যেভাবে নদীর একটি অংশের মালিক হলেন এমপি আসলামুল হক

ঢাকার বসিলা এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের জন্য বুড়িগঙ্গা নদী ও নদীর তীরবর্তী জলাভূমির ৫৪ একর জায়গা ভরাট করেছেন ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য। এমনটিই বলা হয়েছে একটি সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে।

ঢাকার বসিলা এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের জন্য বুড়িগঙ্গা নদী ও নদীর তীরবর্তী জলাভূমির ৫৪ একর জায়গা ভরাট করেছেন ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য। এমনটিই বলা হয়েছে একটি সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে।

জাতীয় নদী সংরক্ষণ কমিশনের (এনআরসিসি) নেতৃত্বে এই তদন্তে দেখা যায়, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হক ২০১০ সাল থেকে এই অবৈধ কার্যক্রম শুরু করেন।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়, এই জমি ভরাটের কারণে প্রায় ১৪ কিলোমিটার নদী মরে যাচ্ছে এবং জমি পুনরুদ্ধার করে নদীকে তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে।

ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) রেকর্ড হিসেবে পরিচিত প্রাচীনতম জমির রেকর্ড অনুযায়ী, এই ৫৪ একরের মধ্যে অন্তত ১২ দশমিক ৭৮ একর জায়গা বুড়িগঙ্গার অংশ ছিল। এই জরিপ শেষ হয়েছিল ১৯৪০ সালে।

এনআরসিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬২ সালে শেষ হওয়া পুনর্জরিপে এই নদীর জমি অবৈধভাবে বেসরকারি সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ড করা হয়।

৫৪ একরের মধ্যে বাকি জমি নদীর জলাভূমি এবং ঢাকা মহানগরীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) বন্যা প্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী বিনা অনুমতিতে বন্যা প্রবাহ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যাবে না।

এই আইন প্রণেতা অবৈধভাবে নদীর জলাভূমি ভরাট করে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কারখানা নির্মাণ করেন। এতে করে নদীর পানি প্রবাহে বাধা তৈরি হয়। যা পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে তদন্ত কর্তৃপক্ষ।

২০০৯ সালের হাইকোর্টের রায় অনুসারে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে এনআরসিসি। সেই রায়ে সিএস রেকর্ডের ভিত্তিতে নদীর জায়গা পরিমাপের নির্দেশ দেওয়া হয় সরকারকে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সাত দিনের মধ্যে আরিশা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সকল স্থাপনা সরিয়ে নিতে গত ২৩ আগস্ট চিঠি দেয় আসলামুল হককে। এই চিঠি পাওয়ার পর তিনি গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।

এই জমি কখনো নদীর অংশ ছিল কি না, তা জানতে সমীক্ষা চালানোর জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র কাছেও আবেদন জমা দিয়েছিলেন এই সংসদ সদস্য।

তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে রয়েছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক, বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), এসি ল্যান্ড (কেরানীগঞ্জ সার্কেল), এসি ল্যান্ড (সাভার সার্কেল) এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান।

সাধারণ পদ্ধতির জরিপ এবং স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশনের (স্পারসো) সহায়তায় রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরে কমিশন জানতে পারে যে, আসলে এই অঞ্চলে ৫৪ দশমিক শূন্য এক একর জমি ভরাট করা হয়েছে। যা সংসদ সদস্যের আবেদনে উল্লেখ করা পরিমাণের চেয়ে দুই একর বেশি।

২০০৮ সালে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে এটি নদীর অংশ ছিল। তবে ২০১১ সালে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে সংসদ সদস্য আসলামুল হক বুড়িগঙ্গা নদী ভরাট করা শুরু করেন এবং ২০১৫ সালে নদীর বেশখানিক অংশ ভরাট করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে তোলা চিত্রে দেখা যাচ্ছে সেখানে কিছু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই সংসদ সদস্য দাবি করেছেন, তিনি ১১০ বছরের জমির নথি পরীক্ষা করে আসল মালিকদের কাছ থেকেই জমি কিনেছিলেন। ছবি: পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

এনআরসিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আসলামুল হক ২০১৬ সালে ৮৪ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য বেজা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি পরিকল্পনা জমা দেন।

এনআরসিসির চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার গত রোববার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাকি ৩০ একর জলাভূমি তিনি কীভাবে পাবেন তা তদন্তের পরামর্শ দিয়েছি আমরা।’

তিনি জানান, আরএস জরিপের সময় নদীর একাংশ তারা কীভাবে ব্যক্তিগত জমি হিসেবে রেকর্ড করে নিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখার জন্য ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরকেও অনুরোধ করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোকে ২০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিশন। এতে ভরাট করা জমি থেকে সব ধরনের কাঠামো এবং মাটি সরিয়ে পুনরায় এটিকে মূল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

দ্য ডেইলি স্টারের কাছে ২০০৮ সালে তোলা একটি স্যাটেলাইট চিত্র রয়েছে, যেখানে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে যে বসিলা ব্রিজের পাশের জমিটি বুড়িগঙ্গা নদীর অংশ।

২০১১ ও ২০১৫ সালে নেওয়া একাধিক স্যাটেলাইট চিত্র থেকে দেখা যায়, কীভাবে কয়েক বছর ধরে নদীর জলাভূমি ভরাট হয়েছে। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য কাঠামো নির্মাণ করেছেন আসলামুল হক।

২০০৮ সালে আসলামুল হক ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনে তার সম্পদের বিবরণী জমা দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয় রাজধানীর উপকণ্ঠে তার মোট ৬১৫ ডেসিমেল (প্রায় ছয় একর) জমি রয়েছে।

এর পরের সাধারণ নির্বাচনের সময় ২০১৪ সালে তার সম্পদের বিবরণীতে বলা হয় তার জমির পরিমাণ ১৪ হাজার ১৭৮ ডেসিমেল (১৪১ একরও বেশি)। তবে, এই জমি কোন জায়গায় তা বলা হয়নি।

গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে জানান, তিনি ২০১০ সাল থেকে কেরানীগঞ্জের ওয়েশপুর ও ঘাটাচর মৌজা এবং সাভারের হযরতপুর মৌজার বিভিন্ন জমির ‘মূল মালিকদের’ কাছ থেকে ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি’ কিনতে শুরু করেন মাইশা পাওয়ার প্ল্যান্ট ও আরিশা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য।

লিখিত বক্তব্য পড়ার সময় তিনি এনআরসিসির চেয়ারম্যানকে জিয়াউর রহমান ও এরশাদের অনুসারী বলে উল্লেখ করে এবং জমির জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে জানান।

গতকাল সোমবার দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে নদী কমিশনের রিপোর্টটি প্রস্তুত করা হয়নি। ‘এই জমি যদি নদীর অংশ হয় তাহলে কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে নেবে। তবে, এর জন্য সঠিক জরিপ করতে হবে’, বলেন তিনি।

সে সময়ও তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি এই জমিগুলো মূল মালিকদের কাছ থেকেই কিনেছেন।

দুটি নির্বাচনের হলফনামায় সম্পত্তির বিবরণীতে ঘোষিত জমির পরিমাণের পার্থক্যের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ২০১৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে এ বিষয়ে সব জানিয়েছি।’

চলতি বছরের ১২ মার্চের আগে এই অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে আসলামুল হক জানিয়েছিলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি এবং দাবি করেন যে তার জমি নদীর অংশ নয়। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে পরিচালিত আরএস জরিপ রেকর্ডে এটি ‘নাল’ (অনাবাদী) হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল।

তিনি দাবি করেন, ২০১১ ও ২০১৫ সালে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়পত্র দিলেও ‘এখন তারা আপত্তি করছে’।

সম্প্রতি বদলি হয়ে যাওয়া বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন জানান, তারা কেবল ভাসমান জেটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন।

২০০৯ সালে হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে ভূমি দখলদারদের কাছ থেকে মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুদ্ধার এবং দূষণ থেকে সেগুলো বাঁচানোর জন্য বিস্তারিত ব্যবস্থা বর্ণিত হয়েছিল।

তারপরও সরকারি কর্মকর্তারা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন না করায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর তীরবর্তী এলাকা দখল করতে পেরেছেন বলে জানান বাংলাদেশের পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক এবং ইন্টারন্যাশনাল রিভার কিপারের বাংলাদেশ প্রতিনিধি শরীফ জামিল।

হাইকোর্ট এই নদীগুলোকে সব আইনি অধিকারের অধিকারী বলে ঘোষণা করেছে এবং নদী রক্ষার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে, কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।

‘আমরা নদীর যথাযথ সীমানা নির্ধারণের দাবি করছি।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এনআরসিসি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ করলেই কেবল হাইকোর্টের রায় কার্যকর হবে।’

Comments

The Daily Star  | English

Govt may go for quota reforms

The government is considering a logical reform in the existing quota system in public service, but it will not take any initiative to that effect or give any assurances until the matter is resolved by the Supreme Court, where the issue is now pending.

1d ago