রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ইজারা বেসরকারি খাতে

রাষ্টায়ত্ত ২৫ পাটকলের সবগুলোকে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা ছিল সেসব পাটকল যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে আবারও খুলে দেওয়ার।
খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী পাটকল | স্টার ফাইল ছবি

রাষ্টায়ত্ত ২৫ পাটকলের সবগুলোকে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা ছিল সেসব পাটকল যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে আবারও খুলে দেওয়ার।

বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছে, নয় সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি পাটকলগুলো ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্তগুলো প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। আগামী দুই-এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হতে পারেও বলে সূত্র জানিয়েছে।

বিজেএমসি ও মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, প্রকাশ্য নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে পাটকলগুলো পাঁচ থেকে ২০ বছরের জন্যে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চরম লোকসান ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে গত বছরের ১ জুলাই থেকে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বন্ধ করে দেয়। স্থায়ী, অস্থায়ী ও বদলি ক্যাটাগরিতে ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়।

সেসময় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করে যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত খুলে দেওয়া হবে।

পরে, ১৬ জুলাই পাটকল খুলে দেওয়ার পথ খুঁজতে ১৩ সদস্যের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা জিটুজি চুক্তির পরিবর্তে এটি স্বল্প সময়ের জন্যে পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সুপারিশ জানায়।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিজেএমসির চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, বিজেএমসি ও মন্ত্রণালয় এখন স্বল্প সময়ের চুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি প্রথমে অগ্রাধিকার হিসেবে পাটকল ও এর কিছু জমি ইজারা দেওয়ার চিন্তা করছে।

গতকাল সোমবার তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত হলো মিলগুলো আধুনিকায়ন করা ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সেগুলো খুলে দেওয়া। সেখানে রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবে। পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়া হবে বলতে আমরা এটাই বুঝিয়েছি।’

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ লাকমান হোসেন মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, যৌথ উদ্যোগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে আবারও খুলে দেওয়ার বিষয়টি এখনো বিবেচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যদি আমরা লিজিং প্রক্রিয়ায় ঠিক মতো সাড়া না পাই তখন এই বিকল্পগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। এই বিষয়ে এখন আমরা আর কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’

বিজেএমসির চেয়ারম্যানের মতে, পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করতে সরকার আর কোনো অর্থ খরচ করবে না। বিনিয়োগকারীরা চাইলে সর্বোচ্চ সরকার কলের পুরনো যন্ত্রপাতি সরিয়ে দিতে পারে।

বিনিয়োগকারীরা শর্তাবলী ঠিক মতো মেনে চলছেন কি না, তা বিজেএমসি দেখভাল করবে। বিজেএমসির দুই হাজার ৯০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৯০ শতাংশকে ছাঁটাই করবে। দেখভাল করার কাজে অল্প কয়েকজনকে রাখা হবে।

বিজেএমসি বেসরকারি খাতে যাওয়া পাটকলের জমি ইজারা দেওয়ার বিষয়ে প্রথমে অনিচ্ছুক ছিল।

কারিগরি কমিটর সদস্যসচিব আব্দুর রউফ গত বছর সেপ্টেম্বরে ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, ‘পাটকল দীর্ঘ সময়ের জন্যে বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার বিষয়ে বিজেএমসির বাজে অভিজ্ঞতা আছে। অনেক ব্যবসায়ীই জমি দখলের চেষ্টা করেছিলেন এবং মিলের অপব্যবহার করেছিলেন।’

এ ধরনের পরিস্থিতি রোধে কারিগরি কমিটির পরামর্শ হলো, কেবল মিলগুলো শিল্পপতিদের কাছে ইজারা দেওয়া হবে এবং সব জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

অতীতে জমি দখলের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন জমি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন বদলানো হয়েছে, গত মাসে জানতে চাইলে আবদুর রউফ বলেন, ‘মিল সংলগ্ন জমিও ইজারা দেওয়া হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজন মোতাবেক আরও জায়গাজুড়ে অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে।’

‘তবে, যে জমি মিল সংলগ্ন নয়, যেমন: শ্রমিকদের জমি, অফিসারদের কোয়ার্টার, সেগুলো ইজারা দেওয়া হবে না’, যোগ করেন তিনি।

‘উদাহরণস্বরূপ: আমাদের বৃহত্তর পাটকলগুলোর মধ্যে একটি ১১৩ একর জায়গাজুড়ে। আমরা হিসাব করে দেখেছি যে, আমরা জমিসংলগ্ন জমিসহ পাটকলটি ইজারা দেই, তাহলেও মোট ৫০ একর জমিসহ পড়বে। বাকি ৬৩ একর জমি আমাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।’

তবে, ব্যবসায়ীরা বলছেন, চুক্তির সময়কাল খুবই কম এবং তাদের চাহিদা অনুযায়ী সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার কথা থাকলেও সেদিকে এখনো নজর দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. জাহিদ মিয়া বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি যে, ৯৯ বছরের মতো দীর্ঘ সময়কালের চুক্তি ছাড়া এই মিলগুলোতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে না। মিলগুলোর সরঞ্জামগুলো এতই পুরনো যে বিনিয়োগকারীদের আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।

‘ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে এবং নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করে স্থাপন করতে বেশ সময় লাগবে। এরপর সব ঠিকঠাক চললে যখন মুনুফা অর্জনের সময় আসবেই, তখনই ইজারার চুক্তি শেষ হয়ে যাবে। তারা (বিজেএমসি) হয়তো বলবে যে, চুক্তি পুনরায় করা হবে। কিন্তু, আগেভাগেই তা বলা যায় না’, যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ পাটকল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘যদি ইজারার সময়কাল এত কম হয় ও জমি ইজারা না দেওয়া হয়, তাহলে কোনো ব্যাংকই ঋণ দিতে আগ্রহী হবে না। এই মিলগুলোতে যারা বিনিয়োগ করবেন, তারা যাতে সহজ শর্তে ঋণ পায়, সে লক্ষ্যে সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পাটকলগুলোর অবস্থান খুবই আকর্ষণীয় স্থানে এবং সেগুলোর প্রাঙ্গণে প্রচুর পরিমাণ জায়গা রয়েছে।’

‘সরকার যদি এই সম্পত্তিগুলো অন্য শিল্পের জন্যে ব্যবহার করতে চাইত, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হয়তো আরও বেশি আগ্রহী হতো। তবে, এখন পর্যন্ত নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাটশিল্পের কথা বিবেচনায় এই মিলগুলো ইজারা দেওয়া হবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘মনে হচ্ছে, বৃহত্তর পাটকলগুলি চালু রেখে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রক শক্তি বজায় রাখার জন্য এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কার্যকরভাবে বেসরকারিকরণ নিশ্চিত করতে প্রথমেই বিজেএমসির কার্যক্রম বন্ধ করা উচিত।’

‘আমরা আগেই বলেছি যে ছোট ও মাঝারি স্তরের বেসরকারিভাবে পরিচালিত মিলগুলোর সঙ্গে বড় মিলগুলো প্রতিস্থাপন করা উচিত। বিদ্যমান অবকাঠামো ও রিয়েল এস্টেটও বেজার (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে, যারা আরও লাভজনক শিল্পে বিনিয়োগকে আকর্ষিত করার জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’

‘সরকার এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে পাট শিল্পকে আরও উত্সাহিত করতে পারে যা ব্যবসায়ীদের পাটকলগুলোতে বিনিয়োগ করতে আকৃষ্ট করবে’, যোগ করেন তিনি।

বিজেএমসি সূত্র জানিয়েছে, বিনিয়োগকারীরাও এই মিলগুলোতে অনিশ্চিত আর্থিক দায়বদ্ধতা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে মিলগুলোর এক হাজার কোটি টাকারও বেশি অপরিশোধিত ঋণ রয়েছে। মিলগুলোর কাছ থেকে কাঁচা পাট ব্যবসায়ীরার আড়াইশ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাবে।

সিপিডির মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এই মিলগুলো ইজারা দেওয়ার আগে সরকারকে এগুলোর অমীমাংসিত আর্থিক সমস্যাগুলোর মীমাংসা করতে হবে। অন্যথায়, ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা দেখা দেবে।’

এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, সরকার আগামী অর্থবছরের মধ্যে এই বকেয়া পরিশোধ করবে। তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে উল্লেখ থাকবে যে, বিনিয়োগকারীরা নিষ্পত্তিহীন আর্থিক সমস্যার জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন না।

Comments

The Daily Star  | English

Babar Ali: Another Bangladeshi summits Mount Everest

Before him, Musa Ibrahim (2010), M.A. Muhit (2011), Nishat Majumdar (2012), and Wasfia Nazreen (2012) successfully summited Mount Everest. Mohammed Khaled Hossain summited Mount Everest in 2013 but died on his way down

45m ago