সিইসি-ইসি নিয়োগে আইন করা হয়নি ৪৯ বছরেও

সাংবিধানিক বিধান থাকা সত্ত্বেও দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) নিয়োগে এখনো নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।
ec logo

সাংবিধানিক বিধান থাকা সত্ত্বেও দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) নিয়োগে এখনো নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।

নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন না থাকার কারণে সিইসি ও ইসি নিয়োগে কিসের ভিত্তিতে তাদেরকে যোগ্য বা অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে, সেটির কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই।

তারা আরও বলেছেন, যদিও আজ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের চার বছরের মেয়াদ শেষ হবে, কিন্তু, এ সংশ্লিষ্ট কোনো আইন করার সিদ্ধান্ত সরকারের নেই।

গঠনের পর যেকোনো নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর। বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনাররা ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দেশে প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল ১৯৭২ সালের জুলাইতে।

সিইসি ও ইসি নিয়োগে নির্দিষ্ট আইন কার্যকর করার বিষয়ে সাংবিধানিক বিধান থাকা সত্ত্বেও গত ৪৯ বছরে কোনো সরকারই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন করেনি। উল্টো অনেক সরকার তার পছন্দমতো লোককে নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করে থাকে। যা নিয়ে বিতর্কও সৃষ্টি হয়।

যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট আইন নেই, তাই সিইসি ও ইসিদের নিয়োগের জন্য ২০১২ সালে একটি ও ২০১৭ সালে আরেকটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গতকাল বলেন, এই মুহূর্তে এই ধরনের আইন তৈরি করার কোনো উদ্যোগ নেই।

আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘একদম শুরুতে যখন একটি দেশ পুনর্বাসন, পুনর্নির্মাণ এবং অন্যান্য দেশের কাছ থেকে স্বীকৃতি নিতে ও আরও অন্যান্য ইস্যুতে ব্যস্ত থাকে, তখন এই ধরনের আইন করাটা বাধ্যতামূলক নয়— অনেকেই এমনটি বলতে পারেন।’

‘কিন্তু, স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চলেছে। এত সময় পরেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন করতে না পারার পেছনে সরকার সক্ষমতা বা অভিজ্ঞতা নেই বলে কোনো অজুহাত দেখাতে পারে না।’

দ্য ডেইলি স্টারকে এই আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন আছে। তাই আমাদের নতুন করে কিছু করতেও হবে না। বর্তমানের চর্চা অনুযায়ী থাকা তথাকথিত অনুসন্ধান কমিটি “ফাঁকি” ছাড়া আর কিছুই নয়।’

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কোনো সরকারই কেন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন করেনি, তা আমি জানি না। কিন্তু, আমার মনে হয়, কোনো সরকারই ইচ্ছা প্রকাশ করেনি যে, এমন কোনো আইন থাকুক যেটির আওতায় সিইসি ও ইসি নিয়োগ দেওয়া হবে।’

‘অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি কেবল একটি অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থা। তারা তো স্বতন্ত্র নয়। রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এই কমিটিটি গঠিত হয়ে থাকে’, বলেন তিনি।

সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, (প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া) বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।

অতীতের উদ্যোগ

সাখাওয়াত বলেন, ২০০৭ সালে গঠিত নির্বাচন কমিশন ২০০৭-২০০৮ সালে একটি খসড়া আইন তৈরি করেছিল এবং তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই খসড়াটি নতুন সরকাররের কাছে উত্থাপন করার পরামর্শ দেয়।

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলছিলেন, ‘পরবর্তী পর্যালোচনা শেষে আইন ‍ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আমরা ২০১১ সালে আরেকটি খসড়া তৈরি করেছিলাম। ওই বছরই আমরা সেটি সরকারের কাছে পাঠিয়েছিলাম। এ বিষয়ে পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে আমি আর কিছু বলতে পারব না। আমি এটির ভাগ্য জানি না।’

২০১১ সালের নভেম্বরে প্রস্তুত করা ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ প্রক্রিয়া) আইন, ২০১২’ খসড়ার একটি কপি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে।

খসড়াটিতে সিইসি ও চার জন ইসির সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ইসিদের মধ্যে একজন থাকবেন নারী।

এতে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির উচিত এমন ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত যারা দক্ষ, সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ।

খসড়াটিতে দেওয়া প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা যারা নির্বাচন কমিশনের প্রত্যেকটি পদের জন্য তিন জনের নাম সুপরিশ করবে। সেগুলো বিবেচনার জন্য সংসদের বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটির কাছে পাঠানো হবে।

‘... কোনো সরকারই এটা নিয়ে ভাবেনি (ইসিদের নিয়োগে আইন করা)। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনাররা কেন জনমানুষের মনে বিশ্বাস স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন, তা আমরা বোঝার চেষ্টা করেছি। আমরা এ নিয়ে গবেষণা করেছি, খসড়া তৈরি করেছি এবং সরকারের কাছে কিছু সুপারিশও পাঠিয়েছি।’

‘এটা সরকারের দায়িত্ব’, উল্লেখ করেন সাখাওয়াত।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিইসি ও ইসিদের নিয়োগে আইন থাকা দরকার এবং এই বিষয়ে আইন করা সরকারের দায়িত্ব।’

‘পূর্ববর্তী একটি নির্বাচন কমিশন তাদের অতি উৎসাহ বা সরকারকে এ বিষয়ে আইন করতে সহায়তার জন্য একটি খসড়া তৈরি করেছিল।’

‘দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছরেও কেন এ বিষয়ে আইন করা হয়নি, তা আমরা বলতে পারব না’, বলেন তিনি।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘অনেক কিছুই সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’

‘বেশ কয়েকটি অনুসন্ধান কমিটির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। প্রায়শই এসব কমিটির মাধ্যমে সরকারের ইচ্ছাই পূরণ করা হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিধি-বিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছেন রাষ্ট্রপতি।’

সরকার এ বিষয়ে আইন করার উদ্যোগ নেবে কি না, জানতে চাইলে এ বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আমি বলছি না যে, এ ধরনের আইনের প্রয়োজন নেই। আমরা যদি এই আইনটি করতে পারি, তাহলে অনেক কিছুই এর মধ্যে সংযুক্ত করার সুযোগ পাব।’

বিতর্ক

২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেছে ইলেকশন ওয়াচডগ ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা। বিভিন্ন নির্বাচন ও উপনির্বাচনে আর্থিক দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগ ও কম সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির কারণে নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে।

গত শনিবার অনুষ্ঠিত দলীয় বৈঠকে ক্ষমতাসীর জোটের অন্যতম শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টি অব বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে যে, নির্বাচনি ব্যবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপের বিষয়টি বর্তমানে জনসাধারণের জানা এবং এই ব্যবস্থায় জনসাধারণ আস্থা হারিয়েছে।

বৈঠকের সূত্র জানিয়েছে, ইভিএম সিস্টেমটি বর্তমানে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে এবং অনিয়মের জন্যই এই সিস্টেমটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ সংশ্লিষ্ট অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তে রাষ্ট্রপতিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (এসজেসি) গঠনের আবেদন জানিয়েছেন দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো তারা রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠির মাধ্যমে আবেদন জানালেন। প্রথমবার গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয়বার চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তারা চিঠি দিয়েছেন।

প্রথম চিঠিতে তারা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের আগে প্রশিক্ষণের জন্য বক্তৃতা দিতে ‘বিশেষ বক্তা’র জন্য ব্যয় করাসহ অসদাচরণ ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন।

চিঠির উত্তরে গত ২৪ ডিসেম্বর সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেন, মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পর গত বছর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ সংশোধন করার পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে নির্বাচন কমিশন।

আরপিও’র নাম পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদ-পদবির নাম বাংলায় করার সিদ্ধান্ত থেকেও তারা সরে এসেছে।

Comments

The Daily Star  | English