা মামলার নিষ্পত্তি সাপেক্ষে ইজারাপ্রাপ্তির গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সরকারি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দাবি করে বনবিভাগ এবং পরিবেশ আন্দোলনে সংশ্লিষ্টরা জানান, এই বনভূমি ইজারা দেওয়া হলে পর্যায়ক্রমে তা পুরো বনাঞ্চলকেই ধ্বংস করে দেবে।

উপ-বন সংরক্ষক এবং সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এসএম সাজ্জাদ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বনের মধ্যবর্তী এই অংশ যদি বন থেকে বিচ্ছিন্ন করে চা-বাগান সম্প্রসারণ বা অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যে ইজারা দেওয়া হয়, তাহলে তা একসময় এই সংরক্ষিত বন এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ বনভূমিকে ধ্বংস করে দেবে।’

৯৯ বছর আগে ১৯২১ সালের ২৪ অক্টোবর তৎকালীন আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার অ-জরিপকৃত ১২০১৯ একর বনভূমিকে ‘হারারগজ রিজার্ভ ফরেস্ট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

যেহেতু বনের জায়গার পরিমাপ তখন করা যায়নি, তাই এই রিজার্ভ ফরেস্টের ভূমির পরিমাপ আনুমানিক এবং তা অ-জরিপকৃত বনভূমি হিসেবেই নথিভুক্ত হয়। তবে এর সীমা চারদিকের প্রাকৃতিক অবস্থাকে নির্দেশ করেই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

আসাম ফরেস্ট রেগুলেশন ১৮৯১ এর অধীনে রিজার্ভ ফরেস্ট বা সংরক্ষিত বন ঘোষণার পর আরও কয়েকশত একর জায়গা এ বনভূমির অধীনে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ১৯৩৮ সাল নাগাদ এর অ-জরিপকৃত মোট বনভূমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭৬৮.৮০ একরে।

১৯৩৩ সালে পার্শ্ববর্তী পৃথিমপাশা এস্টেটের দায়ের করা একটি সত্ত্ব মামলার রায়ে ১৯৩৭ সালে ১৯৮৭.৮৫ একর বনভূমি এই সংরক্ষিত বন থেকে খারিজ করে এস্টেটকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে জমিদারি প্রথা বাতিলের পর ১৯৫৬ সালে এস্টেটের সব ভূমি রাষ্ট্রায়ত্ব হয় এবং ১৯৬০ সালে এই ১৯৮৭.৮৫ একর জায়গাসহ মোট ৫৩৩৭ একর ভূমি বনবিভাগকে হস্তান্তর করা হয়।

১৯৩৮ সালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে খারিজ হওয়া ১৯৮৭.৮৫ একর বনভূমি পরে সংরক্ষিত বনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে কোনো নথি পাওয়া যায়নি। তবে এই ভূমিসহ এই অঞ্চলের সব বনাঞ্চল প্রায় এক শতক ধরে বন হিসেবেই রক্ষণাবেক্ষণ করছে বনবিভাগ।

ভূমি জরিপের ভুল

২০১৩ সালে ডিজিটাল ভূমি জরিপের সময় বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলায় অবস্থিত এই সংরক্ষিত বনের মধ্যবর্তী ২১৭৪.৩৫ একর ভূমি জেলা প্রশাসনের ‘খাস’ খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এর শ্রেণি পরিবর্তন করে বনভূমির পরিবর্তে লেখা হয় ‘টিলা রকম ভূমি’।

এই জরিপে সংরক্ষিত বনের অ-জরিপকৃত ভূমির সঠিক পরিমাপ ১৩৬৪৮.০১ একর পাওয়া গেলেও, জরিপে মাত্র ১১৪৭৩.৬৬ একর ভূমি রেকর্ডভুক্ত হয় বনবিভাগের নামে।

সেসময় এর প্রতিবাদে বনবিভাগ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠায়।

উপ-বন সংরক্ষক এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘সম্ভাব্য সব ভুলই এই ডিজিটাল জরিপে হয়েছে। বনের সীমা অ-জরিপকৃত হলেও, এর চৌহদ্দি নির্ধারিত ছিল, কিন্তু তারা তা বিবেচনা করেনি। তার ওপর অসৎ উদ্দেশ্যে বনের মধ্যবর্তী ভূমিকে খাসভূমি হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং সে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে টিলা রকম ভূমি উল্লেখ করেছে, যাতে তা ইজারা দেওয়া যেতে পারে।’

বিষয়টি সুরাহা করতে ২০১৪ সালে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আব্দুল মান্নান এই সংরক্ষিত বন পরিদর্শন করেন।

এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে তিনি বনবিভাগের দাবির পক্ষে সম্মতি জানিয়ে উল্লেখ করেন যে, ভূমি জরিপের বনের শ্রেণি ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই বনাঞ্চলে ১৯৩৩ সালের পৃথিমপাশা এস্টেটের মামলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করা ১৯৮৭.৮৫ একর ভূমিই কেবল খাসভূমি হিসেবে নথিভুক্ত করা যেতে পারে, বনের মধ্যবর্তী অংশ থেকে নয়।

তবে বনভূমি বা খাসভূমি- এই বনাঞ্চলের সব ভূমিকেই ইজারা দেওয়া যাবে না মর্মে পরিষ্কার করে উল্লেখ করতে হবে বলেও প্রতিবেদনে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

এই ইচ্ছাকৃত ভুলের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসকেও নির্দেশনা প্রদান করেন।

কিন্তু তার নির্দেশনার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি, বরং এরমধ্যেই তড়িঘড়ি করে এই ভূমি ‘খাস’ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ হয়।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালে এই রেকর্ড সংশোধনের জন্য মৌলভীবাজার ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে জেলা প্রশাসন, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ও জুড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে বনবিভাগ।

ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ

২০১৩ সালের ডিজিটাল জরিপে সংরক্ষিত বনের এই ভূমি খাসভূমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বাণিজ্যিক চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তা ইজারা নেওয়ার আগ্রহ দেখায়।

সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এই ভূমি দীর্ঘমেয়াদে ইজারা নিতে আগ্রহ পোষণ করে। এই গ্রুপের অধীনে থাকা তিনটি কোম্পানির দুটির নামে ১০০০ একর করে এবং মূল কোম্পানির নামে আরও ১৬৯.৫৯ একর ভূমি চা-বাগান সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ইজারা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়।

এ বছর ২৯ জানুয়ারি ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি ভূমি সচিব বরাবর একটি চিঠি পাঠান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১৪ জসীম উদ্দীন হায়দার।

এ চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু এ জমি নিয়ে একটি মামলা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল মৌলভীবাজারে চলমান, তাই মামলা নিষ্পত্তি সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে মর্মে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন যে, আবেদনকৃত ভূমিতে চা-বাগান করলে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশই লাভবান হবে এবং বাগান সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

এ সংক্রান্ত সব চিঠিপত্র ও নথি সংগ্রহ করেছে দ্য ডেইলি স্টার।

এর আগে, ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জুড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) এই ভূমি পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে তিনি এই ভূমি পতিত, জনবসতিহীন এবং অনাবাদী হিসেবে উল্লেখ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয় গত ৯ ও ২৩ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি বৈঠক করে, তবে সে বৈঠকের রেজ্যুলেশন প্রকাশ না হওয়ায় তার সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাকছুদুর রহমান পাটোয়ারী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে, যারা এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দ্রুত জমা দেবে। প্রতিবেদনের পরামর্শ অনুযায়ী আইনগতভাবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়, তাই নেওয়া হবে।’

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মল্লিকা দে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মামলাটি যেহেতু বিচারাধীন আছে, তাই এ সংক্রান্ত সব কাগজপত্রই ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া আছে এবং আমরা আশা করছি যে, মামলার রায়ে এটি যেভাবে রেকর্ড হয়েছে সেভাবেই থাকবে। যেহেতু বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে, তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা প্রদান করবেন, আমরা তাই পালন করব।’

ট্রাইব্যুনালে বনের ভূমি সংক্রান্ত মামলা চলাকালে এ রকমের সুপারিশমূলক চিঠি মামলার রায়কে প্রভাবিত করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেন, ‘চা-বাগান সম্প্রসারণ নয়, বরং বন রক্ষা সরকারের সাংবিধানিক কর্তব্য।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এই প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘দেশে চা-বাগান অনেক আছে, কিন্তু এ ধরণের বন একটিই। তাই সরকারের উচিত গুরুত্ব দিয়ে বন রক্ষা করা।’

বনবিভাগ ও প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলা এই বনভূমি সাগরনাল এবং গাজীপুর নামের দুটি বন বিটের অংশ।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ৩২৭৯ একরের সুবিশাল সাগরনাল প্রাকৃতিক বাঁশ-বাগানের অনেকাংশ এবং ৭৮০ একরের গোগালিছড়া প্রাকৃতিক বাঁশ-বাগানের প্রায় পুরোটাই এই ভূমির মধ্যে অবস্থিত।

এ ছাড়াও, এখানে বেত-বাগান, সামাজিক বনায়নে সৃষ্ট নতুন বনভূমি, প্রাকৃতিক জলধারা এবং অনন্য জীববৈচিত্র রয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বনের জায়গা খাস খতিয়ানভুক্ত করা নিয়ে এ ধরণের দ্বন্দ্ব সারাদেশেই চলছে এবং আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে বনের ভূমি বনবিভাগের অধীনে বন হিসেবেই ফিরে আসে।’

তিনি বলেন, ‘হাজারগজ সংরক্ষিত বনের এই ভূমি সংক্রান্ত মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে এ মুহূর্তে কিছু জানা নেই। এই জায়গা ইজারা দেওয়ার কোনো উদ্যোগের বিষয়েও আমি আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’

Comments

The Daily Star  | English