চুক্তিভঙ্গ করে সরবরাহ করা সেই ১০ ইঞ্জিন চালানোর সিদ্ধান্ত রেলওয়ের

চুক্তিভঙ্গ করে সরবরাহ করা হুন্দাই রোটেম কোম্পানির তৈরি ১০টি রেল ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) ব্যবহার শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। লোকোমোটিভগুলো ব্যবহারযোগ্য কি না তা পরীক্ষা করতে একটি টেকনিক্যাল কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত আসার আগেই দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি এই ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার শুরু হয়েছে।

চুক্তিভঙ্গ করে সরবরাহ করা হুন্দাই রোটেম কোম্পানির তৈরি ১০টি রেল ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) ব্যবহার শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। লোকোমোটিভগুলো ব্যবহারযোগ্য কি না তা পরীক্ষা করতে একটি টেকনিক্যাল কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত আসার আগেই দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি এই ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, লোকোমোটিভগুলো ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে’ চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর চার দিন পর রোববার একটি লোকোমোটিভ দিয়ে মালবাহী ট্রেন ঢাকায় আনা হয়।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ইঞ্জিনগুলোর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম কোম্পানিকে (এইচআরসি) ইঞ্জিনগুলোর ‘অল্টারনেটর’ পরিবর্তন করে দিতে বলেছে। তা না হলে, হুন্দাইকে সব টাকা পরিশোধ করা হবে না বলেও জানান তারা।

এ ঘটনায় রেল মন্ত্রণালয় তাদের একজন প্রকল্প পরিচালককে তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে যিনি লোকোমোটিভ সরবরাহ চুক্তির শর্ত ভাঙার অভিযোগে এইচআরসিকে প্রদেয় অর্থ আটকে দিয়েছিলেন। তার পরিবর্তে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সপ্তাহ তিনেক পরেই ইঞ্জিনগুলোর পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হলো।

এছাড়া, ইঞ্জিনগুলো ব্যবহারযোগ্য কি না তা ক্ষতিয়ে দেখতে একটি ‘টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছিল যাকে তিনি কমিটিতে থাকতে অস্বীকৃতি জানানোয় আবার নতুন কমিটি গঠন করা হয়। তবে নতুন কমিটি এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।

প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ইঞ্জিনগুলোর সামান্য ত্রুটির কারণে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে পড়ে আছে। এটা অর্থহীন।’

তিনি জানান, গত ২১ এপ্রিল কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেয় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পরীক্ষমূলকভাবে মালবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনে ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার করতে হবে। এরপর বোরবার থেকে ইঞ্জিনগুলোর ব্যবহার শুরু হয়েছে।

একটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৩০০ কোটি দিয়ে কেনা ডিজেল চালিত মিটার গেজ ইঞ্জিনগুলো গত বছরের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করে পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপে আনা হয়।

রেলওয়ের কমিশনিং কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সরবরাহকৃত ইঞ্জিনগুলোর চারটি মূল কারিগরি অংশ— ইঞ্জিন, অল্টারনেটর, কমপ্রেসার ও ট্র্যাকশন মোটর চুক্তিতে উল্লিখিত বর্ণনার সঙ্গে মিলছে না।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ হুন্দাইকে প্রাপ্য অর্থের ৬৫ শতাংশ আটকে দেয় এবং রেলমন্ত্রী গত অক্টোবর এ অনিয়মের তদন্ত করার নির্দেশ দেন। তখন থেকে লোকোমোটিভগুলো ওয়ার্কশপে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইন ও ভূমি) মো. ফারুকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটি গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটির একটি কপি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লোকোমোটিভ সরবরাহ না করার জন্য হুন্দাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। এ ছাড়াও, প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন করার দায়িত্বে থাকা সিসিআইসি সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার জন্য ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, হুন্দাই অল্টারনেটরের মডেল টিএ৯-১২সিএ৯এসই সরবরাহ করেছে, কিন্তু চুক্তিতে উল্লেখ ছিল টিএ১২-সিএ৯ এর কথা।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, দুটি মডেলের মধ্যে শক্তি উৎপাদনের সামর্থ্যে পার্থক্য রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের সব রেলপথকে ডুয়েল গেজ লাইনে রূপান্তরিত করা হবে। সরকার রেলওয়েকে নির্দেশ দিয়েছিল এমন লোকোমোটিভ কিনতে যেগুলোকে কাঠামোগত কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে মিটার গেজ এবং ব্রড গেজ দুই ট্র্যাকেই চালানো যাবে। কিন্তু টিএ৯-১২সিএ৯এসই অল্টারনেটর থাকার কারণে এই ইঞ্জিনগুলো ব্রড গেজে চলবে না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

প্রকল্পের পরিচালক শুধু হুন্দাইকে অর্থ প্রদানই থামাননি, তিনি একইসঙ্গে ‘রেলওয়ের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা’র নামে অভিযোগ এনেছেন যে, তাদের যোগসাজশেই এ অনৈতিক কাজটি হতে যাচ্ছিল।

এই পরিস্থিতিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় গত ৩১ মার্চ নুর আহমেদ হোসেনকে প্রকল্প পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক হিসেবে তারই বিসিএস ব্যাচের একজন অধস্তনের অধিনে নিয়োগ দেয়।

তবে নতুন প্রকল্প পরিচালক হাসান মনসুরের ভাষ্য, ইঞ্জিনগুলোর সামগ্রিক পারফর্মেন্স ‘বেশ ভালো’।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু তারা (এইচআরসি) চুক্তি অনুযায়ী অল্টারনেটরগুলো দেয়নি, আমরা তাদের অল্টারনেটরগুলো পরিবর্তন করে দিতে বলেছি। কিন্তু তারা যদি তা না করে, আমরা তাদের বকেয়া প্রাপ্য থেকে টাকা কেটে নেব।’

চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য যন্ত্রপাতী সরবরাহ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইঞ্জিন এবং ট্রাকশন মোটরে তেমন কোনো সমস্যা নেই। চুক্তি সই হওয়ার পর প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অনুমতিতেই এইচআরসি যন্ত্রপাতিতে পরিবর্তন আনে।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার করা যাবে কি না, এই বিষয়ে রেলওয়ে গত ২৩ মার্চ বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুবুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে এবং তাদেরকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

মাহবুবুর রাজ্জাক, যিনি ফারুকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি নতুন কমিটির সদস্য হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘কমিটি ইতোমধ্যে চুক্তিভঙ্গের অপরাধে সরবরাহকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।’

মাহবুবুর রাজ্জাক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করতে পারত। কিন্তু তা না করে কীভাবে ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করা যায় এই বিষয়ে কমিটি গঠন করেছে, এটি হাস্যকর। তাই আমি নতুন কমিটিতে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

রেলওয়ের মহাপরিচালক ধিরেন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে (পূর্ব) প্রধান করে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং তাদের ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’

হুন্দাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এই বিষয়ে জানেত চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের অল্টরেনেটর পরিবর্তন করে দিতে বলেছি। তা না করে দিলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’

আরও পড়ুন:

খুঁড়িয়ে চলছে রেলওয়ের প্রকল্প

রেলে কেনাকাটায় অনিয়ম: তদন্ত প্রতিবেদন উপেক্ষা করছে মন্ত্রণালয়

Comments

The Daily Star  | English

'Why did they kill my father?'

Slain MP’s daughter demands justice, fair investigation

55m ago