বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নে উন্মুক্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া

সম্প্রতি আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা খাত বেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে দেশে ১৫৪টি তালিকাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয় কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ের সেরা ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ের ফলাফল আরও হতাশাজনক। একই সময়ে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এসব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবং তাদের র‍্যাংকিংও আগের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বভাবতই, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সার্বিক মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

সম্প্রতি আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা খাত বেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে দেশে ১৫৪টি তালিকাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয় কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ের সেরা ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ের ফলাফল আরও হতাশাজনক। একই সময়ে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো থেকে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় এসব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবং তাদের র‍্যাংকিংও আগের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বভাবতই, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সার্বিক মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার মানের ক্ষেত্রে রয়েছে নানাবিধ সমস্যা। যেমন সুষ্ঠু প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অভাব, তহবিলের অভাব, নতুন ও অভিনব বিষয়ের স্বল্পতা, ক্লাসরুমের শিক্ষা ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয়তার মাঝে ফারাক, গবেষণার অভাব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ভালো শিক্ষকের অভাব।

শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করে যে তাদের পছন্দ অনুযায়ী মানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্বাচন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের অগ্রাধিকার, বিভিন্ন নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা তেমন কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না। তবে তারা এটুকু বোঝে যে একজন মানসম্পন্ন শিক্ষকই পারেন তাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে। এই শিক্ষকরা সবসময় শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থকে মাথায় রাখেন।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে অভিযোগ, সেখানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার ব্যাপারটিকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এছাড়াও দেখা গেছে, সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের ভ্যালেডিক্টোরিয়ান শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। সারাবিশ্বে সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের স্নাতকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ এতে জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সম্ভাবনা কমে যায়। তারা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের নিয়োগ দেয় এই আশায় যে, তারা শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু শেখাতে পারবে।

এক্ষেত্রে আমাদের দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই বিপরীত দিকে হাঁটছে। বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা কেউ চাকরির আবেদন করলেও তাদের বিবেচনা করা হয় না। এমনকি, তারা গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে নিজেদেরকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রমাণ করলেও চাকরি পান না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি খুব একটা ভিন্ন নয়। তারা খরচ কমানোর জন্য খন্ডকালীন শিক্ষকদের দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করে থাকেন। বিদেশি শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে তাদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ বহনের ব্যাপারটিকে সবাই সযত্নে এড়িয়ে চলেন। এখানে উল্লেখ্য, বিদেশি শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে উদার নীতি অবলম্বন করে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং হংকংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শীর্ষে যেতে পেরেছে। তারা ভেবেছে, বিদেশি শিক্ষকরা শেখার ও শেখানোর অভিজ্ঞতাগুলোকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবেন।

একাডেমিক এক্সপেরিয়েন্স প্রজেক্টে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে তাদের যোগ্যতা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিষয়। যেমন উচ্চতর ডিগ্রী, প্রকাশনা, গবেষণা ও প্রাসঙ্গিক কাজের অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া। এক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পরিচিতির বলয়ের কোনো ভূমিকা থাকা অনুচিত। শিক্ষক পদে আবেদনকারীদের শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে দক্ষতার কারিগরি মূল্যায়ন করানো উচিৎ। এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সদস্যরা, শিক্ষকরা, এমনকি শিক্ষার্থীরাও অংশ নিতে পারে। কারণ শিক্ষার্থীরাই মূলত এই সেবা উপভোগ করবেন।

নিয়োগের পরেও নিয়মিত বিরতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটি চালু রাখতে হবে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শিক্ষার্থী পর্যন্ত সবাই অংশ নিতে পারবেন। শিক্ষকদের আত্মোন্নয়নের জন্য মূল্যায়ন থেকে পাওয়া অভিমতগুলোকে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে, এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষক ধরে নিতে না পারেন যে মূল্যায়নের ফলাফল যাই হোক না কেন, তাতে চাকরির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকের চিন্তাধারাই এরকম।

সব শিক্ষকের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, তাদের পদমর্যাদা কিংবা জ্যেষ্ঠতা যাই হোক না কেন। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা পূর্ণবয়স্কদের শিক্ষাদানের আধুনিক পন্থাগুলো সম্পর্কে অবগত থাকবেন। যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব না দিলেই নয়, তা হচ্ছে মৌলিক গবেষণা ও প্রকাশনা। একজন আদর্শ শিক্ষকের জন্য এ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধুমাত্র জ্ঞান বিতরণই করবেন না, জ্ঞান তৈরিও করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্ব আরোপ করা উচিৎ গবেষণা ও প্রকাশনার ওপর। যাতে শিক্ষকরা বিশ্বের বিভিন্ন র‍্যাংকিংপ্রাপ্ত ও তালিকাভুক্ত জার্নালগুলোতে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করতে পারেন। এ ব্যাপারটি একজন শিক্ষাবিদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এটা সবার মনে রাখা উচিৎ যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের শিক্ষকদের বিতরণ করা জ্ঞানের পরিমাণ ও গুণগত মানের ওপর।

বাংলাদেশ একটি অভিনব অবস্থানে আছে। কারণ অনেক প্রবাসী জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ মানুষ দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে আগ্রহী। তাদেরকে সাধারণত চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে অবজ্ঞা করা হয়। যা তাদের দেশের জন্য কিছু একটা করার তাড়নার ওপর পানি ঢেলে দেওয়ার মতো। এই প্রবাসী বাংলাদেশি জ্ঞানীদের কয়েক সেমিস্টারের জন্য আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা যায়। যাতে তারা তাদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচিৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিদেশি অধ্যাপকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা। তারা স্নাতক কোর্সগুলোতে ক্লাস নিতে পারেন, বিশেষ করে যেখানে খুব বেশি জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি কোটা চালু করা যেতে পারে, যা স্বনামধন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকদের দিয়ে পূরণ করতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত অন্যান্য পেশার মানুষ অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিল্প, বাণিজ্য ও প্রশাসনের মতো বিভিন্ন বাস্তবমুখী বিষয়ের ওপর তাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে ভাগ করে নিতে পারেন। বিদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগী হয়ে (সিঙ্গাপুরের মডেল) এবং শিক্ষক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের প্রচলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান উন্নয়নের পথে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারবে।

২০২০ সালের টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে ২৪তম স্থান অধিকার করে দ্য ইউনিভার্সিটি অব পিকিং প্রমাণ করেছে যে অল্প সময়ের মাঝেই একটি বিশ্ব মানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা সম্ভব। দ্য ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (এনইউএস), দক্ষিণ কোরিয়ার পসটেক ইউনিভার্সিটি এবং আরও অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অল্প সময়ের মধ্যেই বৈশ্বিক পরিচিতি লাভ করেছে।

যা দরকার তা হলো, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রয়োজনীয় ইচ্ছাশক্তি। যার মাধ্যমে যোগ্যতাসম্পন্ন স্থানীয় ও বিদেশি শিক্ষকদের নিয়ে কিছু অনুকরণীয় বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা যাবে। দেশের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সুনাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের অনুপ্রেরণাও বাড়তে থাকবে এবং তারা শিক্ষাদানের আরও উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকবেন। এর ফলশ্রুতিতে সমগ্র জাতি উপকৃত হবে এবং শিক্ষার্থীরাও বৈশ্বিক নাগরিকে রূপান্তরিত হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদগুলো দখল করে নেবেন। তাদের হাত ধরেই আসবে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি এবং বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে উন্নীত হওয়ার পথ।

তাহমিনা ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে এমবিএ করছেন। ড. আন্দালিব পেনসিলভেনিয়া রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ইমেরিটাস এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। ড. আন্দালিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অনুষদের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় এই নিবন্ধটি তৈরি করেন এবং অপ-এডের জন্য উপস্থাপন করেন। অপ-এডগুলো লেখা হয়েছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ওপর আলোকপাতের মাধ্যমে এবং একে আরও উন্নত করার লক্ষ্যে। ‘একাডেমিক এক্সপেরিয়েন্স প্রকল্প’তে অবদান রাখতে ইচ্ছুক যে কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ড. আন্দালিবের সঙ্গে [email protected] মেইলে যোগাযোগ করতে পারেন।

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Comments