পাথরচাপা সময়ে ‘সওগাত’ ও কালোত্তীর্ণ নাসিরউদ্দীন

পাথরচাপা সময় আঠারো-উনিশ শতকে চলছিল আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট ও বাঙালি মুসলমান সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সেই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিতে স্বাতন্ত্র্যের অনুসন্ধান করে সমাজ যখন দিশাহারা, ঠিক তখনি প্রকাশিত হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনায় কিছু পত্রিকা ও সাময়িকী।
Mohammad Nasiruddin
সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। ছবি: সংগৃহীত

পাথরচাপা সময় আঠারো-উনিশ শতকে চলছিল আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট ও বাঙালি মুসলমান সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সেই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিতে স্বাতন্ত্র্যের অনুসন্ধান করে সমাজ যখন দিশাহারা, ঠিক তখনি প্রকাশিত হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনায় কিছু পত্রিকা ও সাময়িকী।

আজকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে প্রায় বাংলা সংবাদ সাময়িকপত্রের দ্বিশতবর্ষ, আর প্রথম সারির দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকার শতবর্ষ চলছে। ১৮১৮ সালের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম তিনটি পত্রিকা— যথাক্রমে মাসিক ‘দিগদর্শন’, সাপ্তাহিক ‘সমাচারদর্পণ’ ও সাপ্তাহিক ‘বাঙ্গাল গেজেট’। প্রথম দুটি পত্রিকার প্রকাশস্থান শ্রীরামপুর মিশন ও তৃতীয়টির কলকাতা।

অন্যদিকে, ১৯১৮ সালের জুন মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ও ডিসেম্বরে মাসিক সওগাত। প্রথমটি ছিল বঙ্গীয় মুসলমান-সাহিত্য-সমিতি’র (১৯১১) মুখপত্র। দ্বিতীয়টি প্রকাশিত হয় সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে। সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। (হাবিব আর রহমান, প্রথম আলো) কাল থেকে কালান্তর নাসিরউদ্দীন মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে তার কাজের মধ্য দিয়ে। ফলে শতবর্ষে দাঁড়িয়ে মাসিক সওগাত নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক।

শতবর্ষের সেরা সওগাত শিরোনামে বইটি বিশ্লেষণে তথ্য মিলে (সংস্থা মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা; সম্পাদক সফিউন্নেসা)— প্রথম দিকে সওগাত-এ থাকতো শিক্ষা সমস্যা, সাম্প্রদায়িক সমস্যা, ভাষা নিয়ে বিতর্ক, রাজনীতি, সাহিত্যে হালচাল ইত্যাদি। এর সঙ্গে পরিবেশিত হতো নারীর অধিকারবিষয়ক প্রবন্ধ ও সংবাদ।

দেশ-বিদেশের বরণীয় নারীদের বিভিন্ন অর্জন ও অবদানের কথা ছবিসহ ছাপানো হতো। এছাড়া স্বদেশি নারীদের সাফল্যগাথা ও নারী সমিতিগুলোর কর্মসূচি নিয়মিত ছাপানো হতো।

ধারণা করা হয়, বেগম রোকেয়ার মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে নাসিরউদ্দীন নারীশিক্ষার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিকতা পেশায় রয়েছে জীবনের হুমকি, পাশাপাশি রয়েছে অ্যাডভেঞ্চার। যার পুরোটাই উপভোগ করতেন নাসিরউদ্দীন। এজন্য তিনি এদেশের সাংবাদিকতায় অনুসরণীয়। নাসিরউদ্দীন প্রতিভা চিনতেন ও তার কদর করতে জানতেন। যার ফলে তার হাত দিয়ে অনেক কবি-লেখক উৎসাহিত হয়ে বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য হয়েছেন।

নাসিরউদ্দীন মুসলমান নারীদের পাশাপাশি হিন্দু, ব্রাহ্ম ও খ্রিস্টান নারীদের লেখাপড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে উৎসাহিত করতেন। পর্দার আড়ালে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত মুসলমান নারীর দুঃসহ জীবনযাপনের বাস্তবতা অস্থির করে তুলেছিল সম্পাদককে।

সওগাত’র মাধ্যমে তিনি নারীমুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজের নারীদের কঠোর অবরোধ ও বহুরকম নিষেধের গণ্ডি থেকে বের করে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘নারী না জাগলে জাতি জাগবে না’।

সওগাত প্রকাশনা শুরুর সময়টার বর্ণনা করতে গিয়ে নাসিরউদ্দীন বলেছিলেন, ‘কট্টর গোঁড়া ধর্মাবলম্বীরা কতগুলো নিষেধের বেড়াজাল সৃষ্টি করে সমাজকে পঙ্গু করে রেখেছিলেন। যেমন তারা মনে করতেন ইংরেজি পড়া, গল্প, উপন্যাস পড়া, গান করা বা গান শোনা, ছবি আঁকা, আমোদ-আহ্লাদ ও খেলাধুলা করা এসবই গুনাহর কাজ। স্বাধীনভাবে চিন্তা করে কেউ কিছু লিখলে তিনি নিন্দনীয় হতেন এবং তার লেখা কোনো কাগজে ছাপা হতো না। এমন একটা যুগে সওগাতের জন্ম।’

এক কথায় যুক্তিহীন আঠারো থেকে উনিশ শতকে রেনেসাঁ আন্দোলনের কর্মীরা আইরিশ ও মার্কিন সাহিত্য আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা, পথ নির্দেশ তথা নতুন পথের সন্ধানে কাজ করে গেছেন। সেই চেতনায় অন্ধবিশ্বাসের অবমাননা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন করেছে সওগাতও।

যেভাবে শুরু কলকাতায়

কৈশোরেই পেশাজীবনে প্রবেশ করতে হয় নাসিরউদ্দীনকে। প্রথমে তিনি করেছেন সুপারির ব্যবসা। দ্বিতীয় দফায় কাজ পেলেন স্টিমার স্টেশনে সহকারী হিসেবে। তার কাজ ছিল টিকিট বিক্রি ও টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো জমা দেওয়া। তারপর বীমা খাতে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি।

জীবনে এলো সচ্ছলতা। কিন্তু, মনে শান্তি নেই। অর্থ নয়, বিত্ত নয়, নাসিরউদ্দীনের মাথায় কেবল সাহিত্য-ভাবনা। সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করার তাড়না। কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেই হবে। মুসলমান সমাজ থেকে একটা পত্রিকা বের করতে পারলেই মিলবে প্রগতিশীল ভাবনাচিন্তা প্রকাশের দারুণ এক জায়গা। ‘পত্রিকা প্রকাশের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ১৯১৭ সালে চাঁদপুর ছেড়ে কলকাতা রওনা হলাম’— লিখেছেন নাসিরউদ্দীন।

কিন্তু, তিনি মুসলিম যাদের কাছেই যান, তারা তার কথা শুনে পিছিয়ে পড়েন। হিন্দুদের কাগজের মতো গল্প-উপন্যাস নিয়ে ছবিটবি দিয়ে পত্রিকা বের করতে রাজি নন কেউ। তাই বিফল-মনে নাসিরউদ্দীন ফিরে এলেন চাঁদপুরে। কিছুদিন কাটিয়ে আবার গেলেন কলকাতায়। পত্রিকা বের করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নানাজনের সঙ্গে দেখা করলেন, কথা বললেন তিনি। শেষে যার সঙ্গে পরিচয় হলো তিনি ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুল রসুল। সব শুনে তিনি বললেন, ‘সাহিত্য পত্রিকা মুসলমান সমাজ থেকে আরো ৫০ বছর আগেই বের হওয়া উচিত ছিল।’

সচিত্র মাসিক পত্রিকা হিসেবে সওগাত’র যাত্রা কলকাতায় ১৩২৫ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (নভেম্বর/ডিসেম্বর, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ)। এর সম্পাদক, প্রকাশক, প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কালের ইতিহাসই বদলে দেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।

কেননা, সওগাত’র মতো এক পাটাতনের কারণেই অবিভক্ত বাংলায় কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, বেগম রোকেয়া, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালদের নব নব চিন্তা আর ভিন্নমত প্রকাশের কাজটি সম্ভবপর হয়।

সেই সময়ের ত্রিপুরা, তারপরের কুমিল্লা, হালের চাঁদপুরের পাইকারদী গ্রামে জন্ম নেওয়া নাসিরউদ্দীন কালক্রমে হয়ে উঠেন বাঙালির প্রগতি চিন্তার একজন পথিকৃৎ, বোধের মুক্তির অন্যতম দিশারি।

প্রথম সংখ্যা রবীন্দ্রনাথ

নাসিরউদ্দীনের পরিকল্পনা ছিল সচিত্র মাসিক পত্রিকা বের করার। কিন্তু, মুসলমান সমাজে ছবি গ্রহণযোগ্য নয়। সে জন্য তাদের সচিত্র কোনো পত্রিকাও নেই। মুসলমান সমাজকে প্রগতির পথে আনতে মুসলিমদের সাহিত্যচর্চা, সাহিত্যপাঠ জরুরি— এমন ভাবনা থেকেই তার কাজ করা। শুরুতেই ধাক্কা খেলেন তিনি। মুসলমান চিত্রশিল্পী মিলল না। বাধ্য হয়ে প্রচ্ছদপটের জন্য শিল্পী গণেশ ব্যানার্জির দ্বারস্থ হলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।

তখন প্রগতিপন্থি মুসলিম লেখকের সংখ্যাও ছিল সীমিত। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী কবি-সাহিত্যিকদের কাছেও তাকে যেতে হয়েছে। অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও সাহস ও অদম্য ইচ্ছার ওপর ভর করে দু-একজন শুভানুধ্যায়ীর সহযোগিতায় ১৯১৮ সালের ডিসেম্বরে নাসিরউদ্দীন প্রকাশ করলেন সচিত্র মাসিকপত্র সওগাত। পত্রিকা বেরোল ১ম বর্ষ ১ম খণ্ড সংখ্যা অগ্রহায়ণ ১৩২৫ চিহ্নিত হয়ে। এটিই কোনো মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সচিত্র বাংলা পত্রিকা। সওগাত নিয়ে শুরুতেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। প্রগতিশীলসমাজ তাকে দারুণভাবে গ্রহণ করে।

প্রথম সংখ্যায় লিখলেন জলধর সেন, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মানকুমারী বসু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক প্রমুখ। প্রথম সংখ্যাতেই ছিল আরএস হোসেন নামে বেগম রোকেয়ার কবিতা ‘সওগাত’, আর প্রবন্ধ ‘সিসিম ফাঁক’।

কায়কোবাদ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, শাহাদাৎ হোসেন, আবদুল গফুর মুসলিম লেখকদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ‘বর্তমান বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যিকগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (সচিত্র)’ শিরোনামে লেখেন এম নাসিরউদ্দীন।

নাসিরউদ্দীন জানিয়েছেন, সওগাত প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে কবিকে এর একটি কপি উপহার দিয়ে তার পত্রিকার জন্য লেখা প্রার্থনা করেছিলেন।

খোশ মেজাজে রবীন্দ্রনাথ জানতে চেয়েছিলেন— পত্রিকাটির এত সুন্দর নাম রেখেছে কে?

জবাবে নাসিরউদ্দীন বলেছিলেন, ‘বহু চিন্তা করে সবার গ্রহণযোগ্য হবে বলে নামটি আমিই নির্বাচন করেছি।’

তখন কবি বললেন, ‘তোমার রুচিবোধ প্রশংসার যোগ্য। মুসলমান সমাজের বর্তমান অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে যে এরূপ সুন্দর একখানা মাসিক পত্রিকা বের হতে পারে, এটা আমার ধারণায় ছিল না।’

নাসিরউদ্দীন চলে এলেন। চার-পাঁচ দিন পর বিশ্বভারতীর মনোগ্রাম আঁকা খামে বিশ্বকবির চিঠি পেলেন তিনি। পেলেন কবিতাও। চিঠিতে বিশ্বকবি লিখেছিলেন, ‘বিশ্বভারতীকে টাকা দিয়ে আমার লেখা নেয়া সম্ভব নয় বলে সেদিন তুমি খুব নিরাশ হয়ে ফিরে গিয়েছিলে। তাই একটা কবিতা পাঠালাম। আশা করি তোমার ভালো লাগবে।’ এর জন্য টাকা দিতে হবে না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় সংখ্যার প্রথম রচনা হিসেবে ‘পথের সাথী’ কবিতাটি সেটি ছাপা হয়। সেই সঙ্গে দুটি সচিত্র প্রবন্ধ ছাপা হয় অতীতের বিখ্যাত মুসলমান নারীদের নিয়ে। মুসলমান নারীদের ছবি ছাপা হওয়া ইসলামবিরোধী বলে সওগাত প্রথম থেকেই গোঁড়া মুসলমানদের কুনজরে পড়ে। একে নারীদের লেখা সংগ্রহের অক্ষমতা, কট্টর মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরোধিতা, তার ওপর গ্রাহকের স্বল্পতা ইত্যাদি মিলিয়ে ১৯২২ সালে সওগাত বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় প্রগতিবাদী মুসলমান সমাজের গড়া ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ‘শিখা’ গোষ্ঠীও গোঁড়া মুসলমানদের রোষানলে পড়ে।

আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন মিলে এই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন করার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের আদর্শ ছিল ‘জাতিধর্ম নির্বিশেষে নবীন, পুরাতন সর্বপ্রকার চিন্তা ও জ্ঞানের সমন্বয় ও সংযোগ’ ঘটানো।

সওগাত নজরুল

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় ঊর্ধ্বমুখী বাজার। এক পর্যায়ে নাসিরউদ্দীন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পত্রিকা বন্ধ করে আবার বীমা কোম্পানির এজেন্সি নেন কলকাতাতেই। বছর চারেক লাগে আর্থিক সচ্ছলতা পেতে। এরপর আবার নতুন কলেবরে সওগাত বের করেন তিনি। আগের প্রকাশনার ধারাবাহিকতা রেখে চতুর্থ বর্ষ প্রথম সংখ্যা আষাঢ় ১৩৩৩ (জুন ১৯২৬) দিয়ে নতুন পর্যায়ে শুরু করেন তিনি।

এবার সওগাত সত্যি জমে ওঠে। প্রগতিশীল মুসলিম লেখকদের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এটি। আসেন এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ, শাহাদাৎ হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ।

১৯২৭ সালের নববর্ষে বের হয় ‘বার্ষিক সওগাত’। এর প্রথম সংস্করণ দুই সপ্তাহে বিক্রি হয়ে যায়। পাঠক চাহিদা মেটাতে হয় তৃতীয় সংস্করণ করা হয়েছিল। এমন যখন জনপ্রিয়তা, তখন ‘সওগাত সাহিত্য মজলিশ’ যাত্রা শুরু করে। এটি মূলত ছিল সাহিত্যামোদীদের আড্ডাশালা। এর আসর বসত প্রথমে ৮২ কলুটোলা স্ট্রিটের পত্রিকা দপ্তরেই। এরপর তা চলে যায় ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটে। সেখানে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্বপরিবারে থাকতেন। দোতলা বাড়ির নিচে করা হয় নিজস্ব ছাপাখানা।

এ অধ্যায়ের প্রথম সংখ্যা থেকে নজরুলই সওগাত’র প্রধান লেখক। সেখানে প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত কবিতা ‘সর্বহারা’। তার আগেই অবশ্য তিনি বাংলা সাহিত্যজগতে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছিলেন। তবে আর্থিক সমস্যার সুরাহা হয়নি তখনো। তাই ১৯২৭ সালের মার্চে অ্যালবার্ট হলে ‘নজরুল সাহায্য রজনী’ আয়োজিত হয় সওগাত সম্পাদকের উদ্যোগে। পরে নজরুল কাজও নেন সওগাত-এ। তার মোট ৮০টি লেখা ছাপা হয়েছিল এই পত্রিকায়।

এক কথায় নজরুলের সাহিত্যজীবন তো বটেই, ব্যক্তিজীবনের সঙ্গেও দারুণভাবে জড়িয়ে আছে সওগাত। তার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ কীভাবে, তার বিবরণ দিয়েছেন সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তিনি লিখেছেন, ‘সওগাত প্রকাশিত হওয়ার পর পরই নজরুল করাচি থেকে লেখা পাঠাতে শুরু করেন— প্রচুর লেখা। লেখার সঙ্গে থাকত চিঠি। এসব লেখা আর চিঠির মধ্য দিয়েই নজরুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। এর আগে নজরুল ইসলামের নাম বা তার পরিচয়— এর কোনো কিছুই আমার জানা ছিল না।’

নাসিরউদ্দীন আবুল মনসুর আহমদ

বিভিন্ন কারণে আবুল মনসুর আহমদকে সওগাত সম্পাদক পছন্দ করতেন। বিশেষত ব্রিটিশ শাসনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাঙালি মুসলমানের জাগরণ-প্রচেষ্টার ইতিহাস সন্ধান ও অনুধাবনে দুজনে দারুণভাবে কাজ করছেন।

ইতিহাসে দেখা যায় পরবর্তী জীবনে সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লিখেছেন আবুল মনসুর আহমদ। তিনি সম্পাদনাও করেছেন কৃষক, নবযুগইত্তেহাদ। বাংলাদেশে আজকের প্রচুর সংখ্যক শিক্ষিত ও রুচিসম্পন্ন মানুষের পত্রিকার প্রতি অনুরাগ ও দায়িত্বশীলতা, চিন্তাচেতনার পরিমাপ ইত্যাদি মননক্ষেত্রে সেদিনের সঙ্গে তৌলন বিচার ও আত্মসমীক্ষায় পত্রিকাগুলো কালের সীমায় দাঁড়িয়ে দেখাও প্রাসঙ্গিক।

আবুল মনসুর আহমদ তার আত্মকথা-য় লিখেছেন, ‘সওগাত ও সম্পাদক নাসিরুদ্দিন সাহেব শুধু মাসের পর মাস আমার গল্পই ছাপিতেন না, আমাকে উৎসাহ দিয়া পত্রও লিখিতেন। সেই হইতে নাসিরুদ্দিন সাহেব ও তাঁর ‘সওগাত’-এর সাথে আমার ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া যায়। এ সম্পর্কের মধুরতা এই বৃদ্ধ বয়সেও অটুট রহিয়াছে।’

সওগাত ঢাকাই পর্ব

১৯৪৭ সাল। বাঙালির জন্য প্রতিকূল এক সময়। বাংলা দুই ভাগ। ধর্মীয় চেতনার তখন জয়কার। একই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের একটি অংশ কলকাতা থেকে ঢাকামুখী। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন পূর্ব বাংলার মানুষ। এ বেলায় আর উল্টো স্রোতে নাও ভাসাতে পারলেন না তিনি। তবু আরও তিন বছর কাটিয়ে দিলেন কলকাতায়। ১৯৫০ সালে আর পারলেন না। ঢাকার পাটুয়াটুলির বিজয়া প্রেসের মালিকের প্রেস-বাড়ির সঙ্গে নিজের প্রেস-বাড়ি বিনিময় করেন তিনি।

১৯৫২ সালের মাঝামাঝি। বাংলা ভাষা সুরক্ষার সংগ্রামে উত্তাল ঢাকা। সওগাত আর এগোচ্ছে না। হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একদল তরুণ সাহিত্যিক দেখা করলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে। কলকাতার সাহিত্য আন্দোলনে সওগাত যে ভূমিকা রেখেছে, ঢাকায়ও পত্রিকা আর তার দপ্তর সেভাবে সক্রিয় থাকবে, এ অনুরোধ ছিল তাদের। আবার উৎসাহ পেলেন নাসিরউদ্দীন। বঙ্গাব্দ ১৩৬০ অগ্রহায়ণ (খ্রিস্টাব্দ ১৯৫৩ নভেম্বর/ডিসেম্বর) ঢাকায় সওগাত’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

পাকিস্তান পর্বের গোড়ায় ঢাকায় প্রগতিশীল সাহিত্যচর্চায় নেতৃত্বস্থানীয় হয়েই ছিল সওগাত। কিন্তু, কলকাতায় এর আলোড়ন যে উচ্চতায় ছিল, ঢাকায় সেটা আর হয়নি। ধীরে ধীরে এর প্রভাব কমে আসতে থাকে। বিপরীতে নাসিরউদ্দীন প্রতিষ্ঠিত বেগম পত্রিকা ও বেগম ক্লাব অনেক বেশি আলোচিত হয়।

কলকাতার মজলিস, ঢাকার সংসদ

সওগাত-এ গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করেই কেবল দায় শেষ করতে চাননি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তার ইচ্ছে তারও চেয়ে বেশি ছিল। তিনি চেয়েছিলেন সওগাত হবে সাহিত্যচর্চার তীর্থস্থান। যেখানে নবীন-প্রবীণ লেখকরা আসবেন, থাকবেন, আড্ডা দেবেন। কলকাতার সাহিত্য ইতিহাসে এভাবে বড় জায়গা নিয়ে আছে ‘সওগাত সাহিত্য মজলিস’, যার প্রধানতম স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমরা পাই খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনকে। আর এর প্রাণভোমরা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ঢাকায় এ দুজনার ভূমিকায় একাই আমরা পরে পাই হাসান হাফিজুর রহমানকে।

পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভাপতি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফয়েজ আহমদ। সেই সংসদের আড্ডায় দুই শতাধিক সভ্য হাজির হতেন। তাদের একেকজন আগে-পরে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকপাল ছিলেন। যেমন— আবুল হোসেন, শওকত ওসমান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, সরদার জয়েনউদ্দীন, ফজলে লোহানী, বদরুদ্দীন ওমর, আনিসুজ্জামান, মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, খালেদ চৌধুরী, আল মাহমুদ ও সৈয়দ শামসুল হক।

সম্পাদকীয় আদর্শ অর্জন

মুখ্যত মুসলমান সমাজের কল্যাণব্রত ছিল সওগাত প্রতিষ্ঠার প্রধান লক্ষ্য। সে জন্য সম্পাদক পত্রিকার পক্ষে আবশ্যকীয় কয়েকটি নীতিনির্ধারণ করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাসমৃদ্ধ রচনার জন্য লেখকদের মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া, সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা, নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণমূলক রচনা প্রকাশ ও নারীদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করা, নতুন লেখক সৃষ্টিতে উৎসাহ দান, সর্বোপরি নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ।

তাছাড়া, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয়। তিনি পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের, বিশেষ করে নারীসমাজের অগ্রগতির জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেন।

নূরজাহান বেগম তার প্রেরণাতেই বেগম পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। (সওগাত পত্রিকার নির্বাচিত রচনা সংকলন 'শতবর্ষের সেরা সওগাত' বই প্রকাশ করে বাতিঘর ২০১৮ সালে)

মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন অবিভক্ত বাংলায় ব্রিটিশ শাসন ও পিছিয়ে পড়া সমাজের নানা বাধাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ কর্মজীবনে তার সম্পাদিত দুটি পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় স্মরণীয় অবদান রেখেছেন। সাহিত্য সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৫), একুশে পদক (১৯৭৭) ও স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। তাছাড়া, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন বাংলা একাডেমির ফেলো, জাতীয় জাদুঘরের বোর্ডের সদস্য, নজরুল একাডেমির চেয়ারম্যান ছিলেন।

কালের যাত্রায় সওগাত

ঢাকায় সওগাত যখন থেকে বের হয়, তার তিন বছর আগেই বেগম বের হতে শুরু করে। এর মানে হচ্ছে, কলকাতা থেকে ঢাকা-পর্বে আসতে সওগাত-এর যে বিরতি, বেগম-এর বেলায় তা অনেক কম।

আরও একটি বিষয় হচ্ছে, সত্তরের দশকের শুরুতে সওগাত বন্ধ হয়ে যায়। তখন সওগাত প্রেস টিকে থাকে বেগম পত্রিকার কারণে। তবে একবাক্যে বলা যায় সওগাত ছিল মুক্তচিন্তার পত্রিকা। ১৯২৮ সালের ১১ মে প্রকাশিত সওগাত ছিল আরেকটু চড়াসুরের। এ দুই মিলিয়ে রক্ষণশীল গোঁড়া শ্রেণির কাছ থেকে নাসিরউদ্দীনকে ইসলামদ্রোহী, কাফের, মুরতাদ ইত্যাকার নিন্দা শুনতে হয়েছিল। তবু থেমে থাকেননি তিনি। কাজ করে গেছেন সাধ্য অনুসারে। সওগাত থেমে গেলেও আদর্শকে শক্তি করে চলেছিলেন নাসিরউদ্দীন।

তিনি বলেছেন, ‘আমার জীবন বলতে সওগাত-এর জীবনকেই বুঝি। কারণ, আমার ব্যক্তিগত জীবনে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। আমার  যা-কিছু অর্জন, তার সবই সওগাত-এর কারণে। ‘বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ’ নামে আমার লেখা একটা বই আছে। এ বইতে সেকালে যাঁরা লেখক-লেখিকা ছিলেন, তখন তাঁরা কীভাবে কোন পরিবেশ থেকে লিখতেন, সে কথাও আছে। বইটা এসব কিছুরই সংকলন এবং আমার নিজেরও কিছু কথা আছে তাতে। এভাবেই শেষ করেছি বইটি। সাধারণ গৃহস্থঘরেই আমার জন্ম। নিজের চেষ্টা-চরিত্রের জোরেই কাগজটা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। প্রেস করেছিলাম। আমি দাঁড়িয়েছি একমাত্র নিজের চেষ্টায়। (সওগাত ও আমার জীবনকথা/ প্রতিচিন্তা)

আমাদের ঋণ

১৭৯৩ সালের পর লাখেরাজ সম্পত্তি নিয়ে আইন তৈরি হয়। তাতে মুসলমানের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। হিন্দুদেরও ক্ষতি কম হয়নি। কিন্তু, হিন্দুসমাজ এই ক্ষতি অনেকভাবে পুষিয়ে নিতে পেরেছিল। অন্যদিকে, মুসলমানসমাজ তা পারেনি। কারণ হিসেবে দেখা যায়, ধর্মীয় গোঁড়ামি বা ইংরেজি শাসনের প্রতি ঘৃণা থাকায় অগ্রগামী হয়ে উৎসাহবোধ করেনি তারা। আর একটু আগালে দেখা যায়, ১৮২৯ সালে ফার্সির পরিবর্তে ধীরে ধীরে ইংরেজিকে স্থান দিতে শুরু করে উপনেবিশেক শাসকরা। এই ইংরেজি-শিক্ষিত হিন্দুরা সরকারি চাকরি করতে শুরু করেন। মুসলমান সমাজ হিন্দুর তুলনায় পিছিয়ে পড়ে।

এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মুসলমানসমাজের সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছিল। যখন মেধার ভিত্তিতে বৃত্তি চালু করা হলো তখন মুসলমানসমাজ প্রমোদ গুণতে শুরু করে। সে সময় কলকাতায় প্রায় আট হাজার ব্যক্তির স্বাক্ষর নিয়ে সরকারের কাছে পাঠানো হয়। তাতে বলা হয় সরকার হিন্দু-মুসলমানসমাজের নীতিগত শাস্ত্রালোচনার পথ বন্ধ করে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে চায়। তখন মূলত এগিয়ে যায় হিন্দুরা, আর পিছিয়ে পড়ে মুসলমানসমাজ।

এর পরিবর্তন ঘটে অনেক পরে। এ পরিবর্তনে কাজ করেন বেশ কয়েজন ব্যক্তি ও কয়েকটি সংগঠন। অন্যদিকে, ১৯১১ সালের বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা-কে যদি বঙ্গীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রথম বৃক্ষ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে ১৯২৬ সালের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ১৯৪২ সালের ‘বঙ্গীয় মুসলিম রেনেসাঁ সোসাইটি’কে বলা যায় সে বৃক্ষের দুটি শাখা।

ভুল-শুদ্ধ কিংবা কার্যকর-ব্যর্থতার তকমা হটিয়ে, আবেগের চশমা সরিয়ে দেখলে দেখা যায়, পরভৃত ব্রাহ্মণ ও মোল্লাদের করতলগত বাংলায় ‘সৃষ্টিশীলতা’, ‘মুক্তচিন্তা’ কখনোই মুক্ত হয়ে উঠতে পারেনি। বরং প্রগতির মুখোশে চাপা পড়েছে বুদ্ধিবৃত্তি, মুক্তচিন্তা। এমনকি বাংলাদেশের স্বার্থচিন্তাও আমরা করতে পারিনি। কিন্তু, সে সময় সওগাতশিখার মতো প্রতিষ্ঠান কাজ করে আমাদের সমাজকে এগিয়ে দিয়েছেন প্রায় শত বছর। চিন্তা ও বোধে অগ্রগামী ভাবনায় ঋণী করেছে সময়কালকে।

কৃতজ্ঞতা: সংস্থা মিত্র ও ঘোষ – ‘শতবর্ষের সেরা সওগাত ', ‘সওগাত ও আমার জীবনকথা’ , আবুল মনসুর আহমদের ‘আত্মকথা’, হাবিব আর রাহমান- মুসলিম স্বাতন্ত্র্যতা, প্রথম আলো ও বণিক বার্তা’য় প্রকাশিত প্রবন্ধ

ইমরান মাহফুজ, কবি গবেষক

Comments

The Daily Star  | English
44 killed in Bailey Road fire

Tragedies recur as inaction persists

After deadly fires like the one on Thursday that claimed 46 lives, authorities momentarily wake up from their slumber to prevent recurrences, but any such initiative loses steam as they fail to take concerted action.

13h ago