কিশোরের ক্ষোভ, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা

কী এঁকেছিলেন আহমেদ কবির কিশোর? অথবা ফেসবুকে কী গুজব ছড়িয়েছিলেন এই কার্টুনিস্ট? ২০২০ সালের ৩ মে পর্যন্ত তার ফেসবুক আইডি ‘আমি কিশোর’ অ্যাক্টিভ ছিল। গত ৩ মে’র আগে কিশোর নিয়মিত পোস্ট করেছেন বিভিন্ন বিষয়ে, আপলোড করেছেন নিজের আঁকা কার্টুন। বেশিরভাগ আঁকা ছিল করোনাবিষয়ক। সেখানে তিনি যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে। সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিয়েছেন গণমাধ্যমের সংবাদ ও সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।
kishore
কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। ছবি: স্টার

কী এঁকেছিলেন আহমেদ কবির কিশোর? অথবা ফেসবুকে কী গুজব ছড়িয়েছিলেন এই কার্টুনিস্ট? ২০২০ সালের ৩ মে পর্যন্ত তার ফেসবুক আইডি ‘আমি কিশোর’ অ্যাক্টিভ ছিল। গত ৩ মে’র আগে কিশোর নিয়মিত পোস্ট করেছেন বিভিন্ন বিষয়ে, আপলোড করেছেন নিজের আঁকা কার্টুন। বেশিরভাগ আঁকা ছিল করোনাবিষয়ক। সেখানে তিনি যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে। সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিয়েছেন গণমাধ্যমের সংবাদ ও সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পলাতক তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কারাবন্দি লুৎফুজ্জামান বাবর, বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, বিজিএমইএ নেতা রুবানা হক, ঢাকার (দক্ষিণ) মেয়র ফজলে নূর তাপস, পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফার্মার্স ব্যাংক) চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস শারাফাত প্রমুখকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন এসব কার্টুনে।

বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। হয়তো এঁকেছিলেন কার্টুনও। পাশাপাশি সময়ে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে জাতির জনককে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানিয়েও কার্টুন একে পোস্ট করেছেন কিশোর।

একজন শিল্পী সময়কে ধারণ করেন তার শিল্পকর্মে। অন্ধকারে তলিয়ে থাকা যে ছিদ্রটি সাধারণ চোখে তাকিয়েও দেখতে পাওয়া যায় না সেখানে আলো ফেলেন তিনি। ক্ষমতাবান বা বুর্জোয়া ব্যবস্থার প্রতি তার ক্ষোভ প্রকাশিত হয়। এতে বুর্জোয়া ব্যবস্থা ক্ষুব্ধ হয় শিল্পীর উপর। কিশোরের মতো প্রকৃত শিল্পীরা সম্ভাব্য পরিণতি জেনেও শিল্পচর্চার মাধ্যমে তার চিন্তা ও বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে নিজের ভাষায় অর্থাৎ রং তুলিতে অথবা শিল্পের অন্য মাধ্যম চলচ্চিত্র, গান, লেখায় কথা বলে হয়ে পড়েন বন্ধুহীন। অথবা কারো কারো শত্রু।

কিশোরের আঁকা কার্টুনে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গহ্বরে আলো ফেলার পাশাপাশি করোনাকে পুঁজি করে ফায়দা হাসিলকারীদের অসৎ উদ্দেশ্যকে ব্যাঙ্গ করা, বা সরকারের পদাধিকারীদের ব্যর্থতাকে তিরস্কার করতে দেখা যায়।

ব্যাংক ব্যবস্থায় লুটপাটের চিত্রও আছে কিশোরের আঁকা কার্টুনে। এটাকে সময়ের প্রতি শিল্পীর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মেনে সংশোধনের পথ খোঁজা বাঞ্চনীয়। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে মামলা দিয়ে জেলে ঢোকানো প্রত্যাশিত নয়।

নাগরিক হিসেবে সংবিধান স্বীকৃত চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার অধিকার প্রয়োগের প্রয়াস হিসেবে একে মূল্যায়ন করা কাম্য। আশা করি, বিজ্ঞ আদালত বিষয়টি সুবিবেচনায় নিবেন। আদালেতর ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধা রয়েছে।

যে শিল্পী জাতির জনককে শ্রদ্ধা জানিয়ে কার্টুন এঁকেছেন তার বিরুদ্ধেই জাতির পিতাকে অপমানের অভিযোগ আনা কি আইনের অপপ্রয়োগ নয়? যদি প্রশ্ন তোলা হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা বিএনপি-সমর্থক কিনা? তিনি তারেক রহমান ও লুৎফুজ্জামান বাবরকে ব্যাঙ্গ করায় ক্ষু্ব্ধ হয়েছেন কিশোরের প্রতি। অথবা অন্য কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারার অপপ্রয়োগ করেছেন। সুষ্টু তদন্ত করলে তা বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়। আইন অনুয়ায়ী সময় মতো চার্জশিট না দিয়ে বিলম্বিত তদন্তের জন্য আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

জামিনে বের হয়ে কিশোর তাকে ধরে নেওয়ার পর নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তাকে ধরে নিয়ে দুদিন অজ্ঞাতস্থানে রেখে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি তার শরীরে নির্যাতনের ক্ষত দেখিয়েছেন। এই ঘটনা সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকের মূল্যবান রক্ষাকবচ ৩৫ অনুচ্ছেদকে আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিতদের বুড়ো আঙুল দেখানো নয়তো কি?

এ জাতীয় অভিযোগ গায়ের জোরে উড়িয়ে দেওয়া গেলেও বিশ্বের কাছে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। কলঙ্কিত হয় রাষ্ট্র। প্রশ্ন হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দু-একজন সদস্যের অমানবিক আচরণ ও কৃতকর্মের দায় পুরো বাহিনী, সরকার তথা রাষ্ট্র নেবে কেন? ঘটনার সুষ্টু তদন্ত ও বিচার হওয়া কি জরুরি নয়?

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষমতাবান মনে করা হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ও বিত্তবান ব্যক্তিদের। জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে, এসব ক্ষমতাবানরা রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারেন।

অন্যদিকে, একজন ক্ষমতাবান বেসরকারি ব্যাংক চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায় কিশোরের বর্ণনায়, যাকে নিয়ে আঁকা কার্টুন দেখিয়ে তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন কিশোর।

ক্ষমতাবানরা কারো ওপর ক্ষুব্ধ হলে কি ধরনের অঘটন আইনশঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে ঘটাতে পারেন নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা এর জলজ্যান্ত প্রমাণ।

আটকের পর কিশোরকে নির্যাতনকারী কর্মকর্তা ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখিত ব্যাংক চেয়ারম্যান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন কিনা তদন্তের দাবি করাটা খুবই যৌক্তিক। এতে ঐ অমানবিক ঘটনার দায় কিছুটা হলেও সরকারের ওপর থেকে কমবে।

গত বছরের মে মাসে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, লেখক মুশতাক আহমেদ ও অন্যদের এই মামলায় গ্রেপ্তারের পর সংবাদমাধ্যমে বলা হয় তাদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো ও জাতির পিতাকে অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ও ২১ ধারায় মূলত এই অপরাধগুলোর দণ্ড নির্ধারিত ও ধারাগুলো জামিনযোগ্য নয়। কার্টুনিস্ট কিশোরের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছে ‘আমি কিশোর’ পেইজের মাধ্যমে কার্টুন এঁকে তিনি অপরাধগুলো করেছেন।

যেকোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন কিশোরের বিরুদ্ধে আইনের অপপ্রয়োগ হয়েছে কিনা। কী কারণে অপরাধ প্রমাণ তো দূরের কথা অভিযোগ গঠনের আগেই তারা দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন? আইনের অপপ্রয়োগের কারণেই যে বার বার তারা মৌলিক অধিকার— জামিন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তা মোটেও অস্পষ্ট নয়। এতে কিশোর ও মুশতাক সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কিনা প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার উদাহরণ হিসেবে কেউ কেউ একটা গল্প বলেন, সুন্দরবনে বাঘের উপস্থিতি টের পেয়ে হরিণ দৌড়াচ্ছে। দেখাদেখি শেয়ালও দৌড় শুরু করল, পাল্লা দিয়ে। হরিণ প্রশ্ন করল, বাঘ আমাকে খাবে কিন্তু তুমি দৌড়াচ্ছো কেন? শেয়ালের জবাব— দেশটা এমন যে, এখানে কে শেয়াল আর কে হরিণ প্রমাণ করতেই কয়েক যুগ চলে যায়!

আরেকটু ভেঙে বললে যা দাঁড়ায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দোষ প্রমাণের আগে এ দেশে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হয়।

এভাবেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ ২০ বছর কারাভোগের পর নির্দোষ প্রমাণের মাধ্যমে মুক্তি পান এমনটিও সংবাদপত্রে দেখা যায়।

এই ক্ষেত্রে গুরুতর যে প্রশ্নটি সামনে আসে, এই যে মানুষটা বিনা অপরাধে কারাভোগ করল জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়ে— এই দায় কার? সে বা তার পরিবার যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো, তা পুষিয়ে দেবে কি রাষ্ট্র? সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের দায়ে কারো কি শাস্তি হয়?

ভাগ্যবান কেউ যদিও জীবদ্দশায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্ত হন, কিন্তু লেখক মুশতাক আহমেদের মতো দুর্ভাগাদের মুক্তি পেতে পৃথিবী থেকেই চলে যেতে হয়। অন্যদিকে, জামিন অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ক্ষমতাবানদের কেউ কেউ একই দিনে নিম্ন আদালত থেকেই জামিন পান।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সিংহভাগ অভিযুক্তেরই হাইকোর্ট থেকে জামিন নিতে হয় দীর্ঘ কারাভোগের পর। অন্যদিকে, ক্ষমতাবান কারো জামিন নামঞ্জুরের কারণে সিনিয়র জজকে বদলি করে জুনিয়র জজকে দিয়ে জামিন করানোর নজিরও সম্প্রতি দেখা গেছে। এটাকে আমরা আইনের নিজস্ব গতি বলে প্রচার করলেও প্রশ্ন থেকেই যায়— আইন সবার জন্য আসলেই সমান কিনা?

বাংলাদেশের সংবিধান প্রস্তাবনার দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা— যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’

উল্লেখ করা যায়, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা সংবিধান সুরক্ষার শপথ নেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শুরু থেকেই এর কঠিন অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করা হচ্ছিল এবং এর শিকারও হয়েছেন অনেক সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, শিল্পী, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ।

স্পষ্টত এই আইনের বেশকিছু ধারা সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, বলছেন আইনজ্ঞরা। এই আইনটির অমানবিক ধারা বাদ দিয়ে একে সত্যিকার অর্থে জনগণের নিরাপত্তা দেওয়ার আইন হিসেবে সংশোধন করার দাবি ওঠেছে সব মহল থেকে। মানবাধিকারবিরোধী এই আইনটি অবিলম্বে সংশোধন করে এর সব ধরনের অপপ্রয়োগ রোধের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে নিজেদের ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষায়।

জসিম আহমেদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নিবে না।)

Comments