শীর্ষ খবর

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের সময় যেন অনন্তকাল

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণে প্রায় আট বছর আগে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। ২৭৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের নির্মাণাধীন একটি ভবনের একটি অংশ ধসে পড়লে এক শ্রমিক নিহত ও আরও সাত জন আহত হয়েছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণে প্রায় আট বছর আগে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। ২৭৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া এই প্রকল্পটির কাজে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩৪ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১১ দশমিক শূন্য আট কোটি টাকা।

তদুপরি, একটি ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার এবং নির্মাণাধীন ভবনের একাংশ ধসে এক শ্রমিক নিহত হওয়ায় পর প্রকল্পটি ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা বাড়ানোর অনুমোদন চাইলে অনেকটা বিরক্তই হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির জন্য সংশোধিত প্রস্তাব আটকে দিয়ে বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয়বৃদ্ধির কারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ও ব্যয় মূল বরাদ্দ থেকে ১৪৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়ানোর আবেদন করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, প্রকল্পটি ২০১৪ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, কয়েক ধাপে তা বাড়িয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৩ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করছে। যার মানে দাঁড়াচ্ছে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগছে ১১ বছর।

‘এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত অসন্তোষ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এটি গ্রহণযোগ্য নয়’, বলেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ দেরির কারণ জানানোর চেষ্টা করলেও প্রধানমন্ত্রী কোনো অজুহাত শুনতে চাননি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাকে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তদন্ত করতে বলেছেন। প্রকল্পের প্রতিটি বিষয় নিয়ে তদন্তে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকেও তদন্ত করতে বলেছেন তিনি।’

পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, তারা আজ একটি কমিটি গঠন করবেন এবং শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবেন।

‘শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা’

চিকিৎসা শিক্ষা এবং কুষ্টিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চলের মানুষকে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রকল্প নেয় সরকার।

কিন্তু, প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। এমনকি তখন পর্যন্ত কোনো জমিও নির্বাচন করা হয়নি বলে গত বছরের জুনে আইএমইডির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানো ছাড়াই দুই ধাপে এর সময়সীমা বাড়িয়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু, ২০১৮ সালে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনীতে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০১৯ করার পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়িয়ে ৬১১ দশমিক ০৮ কোটি করা হয়।

২০১৯ সালে এসে প্রকল্পটির ৩৪ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী এক বছর ধরে আটকে থাকায় প্রকল্পের কাজও থমকে আছে।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ভবন নির্মাণই অসম্পূর্ণ থাকেনি, পাশাপাশি কিছু ভবনের দরপত্রের কাজও শেষ হয়নি।

‘শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা পাওয়া গেছে’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭১টি প্যাকেজের আওতায় সবগুলো অবকাঠামো নির্মাণ করার কথা থাকলেও কেবল চারটি প্যাকেজের আওতায় একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

‘যার ফলে সময় ও অর্থ অপচয় হয়েছিল’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজগুলো ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করায় বড় ঠিকাদাররা এতে তেমন আগ্রহ দেখায়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ২০০৮ সালের পরিবর্তে ২০১১ সালের হার অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করেছে। যার ফলে জটিলতা আরও বেড়েছে।

২০১২ সাল থেকেই মেডিকেল কলেজটিতে প্রতিবছর ৫০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। কোনো ধরনের যন্ত্রপাতি ছাড়াই অন্য একটি ভবনে এর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলছে।

ভবন নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়ায় এখনো হাসপাতাল বা চিকিৎসা জন্য কোনো ধরনের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা যায়নি।

২০১৮ সালের ২১ জুন প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়ার সময় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লেখিত ‘কাজের সুযোগ’ পরিবর্তন এবং আর্থিক-পরিকল্পনাগত শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে যারা অনিয়মত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিল একনেক।

তবে, এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আইএমইডির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে একজন সাংবাদিক তা জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের (আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ) সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিবেদনের আলোকে চাকরিচ্যুত করাসহ নানা ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পটি পুনরায় ঢেলে সাজানো হয়েছে।

‘তবে, প্রকল্পের ক্রুটিগুলো এখনো রয়ে গেছে’, বলেন তিনি।

আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে অদক্ষ ঠিকাদার ও কাজের প্রতি অবহেলাসহ ২৫টি ক্রুটির কথা উল্লেখ করেছে।

একটি ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ও কাঠ ব্যবহারের কথাও উঠে আসে প্রতিবেদনে। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি ভবনের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে এক শ্রমিক নিহত ও ১০ জন আহত হন।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দায়ী ঠিকাদারকে পরবর্তী দুই বছর গণপূর্ত বিভাগের নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সত্ত্বেও প্রকল্পটির কাজ অব্যাহত ছিল এবং দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্যেও কেউ দায়বদ্ধ ছিল না।

গতকালের বৈঠকে একনেক প্রায় নয় হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে।

Comments

The Daily Star  | English
Personal data up for sale online!

Personal data up for sale online!

Some government employees are selling citizens’ NID card and phone call details through hundreds of Facebook, Telegram, and WhatsApp groups, the National Telecommunication Monitoring Centre has found.

13h ago