মুক্তিযুদ্ধ

৩ মে ১৯৭১: টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন- ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩ মে ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভার বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা সংক্রান্ত সাব কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘর কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সাক্ষাৎকার দেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩ মে ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভার বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা সংক্রান্ত সাব কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘর কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সাক্ষাৎকার দেন।

৩ মে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে সোস্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের সম্মেলনে বাংলাদেশে যুদ্ধবিরতি ও একটি স্থায়ী মীমাংসার জন্য আলোচনা শুরু করতে অনুরোধ জানানো হয়। মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আবেদন জানান।

এদিন নাটোরের ফতেঙ্গাপাড়ায় নারদ নদের খাল পাড়ে ৮৬ জন নিরীহ মানুষকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদারেরা। কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক আবদুস সালাম মুক্তাঞ্চল থেকে গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের বিষয়ে আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতি পাঠান।

ঢাকায় ৩ মে

পাকিস্তানী আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক ডাকসু ও ছাত্রলীগের সাত জন ছাত্র নেতাকে ১০ মে সকাল ৮টার মধ্যে ঢাকার উপ-সামরিক আইন প্রশাসকের সামনে হাজির হবার নির্দেশ দেয়। ছাত্র নেতারা হলেন: ডাকসুর সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন, ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, খায়রুল আনাম খসরু, মোস্তফা মহসিন মন্টু ও সেলিম মহসিন।

৩ মে ঢাকায় পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে বলে, মহাখালী রেলওয়ে লেবেল ক্রসিং থেকে পুরনো ঢাকা, ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশন এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ ডিআইটি রোডের আশপাশের বসবাসকারী সবাইকে ৫ মে’র মধ্যে বসতি ছেড়ে যেতে হবে। অন্যথায় সেনাবাহিনী তাদের উচ্ছেদ করতে বাধ্য হবে।’

বিদেশী রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ ও রাজনীতিবিদদের বিবৃতি

৩ মে প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন সিনেটে বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আবেদন জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য ভারত সরকার যে আবেদন জানিয়েছে, তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সাড়া দেয়া উচিত। পূর্ব পাকিস্তানে যে ভয়ংকর গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয় চলছে তা অসহনীয়। তিনি এসময় প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিও পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

৩ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভার বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা সংক্রান্ত সাব কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘর কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘আমি খোলা মন নিয়ে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু কয়েকজন শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলার পর আমি এখন নিশ্চিত যে, পূর্ব বাংলায় ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। বর্বরতা ত্রাসের মাত্র চরম আকার ধারণ করেছে। গণহত্যা চলেছে। এখন আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, পূর্ব বাংলার জনসাধারণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করা হয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল। কিন্তু এখন পাঁচ লাখ লোক যখন দেশ থেকে বিতাড়িত হলেন, তখন এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘে আমার দেশ আমেরিকা যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, তাদের উচিত এখন পাকিস্তানের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করে তাদের নিজের অবস্থান প্রকাশ করা। এবং তাদের বুঝিয়ে দেয়া এই ধরনের অবস্থা সহ্য করা হবেনা।

৩ মে ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে সোস্যালিস্ট ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিলের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ বিরতি ও একটি পূর্ণাঙ্গ মীমাংসার জন্য আলোচনা শুরু করার অনুরোধ জানানো হয়। একটি প্রস্তাবে এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক বন্দিদের অবস্থা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের সাহায্যের লক্ষ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

৩ মে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা ও চলমান পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা শাহীর সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন।

পাকিস্তানের পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ৩রা মে লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘দেশের একাংশে সামরিক আইন বলবত রেখে অপরাংশে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যেতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে তা দেখে পূর্ব পাকিস্তানীরা সেখানে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির গভীর প্রেরণা অনুভব করবে।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় এদিন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করবে।

অন্যদিকে ৩ মে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে এ আলোচনার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশী শরণার্থীদের জন্য প্রতিটি রাজ্যের প্রয়োজনীয় অর্থ কেন্দ্র থেকে বরাদ্দ দেয়া হবে । তারা যেন শরণার্থীদের বিষয়ে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ৩ মে

৩ মে প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিন ‘ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ঢাকার অবস্থা বিপজ্জনক। সাধারণ মানুষের উপর গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন ক্রমশ বাড়ছে। শহর জুড়ে টহল দিচ্ছে সামরিক যান। মানুষ প্রচণ্ড ভীত, যারা অফিস আদালতে কাজ করছেন তারাও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যোগ দিয়েছেন। ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই নাগরিকদের। অন্ধকার নামলে ঢাকাকে গোরস্থান হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়।’

দেশব্যাপী গণহত্যা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ

৩ মে আনুমানিক দুপুর তিনটার দিকে আচমকা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নাটোরের ধলা গ্রামের বনপাড়া মিশন ক্যাম্পাস ঘিরে ফেলে। এ সময়ে মিশন ক্যাম্পাসে আশ্রয় নেওয়া পরিবারের ৮৬ জন নিরীহ যুবক ও মধ্যবয়সী পুরুষকে আটক করে হানাদারেরা। সেদিন সন্ধ্যায় তাদের নাটোর দত্তপাড়া সংলগ্ন ফতেঙ্গাপাড়ায় নারদ নদের সংযুক্ত খাল পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পৈশাচিক নির্যাতনের পর ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদারেরা।

৩ মে ঝালকাঠির কীর্তিপাশায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটির ওপর হানাদার বাহিনী হামলা চালায়। এ আক্রমণে সিরাজ সিকদার তার বাহিনীকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে মাদ্রা, শতদল কাঠি, আতা ও ভিমরুলী গ্রামে পৃথক পৃথক ক্যাম্প স্থাপন করেন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক আবদুস সালাম মুক্তাঞ্চল থেকে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতিদানের জন্য প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন ও সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দানের জন্য বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের প্রতি আবেদন জানান।

 

তথ্য সূত্র- বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র ৮ম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৪ মে, ১৯৭১

দৈনিক পাকিস্তান, ৪ মে, ১৯৭১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস ১, ৭ নং সেক্টর

 

আহমাদ ইশতিয়াক [email protected]

 

আরও পড়ুন:

১ মে ১৯৭১: ‘বাংলাদেশ এখন একটি চিরন্তন সত্য ও বাস্তবতা’ ভারতীয় শিল্পমন্ত্রী

২৭ এপ্রিল ১৯৭১: কালীগঞ্জে গণহত্যা, ইপিআরের নাম পাল্টে ইপিসিএফ

সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে যিনি উৎসর্গ করেছিলেন নিজের প্রাণ

১৯ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ১৮ নির্দেশনা

১৮ এপ্রিল ১৯৭১: বিদেশের মাটিতে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন

স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সূচনা, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের শপথ

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভার শপথের অপেক্ষা, ঢাকায় কারফিউ শিথিল

১৫ এপ্রিল ১৯৭১: নিভৃতে কেটেছে বাংলা নববর্ষ, ভয়ে-আতঙ্কে ঢাকা ছাড়ে মানুষ

১৩ এপ্রিল ১৯৭১: চারঘাট গণহত্যা ও ঘটনাবহুল একটি দিন

১২ এপ্রিল ১৯৭১: বালারখাইল গণহত্যা ও ঘটনাবহুল একটি দিন

১১ এপ্রিল, ১৯৭১: দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান তাজউদ্দীন আহমদের

১০ এপ্রিল: মুজিবনগর সরকার গঠন ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস

১১ এপ্রিল, ১৯৭১: দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান তাজউদ্দীন আহমদের

১০ এপ্রিল: মুজিবনগর সরকার গঠন ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস

এক দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিবেটি কাঁকন হেনইঞ্চিতা

স্বাধীনতাই একমাত্র গন্তব্য পূর্ব পাকিস্তানের: মওলানা ভাসানী

Comments