টাকা পাচার: এই আয়েশ করে পায়েশ খাওয়ার দিন কবে শেষ হবে?

সৌদি আরবে হাইওয়ের দু’পাশে তাকালে দেখা যাবে শুধু রুক্ষ, ধূসর মরুভূমি। রোদের তাপে চোখ ঝলসে যেতে থাকে। ঐ ভয়াবহ রোদেই কাজ করে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। এই মানুষগুলোর মধ্যে অধিকাংশই কিন্তু আমাদের বাংলাদেশি ভাই।
প্রতীকী ছবি। স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

সৌদি আরবে হাইওয়ের দু’পাশে তাকালে দেখা যাবে শুধু রুক্ষ, ধূসর মরুভূমি। রোদের তাপে চোখ ঝলসে যেতে থাকে। ঐ ভয়াবহ রোদেই কাজ করে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। এই মানুষগুলোর মধ্যে অধিকাংশই কিন্তু আমাদের বাংলাদেশি ভাই।

মালয়েশিয়ার জঙ্গলে পালিয়ে থাকা, কিংবা লিবিয়ায় নিহত হওয়া বা বসনিয়ায় ঠান্ডার মধ্যে জমে থাকা অথবা কাজের সন্ধানে নৌকা ডুবে মরা মানুষগুলোও আমাদেরই অভিবাসী ভাই।

যে মেয়েটি কাজ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে বা নিহত হয়ে সৌদি থেকে ফিরে এলো— সেও আমাদেরই দেশের সন্তান।

যখন দেখি দেশের এসব অগণিত খেটে খাওয়া, দরিদ্র ও স্বল্প-শিক্ষিত মানুষ অভিবাসী জীবন বেছে নিয়ে তাদের রক্ত পানি করা টাকা দেশে পাঠাচ্ছে, আর সেই টাকা আমাদের দেশের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ মানুষ বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে, তখন মনটা ক্ষোভে, দুঃখে ফেটে পড়ে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে এই অসৎ লোকগুলো সবসময়ই পার পেয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, আমরা দিন-রাত সে সব অসৎ মানুষদের সালাম ঠুকছি, আর দূর দূর, ছেই ছেই করছি সে সব মানুষকে, যাদের পাঠানো টাকায় আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। এই চরম বৈষম্য দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছি।

অভিবাসী ও গার্মেন্টেস শ্রমিকের আয়ে যে দেশ চলে, যে দেশে কৃষক ফসল উৎপাদন করে সবার মুখে অন্ন যোগায়, সে দেশে এত টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায় কীভাবে?

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমাদের হাতখরচ বাবদ বরাদ্দ ছিল ১০ টাকা বা তার চেয়েও কম। সে সময়ে এই টাকাটাই ছিল বিশাল প্রাপ্তি। বড়লোকের দু’তিনজন ছেলেপুলে বাদ দিলে বাকিদের অবস্থা এরকমই ছিল।

সে যাক, একদিন আমরা চার জন একটা স্কুটারে চেপে মতিঝিল থেকে ফিরছিলাম। সামনে চালকের পাশে আমাদের যে বন্ধুটি বসেছিল, চলন্ত অবস্থায় তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করতে গিয়ে পকেটে রাখা তিন টা পাঁচ টাকার নোট উড়ে গেল। সে সময় ১৫ টাকা বাতাসে উড়ে যাওয়ায়, আমরা খুব মুষড়ে পড়েছিলাম। বন্ধুটি বলল, আমার এই টাকা ওড়ার দৃশ্য দেখে যে কেউ ভাববে ঢাকায় বাতাসে টাকা উড়ে।

সেই ঘটনার মাত্র ৩৪/৩৫ বছর পরে এখন ঢাকার বাতাসে আসলেই কত টাকা উড়ছে? এত টাকা উড়ছে যে, তা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা অন্য কোন দেশে পৌঁছে যাচ্ছে।

বাংলাদেশি এক ব্যক্তির বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি টাকা অলসভাবে পড়ে আছে সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে। দুদকের আইনজীবী যখন গণমাধ্যমের সামনে এই তথ্য দেন, তখন তা অবিশ্বাস্য মনে হলো। আর তাই সেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক নিশ্চিত হতে প্রশ্ন করেছিলেন এই টাকা কি একজনের? বক্তা নিশ্চিত করেছেন— টাকাটা একজনেরই।

আরও বিস্ময়কর হচ্ছে বিশাল অংকের এই টাকার কোনো দাবিদার নাই। বাংলাদেশ সরকার টাকাটার মালিকানা দাবি করেছে। একাউন্টটি কার সে সম্পর্কে আইনজীবী কোনো তথ্য দেননি। তবে বলেছেন, এই একাউন্টের যিনি মালিক, বাংলাদেশের ‘কোনো একটি মামলায়’ তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তার স্ত্রী-সন্তানেরা আছেন, কিন্তু, তারাও এই টাকাটার মালিকানা দাবি করতে যাচ্ছেন না। হয়তো বা তাদেরও এই পরিমাণ টাকা দেশেই আছে, তাই বিদেশে রক্ষিত টাকার দরকার হচ্ছে না।

ভাবতেই অবাক লাগে বাংলাদেশি একজন নাগরিকের এতো বিশাল পরিমান অর্থ সিঙ্গাপুরের একাউন্টে কিভাবে গেল? শুধু কি সিঙ্গাপুর? পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখলাম গত তিন বছরে মালয়েশিয়া সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে বিদেশির জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ। এর আগে মালয়েশিয়া সরকারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, সেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ বাংলাদেশ।

যদিও দেশ থেকে বিদেশে কোনো টাকা নিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগে। জানা গেছে, গত ১০ বছরে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাউকে কোনো অনুমোদন দেয়নি।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এরপরও বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় কীভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশ হলো? সবই আসলে ম্যাজিক, টাকা পাচারের ম্যাজিক। স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনুমোদন নেই মালয়েশিয়ায় টাকা নেওয়ার, তাও টাকা চলে গেছে, মানে এই টাকা পাচার হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে যে বাতাসে টাকা উড়ছে, যারা ধরতে পারছে, তারা সেই টাকা ধরে পাচার করে দিচ্ছে। কারণ, দেশে রাখাটা নিরাপদ নয়। আর দেশের অধিকাংশ মানুষ দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত। এই অর্থনীতির নাম আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে টাকা উড়ানোর অর্থনীতি।

যারা সংসার চালানোর জন্য চাকরের মতো চাকরি করে যাচ্ছেন, সেই চাকরি হারানোর ভয়ে দিনরাত সিঁটিয়ে আছেন, যে কৃষক দুবেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য ঝড়-বৃষ্টি-রোদ মাথায় করে হালচাষ করেন, যে দোকানি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটা-দুইটা ক্রেতার আশায় পথ চেয়ে থাকেন, যে নারী বাচ্চা কোলে নিয়ে প্রখর রোদে ইট ভাঙেন, যে যৌনকর্মী পরিবারের খরচ যোগানোর জন্য গভীর রাতে একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন, যে কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করার পরেও যথাযথ দাম পান না, একমাত্র তারাই জানেন জীবন কীভাবে কাটছে তাদের। মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বা কানাডার বেগমপাড়া এসবই তাদের কাছে রূপকথার গল্প। এখনো এদেশের অধিকাংশ মানুষের গল্প ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’র গল্প। কেউ প্রকাশ করেন, কেউ করেন না। কারোটা প্রকাশিত হয়, কারোটা হয় না।

বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকলেও বিদেশে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে এখন বাংলাদেশ। ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছিল ২০১৯ সালে।

বহুদিন থেকেই শুনতে পারছি দেশ থেকে অস্বাভাবিক হারে টাকা পাচার বেড়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে এক হাজার ১৫১ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। টাকার অংকে এই হিসাবগুলো শুনলে মনে হয় বুঝি বা কোনো দেশের বাজেট।

একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে এত টাকা কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠিন বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে ও তাদেরই অগোচরে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে— এটা বোঝাই আমাদের জন্য খুব কঠিন।

এই পাচার হওয়া টাকার অর্ধেকও যদি দেশে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে কত কী হতে পারতো— স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট। কত শিশু বিনা খরচায় খেতে পারতো, পড়তে পারতো। কত মানুষ চিকিৎসা পেতো। ব্যবসা-বাণিজ্যেও কত উন্নতি হতো। অথচ না, আমাদের এক শ্রেণির দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ দেদার পরিমাণে টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে কানাডায় অর্থ পাচার নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। এবারের আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকার নিজে যখন পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য নিয়ে হাজির হয়, তখন বোঝা যায় অবস্থা কতটা মারাত্মক। তাছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যক্তিগত উদ্যোগে তদন্ত করে যে তথ্য পেয়েছেন, সেটাও বেশ ইন্টারেস্টিং। উনি বলেছেন, রাজনীতিকদের চেয়ে সরকারি কর্মকর্তারা এই কাজে এগিয়ে আছেন।

কিন্তু, কীভাবে? সরকারি কর্মকর্তাদের, মন্ত্রী-এমপিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়ার একটা আইন বাংলাদেশে আছে। অথচ এই আইন কে কতটুকু মানেন, তা জনগণ জানেন। যারা দেশ চালান, নিয়ম বানান তারা নিজেরাই নিজেদেরকে দেশের এই আইন পালন থেকে অব্যহতি দিয়েছেন। বাহ! দুর্নীতির আলোচনায় এই তিনটি গ্রুপেরই নাম আছে, আবার দেশও চালান এই তিন শক্তিই।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যখন মন্তব্য করেন যে সরকারি অফিসারদের পরিচিতি তো দিনে আনেন, দিনে খান। এর মধ্যে বিদেশে কিভাবে তারা বাড়ি কিনেছেন, সেটা সরকার জানে না। সরকারিভাবে তথ্যও পাওয়া যায় না। কারণ, সে দেশের সরকার এখানে কোনো তথ্য দেয় না।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকে একজন আমেরিকানের কত টাকা আছে, তা জানা সম্ভব। এর মানে একজন আমেরিকান বা কানাডিয়ান বাংলাদেশের ব্যাংকে টাকা রাখলে সেই তথ্য আমরা সেই দেশের সরকারকে জানাচ্ছি। কিন্তু, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক সে সব দেশে টাকা রাখলে সেই তথ্য তারা আমাদের জানাচ্ছে না, তথ্য চাইলেও পাচ্ছি না। আমরা তথ্য চাইলেও তারা দিতে পারবে না। কারণ, উত্তর আমেরিকার ফেডারেল গভর্নমেন্ট এসব নিয়ে ডিল করে না।

আমরা আগে শুনতাম দেশের ধনীদের কালো টাকা থাকে সুইস ব্যাংকে, কারণ এই টাকা নিরাপদ। কিন্তু, বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের পাচার করা অর্থের ব্যাপারেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই।

বাংলাদেশ থেকে টাকা-পয়সা লুট করে কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ নিয়ে অন্য দেশে গিয়ে আয়েশ করে পায়েশ খাচ্ছে, এটা আর কতদিন দেশবাসীকে মেনে নিতে হবে? কবে, কত টাকা, কীভাবে, কোথায় পাচার হচ্ছে জিএফআই সব তথ্য জানাচ্ছে। কিন্তু, এরপরও কেন কিছু হচ্ছে না? টাকার তো হাত-পা নেই যে নিজে নিজে চলে যাবে। টাকা একবার দেশের বাইরে চলে গেলে, তাকে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।

বিদেশে টাকা পাচার ও সেই অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে কার্যকর কোন উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না। আর তাই দেশের টাকা উড়তে উড়তে বিদেশে চলে যাচ্ছে। এভাবে যদি এরা পুরো দেশটাই একদিন পাচার করে দেয়, তাও হয়তো বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

Comments

The Daily Star  | English

Economy with deep scars limps along

Business and industrial activities resumed yesterday amid a semblance of normalcy after a spasm of violence, internet outage and a curfew that left deep wounds in almost all corners of the economy.

9h ago